
মুহাম্মাদ জুবাইর: রাউজানসহ চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত বলে অভিযোগ ওঠা গুম, খুন, হামলা, নির্যাতন, ভূমি দখল, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং অন্যান্য গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের ঘটনায় মামলা গ্রহণ, অভিযোগ রেকর্ড এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে। আবেদনকারীরা দাবি করেছেন, বহু ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত রয়েছেন এবং অসংখ্য অভিযোগ এখনো থানার সাধারণ ডায়েরি কিংবা নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি। একই সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চার্জশিটভুক্ত আসামি ও রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে চিকিৎসার নামে বিশেষ সুবিধা প্রদান এবং বিচারিক কার্যক্রম বিলম্বিত করার অভিযোগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবিও জানানো হয়েছে। বিষয় দুটি সামনে আসার পর চট্টগ্রামের রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে সংঘটিত বহু আলোচিত অপরাধের ঘটনা জনসমক্ষে আলোচনা হলেও সেগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ কখনোই আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আসেনি। আবেদনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রতিশোধের আশঙ্কার কারণে অনেক ভুক্তভোগী থানায় যেতে পারেননি। আবার অনেকেই অভিযোগ জমা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। তাদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি শুধু ভুক্তভোগীদের ক্ষত গভীর করেনি, বরং অপরাধীদের মধ্যেও দায়মুক্তির মনোভাব তৈরি করেছে। ফলে একই ধরনের অপরাধ বারবার সংঘটিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
আবেদনের বড় অংশজুড়ে রাউজান উপজেলার পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। আবেদনকারীরা দাবি করেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার বলয়ের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ ভীতি, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করেছেন। তাদের অভিযোগ, বহু ব্যক্তি ও পরিবার হামলা, নির্যাতন, ভূমি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, রাজনৈতিক হয়রানি এবং সহিংস ঘটনার শিকার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা আইনি প্রতিকার পাননি। আবেদনকারীদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত বহু ঘটনা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাপা পড়ে গেছে। অনেক পরিবার তাদের স্বজন হারানোর পরও বিচার পায়নি, আবার অনেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি নিরাপত্তার অভাবে প্রকাশ্যে অভিযোগ আনতে পারেননি।
আবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই-২০২৪ পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে অতীতের বিভিন্ন ঘটনার বিচার পাওয়ার নতুন আশা তৈরি হয়েছিল। বহু ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার মনে করেছিলেন, এবার তারা থানায় অভিযোগ করতে পারবেন এবং পুরোনো ঘটনাগুলো তদন্তের আওতায় আসবে। কিন্তু আবেদনকারীদের দাবি, বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বিভিন্ন থানায় যোগাযোগ করেও অনেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাননি। বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতা, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মামলা হিসেবে গ্রহণে নানা জটিলতার মুখে পড়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চার্জশিটভুক্ত আসামি ফজলে করিম চৌধুরীকে ঘিরেও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী এবং জুলাই-২০২৪ হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত মামলার অন্যতম অভিযোগকারী মুহাম্মদ সম্রাট রুবায়েত স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব বরাবর দেওয়া এক লিখিত আবেদনে দাবি করেছেন, চিকিৎসার কারণ দেখিয়ে ফজলে করিম চৌধুরীকে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে রাখা হয়েছে এবং এর ফলে বিচারিক কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে। আবেদনে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক প্রফেসর ডা. ধীমান চৌধুরীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আবেদনকারীর দাবি, চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্তের কারণে আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নির্ধারিত সময়ে আসামিকে হাজির করা সম্ভব হয়নি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. ধীমান চৌধুরীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। এদিকে দুটি আবেদন প্রকাশ্যে আসার পর চট্টগ্রামের রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, যেকোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগকারীদের বক্তব্য শোনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযুক্তদের আইনগত অধিকারও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হতে পারে বলে তারা মনে করেন।



