প্রশাসনমাদক

ইয়াবা কেলেঙ্কারি থেকে শতকোটির সম্পদ ওসি আফতাবের

মুহাম্মাদ জুবাইর: চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিনকে ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে এসেছে। এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগে তাকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করার পর শুরু হওয়া অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার, মাদক কারবারিদের প্রশ্রয়, জমি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আদায়ের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, একসময় সাধারণ জীবনযাপন করা আফতাব উদ্দিন ২০০৮ সালে প্রায় ১৮ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদে পুলিশে যোগ দেন। চাকরিজীবনের শুরু থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ থানায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ৩০ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, নিজের পাশাপাশি স্ত্রী সীমা, মেয়ে আনহা এবং ছেলে আরিয়ানের নামেও বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন তিনি। গাজীপুরের শ্রীপুরে তার নামে প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের একটি ছয়তলা বিলাসবহুল বাড়ি, প্রায় ৪ কোটি টাকা মূল্যের একটি তিনতলা ভবন এবং প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন আরও একটি পাঁচতলা ভবনের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামেও একাধিক জমি, ফ্ল্যাট ও বিনিয়োগের তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়।

অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, সম্পদের প্রকৃত উৎস গোপন করতে তিনি প্রথমে বাবা-মা অথবা শ্বশুর-শাশুড়ির নামে জমি ক্রয় করতেন। পরে হেবা দলিলের মাধ্যমে সেসব সম্পদ নিজের অথবা স্ত্রীর নামে স্থানান্তর করতেন। দীর্ঘদিন ধরে এই কৌশলে বিপুল সম্পদের মালিকানা গোপনের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

দুর্নীতির পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ফারুক নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে জমি কেনার পর আড়াই লাখ টাকা বকেয়া রাখেন তিনি। পাওনা টাকা চাইতে গেলে ওই ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়, মামলার ভয় দেখিয়ে আপস করতে বাধ্য করা এবং প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

একাধিক সূত্রের দাবি, মাদক কারবারিদের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক বজায় রেখে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা নেওয়া, অভিযানে শিথিলতা দেখানো এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার না করার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সাংবাদিকরা তার গ্রামের বাড়িতে গেলে আফতাব উদ্দিনের দেখা মেলেনি। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় তার মা সাংবাদিকদের হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, “আফতাব টাকা ছাড়া কিছু বোঝেন না। বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠলেও প্রভাবের কারণে তিনি পার পেয়ে গেছেন।”

এরই মধ্যে এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগে তাকে কোতোয়ালী থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৮ ডিসেম্বর কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম নগরে আসার পথে এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে এক লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হলেও তা জব্দ দেখিয়ে মামলা করা হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া ইয়াবার চালানটি আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এই অভিযোগ প্রকাশের পর বুধবার রাত ৯টার দিকে ওসি আফতাব উদ্দিনকে কোতোয়ালী থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ওসি আফতাব উদ্দিন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ইয়াবা আত্মসাতের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না এবং তিনি কোনো ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশ মনে করছে, অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় কেবল বিভাগীয় তদন্ত নয়, বরং তার ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের উৎস, ব্যাংক হিসাব, জমি-ফ্ল্যাট, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা উদঘাটন করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button