বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে কুরআনের আয়াতে বিশেষ বার্তা দিল ইরান

অনলাইন ডেস্ক: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির উপস্থিতিতে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় জানাজা ও শোক অনুষ্ঠানটি কেবল ধর্মীয় রীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি হয়ে উঠেছিল এক অনন্য ‘কূটনৈতিক মঞ্চ’। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের সামনে পবিত্র কুরআনের ভিন্ন ভিন্ন আয়াত তিলাওয়াতের মাধ্যমে ইরান বৈশ্বিক রাজনীতি ও মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থান নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং জোরালো প্রতীকী বার্তা প্রদান করেছে।
সৌদি আরবের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে সুরা আলে ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, যেখানে বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ‘সত্য ও মিথ্যার’ মুখোমুখি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ইরান নিজেকে হকের পথে দাবি করে এবং আমেরিকার মিত্র সৌদি আরবের বর্তমান নিষ্ক্রিয়তাকে পরোক্ষভাবে ‘বাতিল’ শিবিরের কাছাকাছি বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
অন্যদিকে, তুরস্কের প্রতিনিধিদের সামনে সুরা আন-নিসার ৯৫ নম্বর আয়াত পাঠ করা হয়। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে— যারা কোনো কারণ ছাড়াই ঘরে বসে থাকে এবং যারা জান-মাল দিয়ে লড়াই করে, তারা কখনো সমান হতে পারে না। এর মাধ্যমে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে কেবল মৌখিক সমর্থনের কড়া সমালোচনা করেছে তেহরান। ইরানের বার্তাটি ছিল স্পষ্ট— শুধু কথায় নয়, বরং ময়দানে সশরীরে উপস্থিত থাকাই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
আফগানিস্তানের প্রতিনিধিদল অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলে ইরান তাদের সুরা আল-ফাতহ-এর প্রথম আয়াতটি শোনায়— “নিশ্চয়ই আমি আপনাকে একটি স্পষ্ট ও পরিপূর্ণ বিজয় দান করেছি।” দীর্ঘ দুই দশকের যুদ্ধের পর মার্কিন বাহিনীকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করায় আফগানদের এই রাজনৈতিক ও সামরিক বিজয়কে স্বীকৃতি দিতেই ইরান এই সম্মানজনক আয়াতটি বেছে নেয়।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জন্য পঠিত আয়াতটি ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক। সুরা আল-বাকারার ১৪৩ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘উম্মাতান ওয়াসাতান’ বা ‘মধ্যপন্থী জাতি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া এই বার্তার মূল অর্থ হলো— বাংলাদেশ কোনো বৈশ্বিক মেরুকরণে বা আগ্রাসী যুদ্ধে জড়ায়নি। বাংলাদেশ যেমন ফিলিস্তিনের অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন, তেমনি বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় মধ্যপন্থা বজায় রাখছে। বাংলাদেশের এই ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রতি তেহরান এর মাধ্যমে গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছে।
অনুষ্ঠানে কাতারকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার এবং পাকিস্তানকে পরাশক্তির ভয় না পেয়ে সত্যের পথে অটল থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ইরান সমর্থিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’— হামাস, হিজবুল্লাহ এবং হুথিদের জন্য বীরত্ব ও শাহাদাতের ফজিলত সংবলিত আয়াত পাঠ করা হয়। তাদের পরাজয়হীন চেতনা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ পুরস্কারের সুসংবাদ দিয়ে ইরান মূলত এই গোষ্ঠীগুলোর সাথে তাদের সামরিক ও আদর্শিক সংহতি পুনরায় ঘোষণা করেছে।
বৈশ্বিক রাজনীতিতে পবিত্র কুরআনের আয়াতকে এভাবে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ঘটনাটি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে। শোকের মঞ্চ থেকেই ইরান মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে একটি পরিষ্কার বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।



