হাদিসের আলোকে নামাজের সিজদার সুন্নাত পদ্ধতি, দোয়া ও ফজিলত

ইসলামিক বিচিত্রা ডেস্ক: নামাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি রুকন হলো সিজদা। এটি এমন একটি মহিমান্বিত অবস্থা, যেখানে একজন মুমিন বান্দা মহান আল্লাহর সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হতে পারে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে সিজদা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং নিজে যে নিয়মে সিজদা করেছেন, তা হুবহু অনুসরণ করা প্রতিটি মুসলিমের একান্ত কর্তব্য। উপরোক্ত হাদিসসমূহের মাধ্যমে সিজদা করার সঠিক অঙ্গবিন্যাস, সিজদাকালীন পঠিতব্য দোয়া, দুই সিজদার মাঝখানের করণীয় এবং সিজদার ফজিলত অত্যন্ত সহজ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ফুটে উঠেছে, যা আমাদের নামাজকে সুন্নাত পদ্ধতিতে সুন্দর ও নির্ভুলভাবে আদায় করতে সাহায্য করে।
সিজদার জন্য পাথরের টুকরা ঠাণ্ডা করা
হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে জোহরের নামায পড়লাম। আমি এক মুষ্টি পাথর-টুকরা ঠাণ্ডা করার জন্য হাতে নিলাম। অতঃপর আমি তা আমার অন্য হাতে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম। যখন আমি সিজদা করলাম তখন তাহা আমার কপাল রাখার স্থানে রেখেয় দিলাম।
সিজদার জন্য তাকবীর বলা
হযরত মুতারফিক (র.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এবং ইমরান ইবনে হুসাইন, আলী ইবনে আবু তালিব (রা.)-এর পিছনে নামায পড়লাম। তিনি যখন সিজদা করলেন, তখন তাকবীর বললেন, আর যখন তিনি সিজদা হতে মাথা তুললেন, তখন তাকবীর বললেন। যখন দুই রাক’আতের পরে দাঁড়ালেন তখনও তাকবীর বললেন। নামায শেষ হওয়ার পরে ইমরান আমার হাত ধরে বললেন, তিনি [আলী (রা.)] আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, তিনি এমন একটি বাক্য বললেন, যার অর্থ হল- মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামায।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক নীচু হওয়ার সময় এবং উঠার সময় তাকবীর বলতেন। এবং তাঁহার ডানে ও বামে সালাম করতেন। আর আবু বকর এবং উমর (রা.) তা করতেন।
কিরূপে সিজদায় ঝুঁকিবে?
হযরত হাকীম (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বায়’আত গ্রহণ করেছি এই কথার উপরে যে, আমি সোজা হয়ে দাঁড়ানো অবস্থা ছাড়া সিজদার জন্য নীচু হব না।
সিজদার জন্য হাত উঠানো
হযরত মালিক ইবনে হুয়াইরিছ (রা.) হতে বর্ণিত যে, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নামাযে উভয় হাত উঠাতে দেখেছেন। যখন তিনি রুকূ করতেন, যখন রুকু হতে তাঁর মাথা তুলতেন আর যখন সিজদা করতেন এবং সিজদা হতে মাথা উঠাতেন তাঁর হাতদ্বয় তাঁর উভয় কানের লতি বরাবর হতো।
হযরত মালিক হ সাল্লাল্লাহু ইবনে হুয়াইরিছ (রা.) হতে বর্ণিত যে, তিনি নবী করীম আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নামাযে উভয় হাত উঠাতে দেখেছেন। অতঃপর পর তিনি পূর্ববৎ উল্লেখ করলে ইবনে হুয়াইরিছ (রা.) হতে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামাজ আরম্ভ করতেন, এর পর তিনি অনুরূপ বর্ণনা করলেন, তাতে অতিরিক্ত বাড়িয়েছেন- আর যখন তিনি রুকু করলেন, এরূপ করলেন। আর যখন রুকু হতে তাঁর মাথা উঠালেন, এরূপ করলেন, আর যখন তিনি সিজদা হতে স্বীয় মাথা তুললেন, অনুরূপ করলেন।
সিজদায় হাত না উঠানো
হযরত ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামায় আরম্ভ করতেন তখন তাঁর হাতদ্বয় উঠাতেন আর যখন রুকু করতেন এবং রুকু হতে (মাথা) উঠাতেন। আর তিনি সিজদায় এরূপ করতেন না।
সিজদায় সর্বাগ্রে যেই অঙ্গ যমীনে পৌঁছাবে
হযরত ওয়ায়িল ইবনে হুজর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছি, যখন তিনি সিজদা করতেন তখন তাঁর হাতদ্বয়ের পূর্বে তাঁর উভয় হাঁটু (যমীনে) স্থাপন করতেন। আর যখন উঠাতেন তখন হাঁটুর পূর্বে উভয় হাত উঠাতেন হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ নামাযে বসতে চায় এর পর সে এমনভাবে বসে, যেভাবে উট বসে। ১ হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন সিজদা করে তখন সে যেন হাঁটু স্থাপনের পূর্বে তার উভয় হাত স্থাপন করে আর সে যেন উটের বসার মতো না বসে
সিজদায় মুখমণ্ডলের সাথে উভয় হাত স্থাপন করা
হযরত ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, উভয় হাতও সিজদা করে যেরূপ মুখমণ্ডল সিজদা করে। অতএব, যখন তোমাদের কেহ তার মুখমণ্ডল স্থাপন করে তখন সে যেন তাহার উভয় হাত স্থাপন করে। আর যখন তা উঠাবে তখন উভয় হাতকেও উঠাবে।
কত অঙ্গের উপর সিজদা?
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদিষ্ট হয়েছেন সাত অঙ্গের উপর সিজদা করতে। আর তাঁর কাপড় ও চুল একত্র না করতে। হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.) হইতে বর্ণিত যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, যখন কোন বান্দা সিজদা করে তখন তার সপ্ত অঙ্গ সিজদা করে। তার মুখমণ্ডল, উভয় হাতের তালু উভয় হাঁটু এবং তার উভয় পা।
নাকের উপর সিজদা
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি আদিষ্ট হয়েছি সাত অঙ্গের উপর সিজদা করতে। আর যেন আমি চুল ও কাপড় একত্রে করে না রাখি (সেই সাত অঙ্গ হচ্ছে) ললাট, নাক, উভয় হাত, উভয় হাঁটু এবং উভয় পা।
দুই হাতের উপর সিজদা
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সাত অঙ্গের উপর সিজদা করতে আদিষ্ট হয়েছি। ললাটের উপর, নাকের উপর এবং দুই হাঁটু দুই হাত এবং দুই পায়ের প্রান্তের উপরে, এবং তিনি হাত দ্বারা ইঙ্গিত করলেন।
হাঁটুর উপর সিজদা
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হইতে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাত অঙ্গের উপরে সিজদা করতে আদিষ্ট হয়েছেন এবং চুল ও কাপড় একত্র করে রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। ঐ সাত সঙ্গ হইল- হাতদ্বয়, উভয় হাঁটু এবং পায়ের আঙ্গুলের কিনারা। সুফিয়ান বলেন, ইবনে তাউস তাঁর হাতদ্বয় তাঁর ললাটের উপরে রাখলেন এবং ইহা তাঁর নাকের উপর ঘুরালেন এবং আমাদের বললেন, ইহা হল একটা। ইমাম নাসাঈ (র) বলেনঃ আমি এই হাদীস দুই ব্যক্তি হতে শুনেছি- মুহাম্মদ ইবনে মানসূর ও আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ। তবে এই হাদীসের শব্দমালা মুহাম্মদ ইবনে মানসূরের। ১. উট বসার সময় প্রথমে দুই হাত জমিনের উপর রাখে। অতঃপর পা রাখে। এই হাদীস দ্বারা বোঝা যায় যে, নামাযে সিজদা করবার সময় প্রথমে জমিনে হাঁটু রাখতে হবে, অতঃপর পা। অধিকাংশ ইমাম এই মত পোষণ করেন।
উভয় পায়ের উপর সিজদা করা
হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.) হতে বর্ণিত যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, যখন কোন বান্দা সিজদা করে তখন তার সাথে সাত অঙ্গ সিজদা করে: তার চেহারা, তাহ দুই হাতের তালু, দুই হাঁটু এবং দুই পা।
সিজদায় উভয় পায়ের আঙ্গুল খাড়া করে রাখা
হযরত আবূ হুমায়দ সাঈদী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সিজদার জন্য যমীনের দিকে যাইতেন, তখন তিনি তাঁর উভয় বাহু উভয় বগল হতে পৃথক রাখতেন এবং তাঁর পায়ের আঙ্গুল খাড়া করি রাখতেন। (সংক্ষিপ্ত)
সিজদায় হাতের স্থান
হযরত ওয়ায়িল ইবনে হুজর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মদীনায় এসে বললাম, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামায প্রত্যক্ষ করব। তিনি তাকবীর বলিলেন এবং তাঁর হাতদ্বয় তুললেন যাতে দেখলাম তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় তাঁর কানের নিকটে। যখন তিনি রুকু করতে ইচ্ছা করলেন তখন তাকবীর বললেন এবং তাঁর হাতদ্বয় তুললেন। অতঃপর তাঁর মাথা উঠালেন এবং বললেন, সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ্। আর তাকবীর বল-লেন এবং সিজদা করলেন। তখন তাঁর হাতদ্বয় কানের ঐস্থানে ছিল যেখানে নামায আরম্ভ করার সময় ছিল।
সিজদায় বাহুদ্বয় বিছিয়ে দেয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা
হযরত আনাস (রা.) সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন সিজদায় তার বাহুদ্বয় বিছিয়ে না দেয়, যেমন কুকুর বিছিয়ে দিয়ে থাকে।
সিজদা করার নিয়ম
হযরত আবু ইসহাক (র.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বারা (রা.) আমাদেরকে সিজদার নিয়ম বর্ণনা করতে যাইয়া তাঁর হাতদ্বয় মাটিতে স্থাপন করলেন এবং তাঁর নিতম্ব উঠিয়ে রাখলেন এবং বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এরূপ করতে দেখেছি। হযরত বারা (রা.) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামায পড়তেন তখন প্রত্যেক অঙ্গ পৃথক পৃথক রাখতেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মালিক ইবনে বুহায়না (রা.) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামায পড়তেন তখন তাঁর হাতদ্বয় এমনভাবে পৃথক রাখতেন যে, তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখা যেত। হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে থাকতাম (যখন তিনি সিজদায় থাকতেন) তা হলে তাঁর বগল দেখতে পেতাম। (এই পরিমাণ তিনি বাহুদ্বয়কে খোলা রাখতেন)। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আকরাম (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল-ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এক সাথে নামায আদায় করেছি। তিনি যখন সিজদা করতেন আমি তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখতে পেতাম।
সিজদায় অঙ্গ পৃথক করে রাখা
হযরত মায়মূনা (রা.) হতে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সিজদা করতেন তখন তাঁর হাতদ্বয় পৃথক রাখতেন। এমনকি যদি একটি বকরীর বাচ্চা তাঁর হাতদ্বয়ের নীচ দিয়ে যেতে চাইত যেতে পারত।
সিজদায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করা
হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: তোমরা সিজদায় মধ্যপন্থা অবলম্বন কর। তোমাদের কেউ যেন, তার বাহুদ্বয় কুকুরের ন্যায় বিছিয়ে না রাখে।
সিজদায় পিঠ সোজা রাখা
হযরত আবূ মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ঐ নামায পূর্ণ হয় না, যেই নামাযে কোন ব্যক্তি রুকু ও সিজদায় তার পিঠ সোজা রাখে না।
কাকের ন্যায় ঠোকর মারার প্রতি নিষেধাজ্ঞা
হযরত আবদুর রহমান ইবনে শিল্প (রা.) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনটি কাজ হতে নিষেধ করেছেন। কাকের ন্যায় ঠোকর মারা হতে, চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় হাত বিছিয়ে দেয়া হতে এবং কোন ব্যক্তির একস্থানকে নামাযের জন্য নির্দিষ্ট করা হইত যেরূপ উট কোন স্থান নির্দিষ্ট করে লয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি সাত অঙ্গে সিজদা করতে এবং নামাযে চুল অথবা কাপড় একত্র করে না রাখার জন্য আদিষ্ট হয়েছি।
চুলে বেণী করে নামায আদায়কারীর উদাহরণ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত যে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে হারিসকে নামায পড়াতেন। তখন তাঁর মাথা পিছন দিক হতে বেণী করা ছিল। তিনি দাঁড়িয়ে তা খুলতে লাগলেন। নামায শেষ করে তিনি ইবনে আব্বাসের দিকে ফিরে বললেন, আমার মাথার সাথে তোমার কি সম্পর্ক? তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, এর উদাহরণ ঐ ব্যক্তির না্যয়, যে নামায পড়ে আর তার উভয় হাত বাঁধা থাকে।
সিজদায় কাপড় একত্র করার উপর নিষেধাজ্ঞা
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লার আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদিষ্ট হয়েছেন সাত অঙ্গের উপর সিজদা করতে। এবং তাঁহাকে নিষেধ করা হয়েছে চুল ও কাপড় একত্র করে রাখতে।
কাপড়ের উপর সিজদা করা
হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন দুপুরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে নামায পড়তাম তখন আমরা উত্তাপনাদে হতে রক্ষা পাবার জন্য আমাদের কাপড়ের উপরে সিজদা করতাম।
সিজদা পূর্ণ করার আদেশ
হযরত আনাস (রা.)-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন: তোমরা রুকূ এবং সিজদা পূর্ণভাবে আদায় কর। আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদেরকে আমার পিছন হতে তোমাদের রুকূতে এবং তোমাদের সিজদায় দেখে থাকি।
সিজদায় কুরআন পাঠ করার প্রতি নিষেধাজ্ঞা
হযরত আলী ইবনে আবূ তালিব (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার বন্ধু আমাকে তিনটি কাজ হতে নিষেধ করেছেন। আমি বলি না যে, লোকদের নিষেধ করেছেন তিনি আমাকে নিষেধ করেছেন সোনার আংটি পরিধান করতে, রেশম মিশ্রিত কাপড়, কুসুম রংয়ের কাপড় এবং গাঢ় লাল রংয়ের কাপড় পরিধান করতে। আর আমি যেন রুকূ এবং সিজদা অবস্থায় কুরআন পাঠ না করি। হযরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নিষেধ করেছেন, রুকূ এবং সিজদা অবস্থায় কুরআন পাঠ করতে।
সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করার নির্দেশ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেই অসুখে ইনতিকাল করেন, সেই অসুস্থ অবস্থায় তিনি পর্দা খুলিলেন, তখন তাঁর মাথায় পট্টি বাঁধা ছিল। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আমি পৌছে দিয়াছি, এই কথা তিনবার বললেন। বস্তুত যথার্থ স্বপ্ন ব্যতীত নবুওয়তের সুসংবাদ হতে আর কিছুই বাকি রইল না। বান্দা উহা দেখে থাকে অথবা তাকে উহা দেখানো হয়। তোমরা শুনে রাখ, আমাকে রুকূ এবং সিজদায় কিরাআত হতে নিষেধ করা হয়েছে। অতএব, যখন তোমরা রুকু করবে তখন তোমাদের রবের তা’যীম করবে। আর যখন তোমরা সিজদা করবে তখন তোমরা বেশি বেশি দোয়া করার চেষ্টা করবে। কেননা, ইহাই তোমাদের দোয়া কবুলের উপযুক্ত সময়। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি তোমাদের খালা মায়মুনা বিনতে হারিছের নিকট রাত্র যাপন করলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাঁর নিকট রাত্র যাপন করলেন। আমি তাঁকে দেখলাম, তিনি তাঁর প্রয়োজনে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি পানির পাত্রের নিকট এসে তার ঢাকনা খুললেন। তার পর, তিনি উযু করলেন এক ধরনের (অর্থাৎ হাত ধুইলেন) পরে তিনি তাঁর বিছানায় এসে নিদ্রা গেলেন। এর পর তিনি পুনরায় ঘুম হতে জাগলেন এবং পানির পাত্রের নিকট এসে তার ঢাকনা খুলে পূর্ণ উযু করলেন (নামাযের উযুর ন্যায়)। অতঃপর দাঁড়িয়ে নামায পড়লেন এবং তিনি সিজদায় বলেছিলেন,
اللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِي نُورًا وَاجْعَلْ فِي سَمَعِي نُورًا وَاجْعَلْ فِي بَصَرِي نُورًا وَاجْعَلْ مِنْ تَحْتِى نُورًا وَاجْعَلْ مِنْ فَوْقِى نُورًا وَعَنْ يَمِينِي نُورًا وَعَنْ يَسَارِي نُورًا وَاجْعَلْ أَمَامِي نُورًا وَاجْعَلْ خَلْفِى نُورًا وَاعْظِمْ لِى نورا
এর পর তিনি নিদ্রা গেলেন, এমন কি তিনি নাকের শব্দ করলেন। পরে বিলাল (রা.) আসিয়া তাঁকে নামাযের জন্য জাগালেন।
সিজদায় অন্য প্রকার দোয়া
হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইছি ওয়াসাল্লাম রুকু এবং সিজদায় বলতেনঃ
سُبحَانَكَ اللهم ربنا وبحمدك اللهم اغفر لى
এর দ্বারা তিনি কুরআনের মর্ম বর্ণনা করতেন। (অর্থঃ মহিমা আপনার তে আমাদের প্রতিপালক। এবং আপনার প্রশংসাসহ, হে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিন।)
সিজদায় অন্য প্রকার দোয়া
হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত। (একরাত্রে) আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর বিছানায় না পেয়ে হাতড়ে তালাশ করতে লাগলাম। আমি মনে করেছিলাম তিনি তাঁর কোন দাসীর নিকট গিয়ে থাকবেন। এমতাবস্থায় আমার হাত তাঁর উপর পড়িল, তখন তিনি সিজদাঃ থেকে বলেছিলেন,
اللهُمَّ اغْفِرْ لِي مَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমাকে মাফ করে দিন। যা আমি গোপনে এবং যা আমি প্রকাশ্যে করেছি। হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে না পেয়ে মনে করলাম তিনি হয়ত তাঁর কোন দাসীর নিকট গিয়ে থাকবেন। তাঁকে খুঁজে দেখলাম, তিনি সিজদারত অবস্থায় বলছেন-
رَبِّ اغْفِرْ لِي مَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ
হযরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসায়নি যখন সিজদা করতেন, তখন বলতেন:
اللَّهُمَّ لَكَ سَجَدَتْ وَلَكَ أَسْلَمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ سَجَدَ اجْبِيَ لِلَّذِي خَلَقَهُ وَصُوَّرَهُ فَأَحْسَنَ صُورَتِهِ وَشَقَ سقعه وَ بَصَره تبارك الله احسن الخالقين
অর্থঃ আমি আপনাকেই সিজদা করলাম, আপনার কাছেই আত্মসমর্পণ করলাম। আপনার প্রতিই ঈমান আনলাম। আমার চেহারা সিজদা করল তাঁকে যিনি তা সৃষ্টি করেছেন। তাঁকে আকৃতি দান করেছেন এবং তার আকৃতিকে সুষমামণ্ডিত করেছেন। তার শ্রবণ দর্শন বিদীর্ণ করেছেন রবকতময় আল্লাহ। যিনি সুন্দরতম স্রষ্টা। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) সূত্রে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি সিজদায় বলতেন:
اللهُمَّ لَكَ سَجَدْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَلَكَ أَسْلَمْتُ وَأَنْتَ رَبِّي سَجَدَ وَجْهِيَ اللَّذِي خَلَقَهُ وَصَورَهُ وَشَقَ سَمْعَه وَبَصَرَه تَبَارَكَ اللهُ أَحْسَنَ الْخَالِقِينَ.
১১৩১. মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) হইতে বর্ণিত যে, রাত্রে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নফল নামাযে দাঁড়াইতেন। তখন সিজদায় বলিতেন-
اللَّهُمَّ لَكَ سَجَدْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَلَكَ أَسْلَمْتُ أَنْتَ رَبِّي سَجَدَ وَجْهَى لِلَّذِي خَلَقَهُ وَصَوَرَهُ وَشَقَ سَمعَه وَبَصَره تَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنَ الْخَالِقِينَ.
অন্য প্রকার দোয়া
হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক রাত্রে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে না পেয়ে পরে তাঁকে সিজদারত অবস্থায় পেলাম; তাঁর পদদ্বয়ের আঙ্গুলসমূহ ছিল কিবলার দিকে। তাঁকে বলতে শুনলাম-
أعوذ برضاك مِنْ سَخَطِكَ وَاَعُوذُ بمُعَافَتكَ مِنْ عُقُوبَتِكَ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْكَ لا احصى ثَنَاءً عَلَيْكَ انْتَ كَمَا اثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ
অন্য প্রকার দোয়া
হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক রাত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে না পেয়ে মনে করলাম তিনি তাঁর অন্য কোন বিবির নিকট গিয়ে থাকবেন। হাতড়ে দেখলাম তিনি রুকূ অথবা সিজদা অবস্থায় বলেতেছেনঃ
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتُ
তখন আমি বললাম, আমার মাতা-পিতা আপনার উপর উৎসর্গ হউক। আমি এক অবস্থায় ছিলাম আর আপনি আছেন অন্য অবস্থায়।
সিজদায় অন্য প্রকার দোয়া
হযরত আউফ ইবনে মালিক (রা.) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে উঠলাম। তিনি মিসওয়াক করতে আরম্ভ করলেন। তার পর উযু করে দাঁড়িয়ে নামায পড়লেন। তিনি শুরুতেই সূরা বাকারা আরম্ভ করলেন। তিনি কোন রহমতের আয়াতে পৌঁছলে তাতে দোয়া না করে ছাড়তেন না। আর কোন আযাবের আয়াতে পৌঁছলে সেখান থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করতেন। অতঃপর তিনি রুকূ করলেন, রুকৃতে তিনি কিয়ামের অনুপাতে অবস্থান করলেন। তিনি রুকূতে বলেছিলেন:
سُبْحَانَ ذِي الْجَبَرُوتِ وَالْمَلَكُوتِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْعَظْمَةِ
অতঃপর তিনি এক রাক’আতের সমপরিমাণ সময় সিজদা করলেন। আর তিনি সিজদায় বলেছিলেন
ذِي الْجَبَرُوتِ وَالْمُلْكُوتِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْعَظْمَةِ
অতঃপর তিনি আলে-ইমরান পাঠ করলেন। তাহার পর এক সূরা অতঃপর আর এক সূরা এইরূপ করলেন। (নাসাঈ শরীফ)
অন্য প্রকার দোয়া
হযরত হুয়ায়ফা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক রাত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে নামায পড়লাম। তিনি সূরা বাকারা আরম্ভ করলেন এবং একশত আয়াত পড়লেন। তিনি রুকু না করে সামনে চললেন। আমি বলিলাম, তাহা দুই রাক’আতে শেষ করিবেন ও অতঃপর রুকু করিবেন। তিনি চলতে থাকলেন, এমনকি সূরা নিসা শেষ করলেন। অতঃপর সুরা আলে-ইমরান। অতঃপর তিনি রুকু করলেন তাঁর কিয়ামের কাছাকাছি সময় লইয়া। তিনি রুকূতে বলেছিলেন:
سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ ثم
পরে তিনি তাঁর মাথা উঠালেন এবং বললেন,:
سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ
এর পর বেশ কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকলেন। অতঃপর সিজদা করলেন এবং সিজদা লম্বা করলেন। আর তিনি সিজদায় বলেছিলেন,:
رَبِّي الأعل سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى سُبْحَانَ رَبِّي الْأَعْلَى سُبْحَانَ
তিনি আল্লাহর ভয় অথবা তাযীমের আয়াতে পৌঁছলেই তাঁহাকে স্মরণ করতেন।
অন্য প্রকার দোয়া
হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকু এবং সিজদায় বলতেন: সুব্বহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রুহু।
বান্দা যে অবস্থায় আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী হয়
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বান্দা আল্লাহ তা’আলার অধিক নিকটবর্তী হয়, যেই অবস্থায় সে সিজদারত থাকে। অতএব, তখন তোমরা অধিক দোয়া করতে থাক।
সিজদার ফযীলত
হযরত রাবি’আ ইবনে কা’ব আসলামী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, অগ্রি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তাঁর উযুর পানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস লইয়া আসতাম। একদিন তিনি আমাকে বললেন তুমি আমার নিকট কিছু চাও। আমি বললাম, আমি বেহেশতে আপনার সং কামনা করি। তিনি বললেন, ইহা ছাড়া অন্য কিছু কি চাও? আমি বললাম, ব ইহাই। তিনি বললেন, তাহা হলে তুমি অধিক সিজদা দ্বারা তোমার এই কাজে আমাকে সহায়তা কর।
যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য একটি সিজদা করল তার সওয়াব
হযরত মা’দান ইবনে তালহা ইয়ামারী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আযাদকৃত দাস সাওবানের সাথে ছড় সাক্ষাৎ করলাম। আমি বললাম, আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলুন। আমার উপকারে আসবে অথবা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। তিনি আমার দ জবাব না দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। অতঃপর আমার প্রতি লক্ষ্য করে বলজে এসে আপনি সিজদা করতে থাকুন। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই। হাম ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে বান্দা আল্লাহর উদ্দেশ্য একটা সিজদা করাং আল্লাহ তা’আলা বিনিময়ে তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। আর এর স্বর তার একটি গুনাহ্ মুছে ফেলবেন। মা’দান (রা.) বলেন, অতঃপর আমি আকু দারদার সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং তাঁকেও ঐ প্রশ্ন করিলাম যা আমি সাওদে (রা.)-কে করেছিলাম তিনিও আমাকে বললেন, আপনি সিজদাকে অবশ করণীয়রূপে গ্রহণ করুন। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে কোন বান্দা আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি সিজদ করে, আল্লাহ তা’আলা তার একটি মর্যদা বৃদ্ধি করেন এবং এর দ্বারা তা একটি গুনাহ্ মার্জনা করেন।
সিজদার স্থান
হযরত আতা ইবনে ইয়াযীদ (র.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবু হুরায়রা (রা.) এবং আবূ সাঈদ (রা.)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তাঁদের একজন শাফা’আতের হাদীস বর্ণনা করলেন, আর অন্যজন ছিলেন নিশ্চুপ। তিনি বলেন, অতঃপর ফেরেশতা এসে সুপারিশ করবেন এবং রাসূলগণ সুপারিশ করবেন অতঃপর তিনি পুলসিরাতের উল্লেখ করে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যাদেরকে অনুমতি দেয়া হবে তাঁদের মধ্যে আমি-ই হবো প্রথম। তার পর যখন আল্লাহ তা’আলা তাঁর সৃষ্টির বিচারকার্য হতে অবসর গ্রহণ করবেন এবং দোযখ হতে যাকে বের করতে ইচ্ছা করবেন তাকে বের করবেন। আল্লাহ তা’আলা ফেরেশতা ও রাসূলগণকে আদেশ করবেন সুপারিশ করবার জন্য। তখন তাঁরা তাদের চিহ্ন দ্বারা চিনে নিবেন যে, আদম সন্তানের সিজদার স্থান ব্যতীত আর সব কিছুই আগুন জ্বালিয়ে ফেলেছে। অতঃপর তাদের উপর আবে হায়াত ঢেলে দেয়া হবে। তখন তারা নবজীবন লাভ করবে যেরূপ স্রোতের ধারে বীজ গজিয়ে উঠে।
এক সিজদা অন্য সিজদা হতে দীর্ঘ হওয়া
হযরত শাদ্দাদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ইশার নামাযে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে বের হয়ে আসলেন। তখন তিনি হাসান অথবা হুসায়েন (রা.)-কে বহন করে আনছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে অগ্রসর হয়ে তাঁকে রেখে দিলেন। এর পর নামাযের জন্য তাকবীর বেিলন ও নামায পড়লেন। নামাযের মধ্যে একটি সিজদা দীর্ঘ করলেন। (হাদীসের অন্যতম রাবী আবদুল্লাহ বলেন), আমার পিতা (শাদ্দাদ) বলেন, আমি আমার মাথা তুললাম এবং দেখলাম, ঐ ছেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিঠের উপর রয়েছেন। আর তিনি সিজদারত। অতঃপর আমি আমার সিজদায় গেলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায শেষ করলে লোকেরা বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আপনার নামাযের মধ্যে একটি সিজদা এতো দীর্ঘ করলেন যাতে আমরা ধারণা করলাম, হয়ত কোনো ব্যাপার ঘটে থাকবে। অথবা আপনার উপর অহী নাযিল হচ্ছে। তিনি বললেন, এর কোনটাই ঘটে নাই বরং আমার ঐ সন্তান আমাকে সওয়ারী বানিয়েছে। আমি তাড়াতাড়ি উঠতে অপছন্দ করলাম, যেন সে তার কাজ সমাধা করতে পারে।
সিজদা হতে মাথা উঠাবার সময় তাকবীর বলা
হযরত আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, তিনি (নামাযের মধ্যে) প্রত্যেক নীচু হওয়ার সময় এবং মাথা উত্তোলনের সময় আর প্রত্যেক দাঁড়ানো এবং বসবার সময় তাকবীর বলতেন এবং তিনি ডান ও বাম দিকে আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ বলে সালাম করতেন। তখন তাঁর চেহারার শুভ্রতা দেখা যেত। রাবী বলেন, আর আমি আবূ বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-কেও এরূপ দেখেছি।
প্রথম সিজদা হতে মাথা উঠাবার সময় হাতদ্বয়
হযরত মালিক ইবনে হুয়ায়রিছ (রা.) হতে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাছ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামাযে প্রবেশ করতেন তখন তাঁর হাতদ্বয় উঠাতেন যখন রুকু করতেন ঐরূপ করতেন, আর যখন রুকু হতে মাথা উঠাতেন তখনও ঐরূপ করতেন। আর যখন সিজদা হতে তাঁর মাথা উঠাতেন তখনও এ করতেন অর্থাৎ তাঁর হাতদ্বয় উঠাতেন।
দুই সিজদার মাঝে হাত না উঠানো
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামায আরম্ভ করতেন তখন তাকবীর বলতেন এবং তাঁর উভয় হাত উঠাতেন, আর যখন রুকু করতেন এবং রুকুর পরেও। আর তিনি হাত উঠাতেন না দুই সিজদার মাঝে।
দুই সিজদার মধ্যে দোয়া
হযরত হুযায়ফা (রা.) হতে বর্ণিত যে, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়া তাঁহার পাশে দাঁড়ালেন। তিনি বলেন,
اللهُ أَكْبَرُ ذُو الْمَلَكُوتِ وَالْجَبَرُوتِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْعَظْمَةِ
অতঃপর তিনি সূরা বাকারা পড়তে আরম্ভ করলেন, পরে তিনি রুকু করলেন। তাঁর রুকু তাঁর কিয়ামের প্রায় বরাবর ছিল। তিনি রুকুতে বললেন-: সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম। আর যখন তিনি মাথা উঠাইলেন, তখন বললেন, লি রাব্বিল হামদ লি রাব্বিল হামদ। আর যখন সিজদায় গমন করতেন তখন বলতেন-
سُبْحَانَ رَبِّي الأعلى سُبْحَانَ رَبِّي الأعلى
আর তিনি তাঁর দুই সিজদার মধ্যে বলতেন- রাব্বিগফিরলী রাব্বিগফিরলী।
দুই সিজদার মধ্যে চেহারা বরাবর হাত উঠানো
হযরত নযর ইবনে কাসীর আব্বু সাহল আযদী (র.) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
আবদুল্লাহ ইবনে তাউস (র.) মিনায় মসজিদে খায়ফে আমার পাশে নামায পড়লেন। যখন তিনি প্রথম সিজদা করতেন এবং সিজদা হতে মাথা উঠাতেন, তখন তিনি তাঁর চেহারা বরাবর তাঁর উভয় হাত উঠাতেন। তা আমার না-পছন্দ হওয়ায় আমি উহায়েব ইবনে খালিদকে বললাম, এই ব্যক্তি এমন কিছু করেছে যা আমি কাউকেও করতে দেখি নাই। উহায়েব তাঁকে বললেন, আপনি এমন কিছু করেছেন যা আমরা কাউকেও করতে দেখি নাই, তখন আবদুল্লাহ ইবনে তাউস বললেন, আমি আমার পিতাকে উহা করতে দেখেয়ছ। আর আমার পিতা বলেছেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে এরূপ করতে দেখেছি। আর আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেছেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এরূপ করতে দেখেছি।
দুই সিজদার মধ্যে কিভাবে বসবে?
হযরত মায়মুনা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সিজদা করতেন তখন তাঁহ হাত দুখানা এতো দূরে রাখতেন যে, তাঁর পিছনের দিক হতে তাঁর বগলদ্বয়ের শুভ্রতা দেখা যেত। আর যখন তিনি বসতেন তখন তিনি তাঁর বাম উরুর উপর স্থির হয়ে বসতেন।
দুই সিজদার মধ্যে বসবার পরিমাণ
হযরত বারা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামাযে তাঁর রুকু-সিজদা এবং রুকূ হতে মাথা উঠানোর পরে দাঁড়ানো এবং দুই সিজদার মধ্যবর্তী সময় প্রায় বরাবর হতো।
সিজদার জন্য তাকবীর বলা
হযরত আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর, উমর ও উসমান (রা.) (মাথা) উঠাবার সময়, সিজদার সময়, দাঁড়াবার সময় এবং বসবার সময় তাকবীর বলতেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামাযে দাঁড়াতেন তখন তাকবীর বলতেন। অতঃপর যখন রুকু করতেন তখনও তাকবীর বলতেন। যখন তিনি রুকু হতে স্বীয় পিঠ উঠাতেন তখন বলতেন: সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ এর পর যখন তিনি সিজদার জন্য নীচু হতেন, তখনও তাকবীর বলতেন। অতঃপর যখন তিনি মাথা তুলতেন তখন তাকবীর বলতেন। তার পর তিনি সম্পূর্ণ নামাযে এরূপ করতেন এবং নামায শেষ করতেন। আর তিনি দুই রাক’আতের পরে বসা হতে যখন দাঁড়াতেন তখন তাকবীর বলতেন।
দুই সিজদার পরে উঠার সময় সোজা হয়ে বসা
হযরত আবু কিলাবা (র.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু সুলায়মান মালিক ইবনে হুয়াইরিছ (রা.) আমাদের মসজিদে এসে বললেন, আমি তোমাদেরকে দেখাতে ইচ্ছা করি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি কিরূপে নামায পড়িতে দেখেছি। (এর পর তিনি নামায পড়লেন) তিনি যখন প্রথম রাক’আতে শেষ সিজদা হতে মাথা তুললেন তখন বসয়া পড়িলেন। হযরত মালিক ইবনে হুয়াইরিছ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল-ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নামায পড়তে দেখেছি। তিনি যখন তাঁর নামাযে বে-জোড় রাক’আত আদায় করতেন তখন সোজা হয়ে বসে উঠতেন না।
উঠার সময় মাটিতে ঠেক লাগানো
হযরত আবু কিলাবা (র.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মালিক ইবনে হুয়াইরিছ (রা.) আমাদের নিকট এসে বলতেন, আমি কি তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামায সম্বন্ধে রেওয়ায়াত করব না? তার পর তিনি নামাযের সময় ছাড়াই (নফল) নামায পড়তেন। যখন তিনি প্রথম রাক’আতে দ্বিতীয় সিজদা হতে মাথা উঠাতেন, তখন সোজা হয়ে বসতেন। অতঃপর মাটিতে ঠেক দিয়ে দাঁড়াতেন।
হাঁটু উঠানোর পূর্বে হাত উঠানো
হযরত ওয়ায়িল ইবনে হুজর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছি, যখন তিনি সিজদা করতেন তখন তাঁর হাঁটুদ্বয় উভয় হাতের পূর্বে রাখতেন। আর যখন তিনি উঠাতেন তখন উভয় হাঁটু উঠানোর পূর্বে উভয় হাত উঠাতেন। আবূ আবদুর রহমান বলেন, ইয়াযীদ ইবনে হারূন ছাড়া আর কেহ এই হাদীস শরীফ (জনৈক রাবী) হতে রেওয়ায়াত করেন নাই। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
উঠার জন্য তাকবীর বলা
হযরত আবূ সালমা (র.) হতে বর্ণিত। আবূ হুরায়রা (রা.) তাঁদেরকে (সাহাবীদের) লইয়া নামায পড়তেন। তিনি যখনই উঠতেন বা নীচু হতেন তখনই তাকবীর বলতেন। নামায শেষ করিয়া তিনি বলিতেন, আল্লাহর শপথ! তোমাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামাযের সাথে আমার নামায অধিক সামঞ্জস্যশীল।
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ বয়সে সম্ভবত বার্ধক্যজনিত কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে এইরূপ করিয়াছিলেন। হযরত আবূ বকর ইবনে আবদুর রহমান এবং আবূ সালমা ইবনে আবদুর রহমান (র.) হতে বর্ণিত। তাঁরা উভয়ে আবূ হুরায়রা (রা.)-এর পিছনে নামায পড়েন। যখন তিনি রুকু করলেন তখন তাকবীর বললেন। যখন মাথা উঠালেন তখন বললেন: সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ, রাব্বানা ওয়ালাকাল হামদু অতঃপর সিজদা দিতে তাকবীর বললেন এবং যখন তাঁর মাথা উঠালেন তখনও তাকবীর বললেন। অতঃপর এক রাক’আতের পরে যখন দাঁড়ালেন তখন তাকবীর বল-লেন। পরে বললেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁহার শপথ! আমি তোমাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে অধিক সামঞ্জস্যশীল। পৃথিবী ত্যাগ করা পর্যন্ত তাঁর নামায এরূপই ছিল।



