সার্ভিস চার্জের আড়ালে রাকিনের জালিয়াতি ও জুলুম, ক্ষোভে ফুঁসছে বিজয় রাকিন সিটিবিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | কাফরুল, ঢাকা

রাজধানীর মিরপুর-কাফরুল এলাকার অন্যতম বৃহৎ ও অভিজাত আবাসন প্রকল্প ‘বিজয় রাকিন সিটিতে’ আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘রাকিন ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড’-এর নজিরবিহীন জালিয়াতি, কোটি কোটি টাকা পরিশোধ করা ফ্ল্যাট ক্রেতাদের দীর্ঘদিন ধরে সাব-কবলা রেজিস্ট্রেশন (দলিল) না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা, নিম্নমানের ও অসম্পূর্ণ নির্মাণকাজ এবং আইনি জটিলতা ধামাচাপা দিতে কৃত্রিম জিম্মিদশা ও ‘সার্ভিস চার্জে’র নাটক সাজানোর চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। একজন আইনসম্মত আবাসন নির্মাতা বা ডেভেলপার হিসেবে রাকিনের প্রধান ও নৈতিক দায়িত্ব ছিল ফ্ল্যাট মালিকদের অনতিবিলম্বে নিজ নিজ ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করে দেওয়া এবং শতভাগ কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে নির্মিত ভবন ও স্থাপনাগুলো বিধি অনুযায়ী বাসিন্দাদের নির্বাচিত পরিচালনা কমিটির কাছে বুঝিয়ে দিয়ে সম্মানজনকভাবে প্রস্থান করা। কিন্তু সেই দায়বদ্ধতা এড়িয়ে নিজেদের চরম ব্যর্থতা, ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন ঝুলিয়ে রাখার জালিয়াতি, ত্রুটিযুক্ত নির্মাণ ধামাচাপা দেওয়া এবং মূল জমির মালিকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার চতুর কৌশল হিসেবেই এই ভুয়া ‘সার্ভিস চার্জে’র প্রপঞ্চ দাঁড় করানো হয়েছে। রাকিন কোনো সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; ক্রেতাদের রেজিস্ট্রেশন না দিয়ে বছরের পর বছর জিম্মি রাখা ও মূল জালিয়াতি ঢাকতেই জনদৃষ্টি ভিন্ন খাতে ঘোরাতে তাদের এই অপচেষ্টা।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, রাকিনের এই অন্যায়, ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন না দেওয়ার চরম টালবাহানা ও অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলায় সিটির ফ্ল্যাটমালিক ও অধিবাসীদের জঘন্য ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছে। জীবনের জমানো সঞ্চয় ঢেলে ফ্ল্যাট কিনেও দলিলের মালিকানা না পেয়ে নিজেদের ন্যায্য অধিকারের কথা বলায় এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় একাধিক নির্দোষ অধিবাসীকে মিথ্যা ও সাজানো মামলায় ফাঁসিয়ে জেল-জুলুম পর্যন্ত খাটানো হয়েছে। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, রাকিন থেকে সুবিধাভোগী গুটি কয়েক অসৎ ও দুর্বৃত্ত প্রকৃতির ফ্ল্যাট মালিককে বশীভূত করে নিজেদের পক্ষে একটি কৃত্রিম অনুগত গোষ্ঠী তৈরি করেছে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি। এই সুবিধাভোগী চক্রের সহায়তায় ভেতরে একটি ঘোলাটে ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সাধারণ বাসিন্দাদের পুরোপুরি জিম্মি করে ফেলা হয়েছে।
একইসঙ্গে সিটির নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় ও অভ্যন্তরীণ শান্ত পরিবেশ বিনষ্ট করতে বহিরাগত ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করছে রাকিন কর্তৃপক্ষ। আবাসন প্রকল্পের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাকিন চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। উল্টো বহিরাগত সন্ত্রাসীদের এনে সিটির ভেতরে অবাধ অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে একটি কৃত্রিম ভয় ও আতঙ্কজনক পরিবেশ তৈরি করে রাখা হয়েছে, যেন সাধারণ ফ্ল্যাটমালিকরা নিজেদের নিরাপত্তার আশঙ্কায় সর্বদা জিম্মি থাকেন এবং ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি কিংবা মৌলিক অধিকার নিয়ে মুখ খোলার সাহস না পান। রাকিনের এই অনৈতিক ও চতুর কৌশলের কারণে পুরো বিজয় রাকিন সিটি আজ এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও নানামুখী জটিল হুমকির মুখে পতিত হয়েছে।
এমন একতরফা শোষণ, ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন ঝুলিয়ে রেখে প্রতারণা, বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য, অভ্যন্তরীণ চক্রান্ত এবং প্রতিবাদী বাসিন্দাদের ওপর জেল-জুলুমের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে একছাতার নিচে এসে দাঁড়িয়েছেন সিটির সর্বস্তরের অধিবাসীরা। গত ২৪ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার সকাল ৮:৩০ ঘটিকায় সিটির অভ্যন্তরীণ টেনিস কোর্ট প্রাঙ্গণে আবালবৃদ্ধবনিতাসহ সর্বস্তরের বাসিন্দাদের এক সুবিশাল মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সময় উপস্থিত ছিলেন সোসাইটির সভাপতি সাবেক অতিরিক্ত সচিব সরদার ইলিয়াস, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বারী, সদস্য প্রকৌশলী এ টি এম খালেদুজ্জামান, আক্তার হোসেন, সাবেক দায়রা জজ আমজাদ হোসেন ও স্কোয়াড্রন লিডার কাজী মফিজ, আজম উল্লাহসহ অন্য সব নেতৃবৃন্দ।
শত শত অধিবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে রাকিনের এই সুচতুর চক্রান্ত, ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখার প্রতারণা, বহিরাগতদের দিয়ে হুমকি প্রদান এবং মিথ্যা মামলার তীব্র নিন্দা জানান। মহাসমাবেশে উপস্থিত ক্ষুব্ধ অধিবাসীরা বলেন, কোটি কোটি টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে আজ তারা দলিলের মালিকানা থেকে বঞ্চিত, নিজ ভূমিতেই পরবাসী ও জিম্মি। ন্যায্য অধিকার ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রির দাবি জানানোর কারণে প্রতিবেশীদের জেলে পাঠানো এবং বহিরাগত গুন্ডা দিয়ে সিটির পরিবেশ অশান্ত করার প্রতিবাদে এখন আর চুপ করে বসে থাকার সুযোগ নেই।
এই স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা ও শোষণের সমূলে উৎপাটন ঘটাতে মহাসমাবেশ থেকে অধিবাসীরা সর্বসম্মতভাবে ৫টি ইস্পাতকঠিন সিদ্ধান্ত ও প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেন। প্রথমত, রাকিনের একতরফা, অন্যায্য ও মনগড়া সার্ভিস ফি সম্পূর্ণভাবে বয়কট করা। দ্বিতীয়ত, সিটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করা এবং রাকিনের মদদপুষ্ট বহিরাগত সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ ও যেকোনো অপতৎপরতা কঠোরহস্তে প্রতিরোধ করা। তৃতীয়ত, রাকিনের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি বাতিল করে অধিবাসীরা নিজস্ব পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে সার্বিক সেবা ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিচালনা করবেন। চতুর্থত, অবিলম্বে ঝুলিয়ে রাখা ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত নির্মাণকাজ দ্রুত সংশোধন করে সিটির সার্বিক ব্যবস্থাপনা বাসিন্দাদের নির্বাচিত কমিটির হাতে বুঝিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানানো। এবং পঞ্চমত, মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানো বাসিন্দাদের পূর্ণ আইনি সুরক্ষা, ফ্ল্যাট মালিকদের দ্রুত রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করা, জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ আদায় এবং অধিবাসীদের সার্বিক অধিকার রক্ষায় রাকিনের বিরুদ্ধে যৌথভাবে জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণ করা।মহাসমাবেশ শেষে সিটির অধিবাসীরা এক বিশাল ও সুশৃঙ্খল প্রতিবাদী মিছিল বের করেন। মিছিলটি সিটির ভেতরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে। মিছিল শেষে বক্তারা উদাত্ত কণ্ঠে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন না দিয়ে জিম্মি রাখা, মিথ্যা মামলা, বহিরাগতদের ভয় দেখানো এবং শোষণের দিন শেষ। যতক্ষণ না পর্যন্ত বিজয় রাকিন সিটি সম্পূর্ণ প্রতারণা মুক্ত হচ্ছে, প্রতিটি ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন সুনিশ্চিত হচ্ছে এবং অধিবাসীরা তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা, ন্যায্য অধিকার ও সার্বভৌম অধিকার ফিরে পাচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম রাজপথে অবিরাম চলবে।



