“নবীজি ﷺ-এর ইন্তেকালে কেমন ছিল সাহাবিদের অবস্থা?”—শোকে ভেঙে পড়েছিল মদিনা 🖤❤️

নবীজির ইন্তেকালের পর যখন চারদিকে শোক চলছে এবং উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) চরম শোক ও বিস্ময়ে তা মেনে নিতে পারছিলেন না, তখন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) অত্যন্ত ধৈর্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেন। তিনি নবীজির পবিত্র লাশের ওপর থেকে চাদর সরিয়ে তাঁর কপালে মুখ রেখে চুম্বন করেন এবং কেঁদে বলেন, “আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন! আপনি জীবনে যেমন পবিত্র ছিলেন, মৃত্যুতেও তেমন পবিত্র হয়েছেন।” এরপর মসজিদে এসে তিনি সুরা আলে ইমরানের ১৪৪ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করেন (“মুহাম্মদ তো কেবল একজন রাসুল…”)। এই আয়াত শুনে উমর (রা.)-এর পা আর চলেনি, তিনি শোকে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন।
সীরাতে এসেছে ওমর রা: তখন বলেন,
“অবশেষে যখন বুঝতে পারলাম, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যিই ইন্তেকাল করেছেন, একাকী কাঁদার জন্য নির্জন একটি জায়গার সন্ধানে বের হলাম । “
.
হযরত আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, যেদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় তাশরিফ এনেছিলেন, সেদিন সবকিছু আলোকিত হয়ে গিয়েছিল। আর যেদিন তিনি ইন্তেকাল করলেন, সেদিন সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল। তিনি বলেন, নবীজির দাফন শেষ করে যখন আমরা হাত ঝাড়ছি, তখন থেকেই আমাদের হৃদয়ের অনুভূতি পাল্টে যেতে শুরু করেছিল; আমরা অনুভব করেছিলাম যে আমাদের অন্তরগুলো যেন আর আগের মতো নেই।
.
মদিনার মুয়াজ্জিন হজরত বেলাল (রা.) নবীজির জীবদ্দশায় অত্যন্ত মধুর কণ্ঠে নিয়মিত আজান দিতেন। কিন্তু নবীজির ইন্তেকালের পর যখন তিনি “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ” (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল) বলতে যেতেন, তখন কান্নায় তার গলা জড়িয়ে যেত এবং তিনি আর শব্দ বের করতে পারতেন না, কান্নায় ভেঙে পড়তেন। এই তীব্র শোকের কারণেই তিনি মদিনায় আজান দেওয়া চিরতরে বন্ধ করে দেন এবং পরবর্তীতে খলিফা উমরের যুগে মদিনা ছেড়ে হিজরত করে চলে যান।
.
নবীজির আদরের কন্যা ফাতিমা (রা.) পিতার ইন্তেকালের পর শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। তিনি নবীজির পবিত্র রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়িয়ে মাটি হাতে নিয়ে নিজের চোখে বুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে একটি বিখ্যাত শোকগাথা আবৃত্তি করেছিলেন, যার মূল অর্থ ছিল— “যে ব্যক্তি আহমদ মোস্তফার রওজা বা পবিত্র মাটি ঘ্রাণ করবে, সে সারাজীবন কোনো সুগন্ধি না পেলেও তার কোনো আক্ষেপ থাকবে না। আমার ওপর এমন সব মুসিবত পড়েছে, যা দিনের ওপর পড়লে দিনগুলো কালো অন্ধকারে পরিণত হতো।”
.
নবীজির ইন্তেকালের কিছুদিন পর উম্মে আইমান (রা.) কাঁদতে শুরু করেন। লোকেরা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “আপনি কেন কাঁদছেন? নবীজি তো আল্লাহর কাছে তাঁর মহামহিম প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেছেন, যা তাঁর জন্য অনেক বেশি শান্তির।” উত্তরে উম্মে আইমান (রা.) বলেছিলেন, “আমি জানি আল্লাহ তাআলার কাছে যা আছে তা তাঁর নবীর জন্য উত্তম। কিন্তু আমি কাঁদছি এই ভেবে যে, আজ আসমান থেকে আসমানী ওহী আসা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল!” তাঁর এই কথায় উপস্থিত সবাই পুনরায় কান্নায় ভেঙে পড়েন ।
.
নবীজির ইন্তেকালের দিন মসজিদে নববীর পরিবেশ কেমন ছিল, তা বর্ণনা করতে গিয়ে সাহাবিরা বলেছেন যে, সেদিন মদিনার প্রতিটি ঘরে ঘরে কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। সাহাবিরা কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলেন। একে অপরের দিকে তাকালে সবার চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় পানি ঝরতো।
.
নবীজির গোসল ও দাফনের কাজে সরাসরি যুক্ত ছিলেন হযরত আলী (রা.), আব্বাস (রা.) এবং ফজল ইবনে আব্বাস (রা.)। নবীজির পবিত্র শরীর মোবারককে গোসল করানোর সময় আলী (রা.) এক গভীর ও অদ্ভুত স্তব্ধতা অনুভব করছিলেন। তিনি পরবর্তীতে বর্ণনা করেছিলেন যে, নবীজির দেহ মোবারক থেকে এমন সুগন্ধ ছড়াচ্ছিল, যা তিনি জীবনে কখনো অনুভব করেননি। তবে সেই সুগন্ধের মাঝেও প্রিয় অভিভাবক ও শিক্ষককে হারানোর শোক তাঁর বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের করে দিচ্ছিল। দাফন শেষে যখন তিনি কবর থেকে উঠলেন, তখন তাঁর চোখ ছিল লাল এবং তিনি মাটির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিলেন।
সল্লি আ’লা মোহাম্মদ ❤️



