ইসলাম ধর্মধর্ম ও জীবন

সুরা ফাতিহার পঞ্চম আয়াতের গূঢ় রহস্য

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক: পবিত্র কুরআনের ‘উম্মুল কিতাব’ খ্যাত সুরা ফাতিহার প্রতিটি আয়াত মুমিনের জীবনের জন্য এক একটি আলোকবর্তিকা। বিশেষ করে পঞ্চম আয়াত— ‘ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন’ (আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং একমাত্র তোমারই কাছে সাহায্য চাই)— মানুষের সাথে তার স্রষ্টার সম্পর্কের মূল ভিত্তি স্থাপন করে। প্রখ্যাত তাফসিরবিদদের ব্যাখ্যার আলোকে এই আয়াতের গভীর তাৎপর্য ও তাওহিদের স্বরূপ নিচে তুলে ধরা হলো।

আরবি ‘ইবাদত’ শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক। তাফসিরুল কুরআনের বিশেষজ্ঞদের মতে, এর তিনটি প্রধান অর্থ রয়েছে: ১. পরম শ্রদ্ধাভরে পূজা ও উপাসনা করা, ২. নিঃশর্ত আনুগত্য ও হুকুম পালন করা এবং ৩. দাসত্ব ও বন্দেগী করা। যখন কোনো মুমিন এই আয়াত পাঠ করে, তখন সে স্বীকার করে যে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই তিনটি অর্থেই সে কেবল মহান আল্লাহর মুখাপেক্ষী। এখানে অন্য কাউকে শরিক করার কোনো সুযোগ নেই।

এই আয়াতটি মূলত শিরকের বা অংশীদারিত্বের পথ বন্ধ করে দেয়। তবে অনেকে লৌকিক ও অলৌকিক সাহায্যের পার্থক্য বুঝতে না পেরে বিভ্রান্ত হন। ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, জাগতিক বা প্রাকৃতিক কোনো প্রয়োজনে একে অন্যের সাহায্য নেওয়া শিরক নয়। যেমন— অসুস্থতায় চিকিৎসকের কাছে যাওয়া বা কোনো কাজে কারো দৈহিক শ্রমের সহায়তা নেওয়া। এটি মূলত আল্লাহ নির্ধারিত একটি প্রাকৃতিক নিয়ম। পবিত্র কুরআনেও নেক কাজে একে অন্যকে সাহায্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভয়ংকর বিষয়টি হলো ‘অলৌকিক’ সাহায্য প্রার্থনা। যখন কোনো মানুষ মনে করে যে, কোনো মৃত ব্যক্তি বা সত্তা বাহ্যিক মাধ্যম ছাড়াই তার অভাব পূরণ করতে পারে, বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারে কিংবা দূর থেকে মানুষের ফরিয়াদ শোনার ক্ষমতা রাখে— তখনই তা ‘শিরক’ হিসেবে গণ্য হয়। ওলী-আউলিয়াদের প্রতি ভালোবাসার নামে মৃত ব্যক্তির কাছে অলৌকিক সাহায্য চাওয়া মূলত আল্লাহর একত্ববাদে চরম আঘাত।

সুরা ফাতিহার এই আয়াতটি তাওহিদের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার প্রতি ইঙ্গিত করে:

১. তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ (প্রতিপালকত্বের একত্ববাদ): এটি হলো বিশ্বাস করা যে, মহাবিশ্বের স্রষ্টা, রিজিকদাতা ও পরিচালক একমাত্র আল্লাহ। এমনকি মক্কার মুশরিকরাও এই সত্য স্বীকার করত যে, আসমান-জমিনের মালিক আল্লাহ। নাস্তিক বা জড়বাদী ছাড়া জগতের অধিকাংশ মানুষই এই একত্ববাদে বিশ্বাসী।

২. তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ (উপাস্যত্বের একত্ববাদ): এর অর্থ হলো সকল প্রকার ইবাদত— যেমন নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতের পাশাপাশি দোয়া, মানত, ভয় ও ভরসা কেবল আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা। বর্তমান সময়ে কবরপূজা বা মৃত বুজুর্গদের কাছে পার্থিব চাওয়া-পাওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা মূলত তাওহীদে উলূহিয়্যাহর চরম লঙ্ঘন।

৩. তাওহীদুল আসমা ওয়াস-সিফাত (নাম ও গুণাবলির একত্ববাদ): পবিত্র কুরআন ও হাদিসে আল্লাহর যে সকল অনন্য গুণাবলির কথা বলা হয়েছে, সেগুলিকে কোনো বিকৃতি বা অপব্যাখ্যা ছাড়াই বিশ্বাস করা। যেমন— অদৃশ্য জগতের জ্ঞান কেবল তাঁরই, দূর ও নিকট থেকে সব আর্তনাদ কেবল তিনিই শোনেন। এসকল গুণের কোনো একটিতে অন্য কাউকে অংশীদার মনে করাই শিরক।

সুরা ফাতিহার এই আয়াতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঈমানকে বিশুদ্ধ রাখতে হলে ইবাদত ও দাসত্বকে কেবল আল্লাহর জন্যই একনিষ্ঠ করতে হবে। লৌকিক মাধ্যমের বাইরে অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তির কাছে ধরনা দেওয়া মূলত আধ্যাত্মিক অবক্ষয়। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওহিদের প্রকৃত জ্ঞান দান করুন এবং শিরকের অন্ধকার থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


তথ্যসূত্র: তাফহীমুল কুরআন ও আহসানুল বায়ান।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button