চট্টগ্রাম দেব পাহাড়ের চুড়ায় অবস্থিত ৫০০ বছরের পর্তুগীজ ভবনটি ইতিহাসের এক অজানা নিদর্শন

এম জসিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম হাজী মোহাম্মদ মহসিন কলেজের দেব পাহাড়ের চুড়ায় দেখা মিলেছে শতাব্দীর জরাজীর্ণ প্রাচীন এক পুরাকীর্তি। ইতিহাসবিদদের মতে এই বিল্ডিং এর বয়স প্রায় পাঁচশো বছর। পর্তুগীজ বনিকেরা এই বিল্ডিং থেকে ব্যবসাবানিজ্য পরিচালনা করতো। এটি পর্তুগীজ জলদস্যুদের দুর্গ হিসেবেও ব্যবহার হতো। পাহাড়শীর্ষে অবস্থিত এই পর্তুগীজ ভবনটি একসময় ‘মাদ্রাসা ও হেফজ খানা’ ভবন হিসেবেও খ্যাত ছিল। পর্তুগীজ জলদস্যুরা গোপনে চলাচলের জন্য বিল্ডিং এর তলদেশ দিয়ে একটি সুরঙ্গ তৈয়ার করেছিল। সেই সুরঙ্গের প্রবেশ মুখ ছিল ফিরিঙ্গি বাজার হয়ে কর্নফুলি নদীর তীর। পর্তুগীজরা এতদঞ্চল থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরে ইংরেজরা এই ভবনকে প্রথম ম্যাজিষ্ট্রেট, দেওয়ানি ও জজকোর্ট হিসেবে ব্যবহার করেছিল। পর্তুগীজদের গোপন কক্ষগুলো ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী হাজতখানা হিসেবেও ব্যবহার করেছিল। কথিত আছে যে- শাহ্ সুফি আমানত (রহ:) এই বিল্ডিংএ এক বিচারকের এজলাসে লাল কাপড়ের পাকা টানতেন। সেই এজলাসের বিচারক থেকে বিদায় নিয়ে তিনি পীর বদরশাহ্ এলাকার পশ্চিমে উলুবনে অবস্থান নেয়। বর্তমানে এই স্থানে হযরত শাহ আমানতের মাজার রয়েছে। পর্তুগীজ ভবনটি একসময় এতদঞ্চলে বৃটিশদের প্রথম প্রশাসনিক সদরদপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। পৌনে এক একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত দুর্গের মতো গোলাকার কাঠামোর দোতলা এই ভবনটির নির্মাণ শৈলী অভিনব। কোনো লোহার রড ব্যবহার ছাড়া প্রায় ১৮ ইঞ্চি প্রস্থ দেওয়ালের এই ভবনটিতে একটি প্যাঁচানো সিড়িসহ তিনটি সিঁড়িপথ রয়েছে। দোতলা এই ভবনের নিচতলা ও দোতলায় একটি কেন্দ্রীয় কক্ষসহ চারপাশে ২০ টি কক্ষ রয়েছে। ভবনের ছাঁদে পর্তুগীজদের কামান স্থাপনের চিহ্ন এখনো দেখা যায়। ছাদের উপর রয়েছে দুটি গম্বুজ। এখানে পাহাড়ায় নিয়োজিত থাকত সশস্ত্র নিরাপত্তা রক্ষীরা। ভবনটির নির্মাণকাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ড. আবদুল করিম, ড. সুনীতিভূষন কানুনগো, জামাল উদ্দিন সহ কয়েকজন গবেষক ও ইতিহাসবিদ সুনিশ্চিত হয়ে লিখেছেন যে- আলাউদ্দিন হোসেন শাহর আমলে ১৫১৭ সালে ইউরোপীয়নদের মধ্যে পর্তুগীজরাই প্রথম জেয়াও দ্য সিলভিয়ার নেতৃত্বে ব্যবসা করতে চট্টগ্রামে আসেন। চট্টগ্রামে তখন পর্তুগীজরা দস্যুবৃত্তি করত। সেই হিসেবে ভবনটির বয়স প্রায় ৫০০ বছর হবে। দেব পাহাড়টির সমুদ্রমুখী অবস্থান লক্ষ্য করলে বুঝা যায়, পাহাড়টির সামনে প্রায় কাছাকাছি উচ্চতর কয়েকটি পাহাড় আছে। অর্থাৎ শত্রুর আক্রমণ পর্যবেক্ষণে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয় মাথায় রেখে পর্তগীজ জলদস্যুদের দুর্গ নির্মান জরুরি ছিল। প্রাচীন নথিপত্র থেকে আরো জানা যায় পাহাড়টির নাম ‘দেব পাহাড়’ নয়, এটির প্রকৃত নাম ছিল ‘মহসেনিয়া মাদ্রাসা পাহাড়’। ১৮৭৪ সালে হাজী মোহাম্মদ মহসিন ফান্ডের অর্থে এই পাহাড়টিতে মহসেনিয়া মাদ্রাসা, পরে মহসিন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই হিসেবে পাহাড়টির প্রকৃত নাম ‘মোহসেনিয়া মাদ্রাসা পাহাড়’।



