ফেনী পাসপোর্ট অফিসে এডি জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে দালাল পোষা সহ সার্বিক কর্মকান্ডে অনিয়মের অভিযোগ

এম শাহীন আলম :
ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এবার এসব অভিযোগের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (এডি) মো. জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে নানা প্রশ্ন। স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তাঁর যোগদানের পর অফিসের আশপাশে সক্রিয় দালালচক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সরকারি নিয়মে পাসপোর্ট করতে গিয়ে যেখানে সাধারণ মানুষকে নানা ধাপ ও অজুহাতে ঘুরতে হচ্ছে, সেখানে দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিলে কাজ সহজে হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সহকারী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম। তাঁর দাবি, কার্যালয়ে ঘুষ বা অবৈধ অর্থ লেনদেনের কোনো সুযোগ নেই এবং তিনি কিংবা তাঁর কার্যালয় এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন।
** দালালের মাধ্যমে ‘সহজ সেবা’ পাওয়ার অভিযোগ
সরেজমিনে ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ের আশপাশে ঘুরে কয়েকজন সেবাগ্রহীতা ও স্থানীয় ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাসপোর্ট করতে আসা অনেকেই সরাসরি অফিসে আবেদন না করে দালাল বা ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে কাজ করাচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ সেবাগ্রহীতারা নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করতে গেলে বিভিন্ন ত্রুটি, কাগজপত্রের সমস্যা কিংবা অন্যান্য কারণ দেখিয়ে তাদের বারবার ঘুরিয়ে দালালদের শরণাপন্ন হতে বাধ্য করা হয়। অন্যদিকে দালালের মাধ্যমে গেলে একই ধরনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
** প্রতি আবেদনে অতিরিক্ত দালালদের মাধ্যমে ১০০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে “অফিস খরচ” নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ। সরেজমিনে ছদ্মবেশে গ্রাহক সেজে পাসপোর্ট এর আবেদন করতে গেলে দালাল চক্রের দুইজন সদস্যের সাথে কথোপকথনে তারা জানান, আমরা একটি রেগুলার পাসপোর্ট আবেদনে গ্রাহকদের কাছ থেকে ৮ হাজার করে নেই, এই ৮ হাজার টাকা থেকে সরকারী ফি আবেদন সহ ৬৩০০ টাকা খরচ হয়ে যায় আবেদন রেডি করতে, আর প্রতি আবেদনে ১ হাজার টাকা হিসাব করে বিকালে এডি স্যারের নিকট সরাসরি দিয়ে আসতে হয়। আর ১হাজার টাকা ফাইল প্রতি না দিলে আবেদন ফাইল আটক রেখে হয়রানি করা হয়। দালালদের ভাষ্য অনুযায়ী জানা যায়, ফেনী পাসপোর্ট অফিসে এডি জাহাঙ্গীর আলম যোগদানের পর এমন সিস্টেম করে রেখেছেন তিনি, যাতে করে গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হয়ে দালালদের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হন।
পাসপোর্ট অফিসের সুত্রে জানা যায়, ফেনী পাসপোর্ট অফিসে গড়ে প্রতিদিন দুই থেকে তিন’শ আবেদন জমা পড়ে, এমন সূত্র ধরে অনুসন্ধানে জানা যায়,আবেদনকৃত পাসপোর্টের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ আবেদন জমা হয় দালাল চক্র সিন্ডিকেট এর মাধ্যমে।
** মামলা থাকা ব্যক্তিদের পাসপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন
ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়কে ঘিরে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম, মনোহরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার এমন কিছু ব্যক্তি, যাদের বিরুদ্ধে মাদক, সন্ত্রাস বা অন্যান্য গুরুতর অভিযোগে মামলা রয়েছে, তারা অন্যত্র জটিলতার মুখে পড়লেও ফেনী অফিসে মোটা অংকের রফার মাধ্যমে সহজে পাসপোর্ট পাওয়ার অভিযোগ চরমে।
কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, কুমিল্লা আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ে আবেদন করতে না পারা ব্যক্তিরাও দালালের মাধ্যমে ফেনী অফিসে এসে টাকার বিনিময়ে সহজে পাসপোর্ট করার সুযোগ পাচ্ছেন।
** ভুয়া জন্মনিবন্ধন দিয়ে পাসপোর্টের অভিযোগ
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, ভুয়া বা জাল জন্মনিবন্ধন ও পরিচয়পত্র ব্যবহার করে কিছু বিদেশি নাগরিক, এমনকি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দালালচক্রের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে এসব আবেদন করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে আবেদনকারীর পরিচয়, নাগরিকত্ব, জন্মনিবন্ধন ও অন্যান্য নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কি না।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আবেদনপত্র, জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পুলিশ ভেরিফিকেশন ও পাসপোর্ট ইস্যুর রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
** পাসপোর্ট নিতে অফিসে আসতে হয় না এমন অভিযোগও
সেবাগ্রহীতাদের আরও অভিযোগ, দালালের মাধ্যমে আবেদন জমা দেওয়ার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাসপোর্ট গ্রহণের সময়ও আবেদনকারীকে সরাসরি অফিসে উপস্থিত হতে হয় না। ঘরে বসেই পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
** দালালচক্রের সঙ্গে কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ের আশপাশে একটি সক্রিয় দালালচক্র রয়েছে। তাদের দাবি, এই চক্রের সঙ্গে অফিস প্রধানের যোগাযোগ রয়েছে এবং কর্মকর্তাদের ‘’ম্যানেজ’’ করেই তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে।
** এডি জাহাঙ্গীরের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন আমার অফিসে কোন প্রকার অনিয়মের সুযোগ নেই। তিনি কিংবা তাঁর কার্যালয় এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন।
তিনি আরো বলেন,অফিসের বাইরে কেউ অতিরিক্ত টাকা নিলে তার দায় কার্যালয় নেবে না বলেও দাবি করেন।



