অনুসন্ধানঅপরাধঅভিযানদুর্নীতি

কাজ শেষ হয়নি, তবুও শতভাগ বিল! ১০ তলার বিল, ভবন ৮ তলা—অভিযোগের কেন্দ্রে প্রকৌশলী হাসান শওকত।

কাজ শেষ হয়নি, কিন্তু বিল হয়েছে শতভাগ। কোথাও ভবনের ১০ তলার বিল উঠেছে, অথচ বাস্তবে ভবন দাঁড়িয়ে আছে ৮ তলা। কোথাও কাজ না করেই লাখ লাখ টাকা বিল দেওয়ার অভিযোগ। আর এসব অভিযোগের কেন্দ্রে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী ও বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকত।

এশিয়া পোস্টরে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও গুরুতর কিছু তথ্য। রাজধানীর শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের একটি ১০ তলা ভবনের ৯ম ও ১০ম তলার কাজ বাস্তবে না হলেও নথিতে সেই কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিল পরিশোধের অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ১৩ জুন নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে হাসান শওকতের স্বাক্ষরেই ওই বিল অনুমোদিত হয়েছিল।

শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়। মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সংস্কার কাজের ক্ষেত্রেও কাজের অগ্রগতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিল দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ওয়েস্ট ধানমন্ডি ইউসুফ উচ্চ বিদ্যালয় ও কোতোয়ালি এলাকার আনোয়ারা বেগম মুসলিম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের কাজ নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এসেছে ঘুষ লেনদেনের ভিডিও নিয়ে।

প্রতিবেদনটির দাবি, ২০২২ সালের কয়েকটি ভিডিও ফুটেজে হাসান শওকতের অফিসকক্ষে বস্তা থেকে নগদ টাকা বের করে টেবিলে রাখার দৃশ্য দেখা যায়। প্রতিবেদনে উপস্থিত ঠিকাদারদের বক্তব্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এসব টাকা তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। হাসান শওকত অবশ্য ভিডিওর দৃশ্যের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ঠিকাদাররা নিজেদের মধ্যে টাকা বিনিময় করছিলেন এবং তাঁকে দেওয়া অর্থের বিষয়েও তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন।

অর্থাৎ অভিযোগ আছে, ভিডিও আছে, নথি আছে, আবার অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্যও আছে। এখন প্রয়োজন অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা।

আরেকটি তথ্য বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের বিল পরিশোধের অভিযোগে হাসান শওকতের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তদন্ত চলমান থাকা অবস্থাতেই তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী করা হয়।

ওই প্রতিবেদনে মোহাম্মদপুরের পশ্চিম ইউসুফ উচ্চ বিদ্যালয়, উত্তরখান মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও দাশেরকান্দি দারুচ্ছুন্নাহ আলীম মাদ্রাসার বিভিন্ন কাজে কাজ না করেই বা কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল দেওয়ার অভিযোগের কথাও বলা হয়েছে। হাসান শওকত এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কোনো সাধারণ দপ্তর নয়। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করে। অর্থাৎ এই দপ্তরের দুর্নীতির অভিযোগ মানে শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে স্কুল-কলেজের ভবন, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার ওপর।

সরকারি ওয়েবসাইটে বর্তমানে হাসান শওকতকে ঢাকা মেট্রোপলিটন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। (EEDMOE)

প্রশ্ন তাই একটাই।

একটি ভবনের ৯ম ও ১০ম তলা যদি বাস্তবে না থাকে, তাহলে সেই দুই তলার কাজের বিল কীভাবে হলো?

কাজ শেষ না হলে পরিমাপ বইয়ে কাজ সম্পন্ন দেখাল কে?

কাজ না করে বিল দেওয়া হয়ে থাকলে সেই অর্থের দায় নেবে কে?

আর কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান থাকলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাঁর পদোন্নতি কেন?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ করা কোটি কোটি টাকা যদি কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে বের করে নেওয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্রের শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের নামে আসলে কার উন্নয়ন হচ্ছে?

অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি শুধু একজন প্রকৌশলীর দুর্নীতির ঘটনা হবে না। এর সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার।

আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও স্পষ্টভাবে প্রমাণ হওয়া দরকার।

কারণ দুর্নীতির অভিযোগের সবচেয়ে কার্যকর জবাব হলো তদন্ত। আর তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি।

এই ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকর তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button