Uncategorizedঅনুসন্ধানঅভিযান

মহামান্য রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানঃ সংবিধানের অন্তর্নিহিত দর্শনের আলোকে জনগুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন

গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শহীদুল্লাহ ফরায়জী’র রীট আবেদনঃ
মহামান্য রাষ্ট্রপতির শপথ প্রধান বিচারপতির নিকট গ্রহণের বিধানটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক চরিত্র, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের পারস্পরিক সাংবিধানিক ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ।
তুলনামূলক সাংবিধানিক ব্যবস্থার দিক থেকেও রাষ্ট্রপতির শপথের সঙ্গে বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের এই সংযোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ধারণা নয়। ভারতের সংবিধানের ৬০ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি অব ইন্ডিয়ার সম্মুখে শপথ গ্রহণের বিধান রয়েছে। পাকিস্তানের সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদেও রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি অব পাকিস্তানের নিকট শপথ গ্রহণ করেন। নেপালের সংবিধানের ৭১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির শপথ প্রধান বিচারপতির সম্মুখে গ্রহণের বিধান রয়েছে এবং শ্রীলঙ্কার সংবিধানের ৩২(১) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির শপথ প্রধান বিচারপতি অথবা সুপ্রিম কোর্টের অন্য কোনো বিচারকের সম্মুখে গ্রহণের বিধান রয়েছে। মালদ্বীপেও রাষ্ট্রপতির শপথ প্রধান বিচারপতি পরিচালনা করেন। ফলে রাষ্ট্রপ্রধানের সাংবিধানিক অধিষ্ঠানের সঙ্গে বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ স্তরের এই প্রত্যক্ষ সংযোগ দক্ষিণ এশিয়ার সাংবিধানিক ব্যবস্থায় একটি সুপরিচিত ও স্বীকৃত বিন্যাস।
কিন্তু ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থার চরিত্রে যে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়, তার সঙ্গে বিচার বিভাগের সাংবিধানিক অবস্থান ও ক্ষমতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে।
শপথ কি নিছক আনুষ্ঠানিকতা?
রাষ্ট্রপতির শপথকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংবিধানের অধীনে কোনো সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে শপথ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা। অতএব, সেই শপথ কে পরিচালনা করবেন—এটি কেবল প্রশাসনিক বা প্রটোকলগত বিষয় হতে পারে না।
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ এবং তৃতীয় তফসিল অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির সম্মুখে শপথ গ্রহণ করতেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ
শুধু রাষ্ট্রপতিই নন, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথ পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রধান বিচারপতির সাংবিধানিক ভূমিকা ছিল।
এই ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সাংবিধানিক দর্শনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের অধীনে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির নিকট শপথ গ্রহণ করতেন। একইভাবে প্রধান বিচারপতিও রাষ্ট্রপতির নিকট শপথ গ্রহণ করেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতি সাংবিধানিকভাবে পরস্পরের নিকট শপথে আবদ্ধ। এই পারস্পরিক শপথ-সম্পর্ক প্রজাতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যকে প্রতিফলিত করে—রাষ্ট্রপ্রধান ও বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদাধিকারী উভয়েই সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের শপথে আবদ্ধ এবং কেউই সংবিধানের ঊর্ধ্বে নন।
সুতরাং রাষ্ট্রপতির শপথ প্রধান বিচারপতির নিকট গ্রহণের বিধানটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক চরিত্র, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের পারস্পরিক সাংবিধানিক ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ।
কিন্তু ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থার চরিত্রে যে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়, তার সঙ্গে বিচার বিভাগের সাংবিধানিক অবস্থান ও ক্ষমতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সেই পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথ পরিচালনায় প্রধান বিচারপতির পূর্ববর্তী সাংবিধানিক কর্তৃত্বও বিলুপ্ত করা হয়। ফলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদগুলোর সঙ্গে বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদটির যে সাংবিধানিক ভারসাম্য ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই বিন্যাসেও একটি মৌলিক বিচ্যুতি ঘটে।
পরবর্তীতে চতুর্থ সংশোধনীর বিলুপ্তি ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বৈশিষ্ট্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পূর্ববর্তী কিছু ভারসাম্যও ফিরে আসে।
কিন্তু পরবর্তীতে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে চতুর্থ সংশোধনীর সময় পরিবর্তিত রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথ সংক্রান্ত ব্যবস্থার কিছু বৈশিষ্ট্য পুনর্বহাল করা হয়। বিশেষ করে- রাষ্ট্রপতির শপথ পরিচালনার ক্ষেত্রে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের পরিবর্তে প্রধান বিচারপতির স্থলে জাতীয় সংসদের স্পিকারকে শপথ পরিচালনার কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করা হয।
জনগুরুত্বসম্পন্ন সাংবিধানিক প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির শপথ পরিচালনার সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ কে—এই প্রশ্ন কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, সাংবিধানিক ভারসাম্য এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর প্রশ্ন জড়িত।
আজকের প্রশ্ন শুধু একজন রাষ্ট্রপতির শপথের প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে—রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার সীমারেখা কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামো কতটুকু পর্যন্ত সংশোধনযোগ্য।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, রাষ্ট্রের কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এতদিন পর্যন্ত স্বপ্রণোদিত হয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্নটির কোনো কার্যকর ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
ফলে বিষয়টি এখন কেবল একজন ব্যক্তির শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন-
বর্তমান পরিস্থিতিতে এর বিচারিক নিষ্পত্তি শুধু ন্যায়বিচারের স্বার্থেই নয়, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক শাসনের স্বার্থেও অত্যন্ত জরুরি।
উল্লেখিত প্রেক্ষাপট বিবেচনায়- গীতি কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শহীদুল্লাহ ফরায়েজী সাহেব ১০ মার্চ ২০২৫ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে Writ Petition No. 4779 of 2025 (Court Main-12) দায়ের করেছেন। রাষ্ট্রপতির শপথ পরিচালনার সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ, প্রধান বিচারপতির সাংবিধানিক ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধানের বৈধতার প্রশ্ন এই রিটের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
রিটটি দায়েরের সময় বিষয়টি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন। কিন্তু ২০ আগস্ট ২০২৬ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।আদালত স্বাধীনভাবে সংবিধান ও আইনের আলোকে বিষয়টি বিচার করবেন—এটাই সাংবিধানিক শাসনের স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
তাই ২০ আগস্ট ২০২৬ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পূর্বেই গীতি কবি রাজনৈতিক বিশ্লেষক শহীদুল্লাহ ফরায়েজী’র দাখিলকৃত Writ Petition No. 4779 of 2025-এর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি ও দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির শপথের ক্ষেত্রে সংবিধানের অন্তর্নিহিত দর্শণের আলোকে আলোকিত হয়ে-
জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের অবসান ঘটানো জরুরি কর্তব্য হিসেবে- আদালতের সামনে উত্থাপিত হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button