চট্টগ্রাম জেলায় কিশোর অপরাধ রোধে ১৭ থানায় বিশেষ উদ্যোগ
মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রাম, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬: কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ এবং কিশোরদের সুস্থ, স্বাভাবিক ও ইতিবাচক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ সব স্টেকহোল্ডারকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।
চট্টগ্রাম জেলার ১৭টি থানার আওতাধীন এলাকায় কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে জেলা পুলিশ জানিয়েছে, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমের মাধ্যমে এ সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—কিশোর অপরাধপ্রবণ স্পট, আড্ডাস্থল ও অপরাধে জড়িত গ্রুপ চিহ্নিত করে নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ, কাউন্সেলিং এবং প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
অভিভাবকদের সন্তানদের চলাফেরা, বন্ধুত্ব, অনলাইন কার্যক্রম ও আচরণগত পরিবর্তনের প্রতি নজর রাখার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে দ্রুত সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থী চিহ্নিত করে কাউন্সেলিং, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক কিশোর উন্নয়ন কার্যক্রম, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা ও মাদকবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া সামাজিক, স্বেচ্ছাসেবী, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে কিশোরদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্বেচ্ছাসেবা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন ও অন্যান্য স্থাপনা যাতে কিশোর অপরাধের আড্ডাস্থল হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়ে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে।
সচেতন নাগরিক ও কমিউনিটি পুলিশিং সদস্যদের কিশোর অপরাধ, মাদক, সংঘবদ্ধ আড্ডা বা অপরাধপ্রবণতার তথ্য দ্রুত পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানিয়েছে জেলা পুলিশ। পাশাপাশি গণমাধ্যমকে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ, সচেতনতা এবং সফল সংশোধন ও পুনর্বাসনের ইতিবাচক বার্তা প্রচারে ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কিশোরদের মাদক, জুয়া, ইভটিজিং, মারামারি, চাঁদাবাজিসহ সব ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি বা অপরাধী চক্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও আড্ডা এড়িয়ে চলার পাশাপাশি গুজব, সহিংসতা, উসকানিমূলক কনটেন্ট এবং সন্দেহজনক অনলাইন গ্রুপ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কারও প্ররোচনা, চাপ বা ভয়ভীতির কারণে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়তে এবং কোনো সমস্যা, অপরাধের প্ররোচনা বা মাদকের তথ্য জানা থাকলে অভিভাবক, শিক্ষক অথবা পুলিশকে অবহিত করতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্বেচ্ছাসেবা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনো বন্ধু বা সহপাঠী বিপথে গেলে তাকে অপরাধে উৎসাহিত না করে পরিবার, শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ বলছে, অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের ক্ষেত্রে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এ লক্ষ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের কাউন্সেলিং ও পারিবারিক তত্ত্বাবধান, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়াদের পুনরায় শিক্ষার আওতায় আনা, কারিগরি ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্তকরণ এবং মাদকঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিবার, শিক্ষক, সমাজকর্মী ও পুলিশের সমন্বয়ে নিয়মিত ফলোআপ এবং অপরাধপ্রবণ পরিবেশ থেকে কিশোরদের বের করে ইতিবাচক পরিবেশ ও সহায়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের আহ্বান-কিশোরদের অপরাধী হিসেবে নয়, সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হিসেবে বিবেচনা করে তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
সমন্বিত প্রতিরোধ, সচেতনতা, সংশোধন ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম জেলা থেকে কিশোর অপরাধের বিস্তার রোধ করে একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও কিশোরবান্ধব সমাজ গড়ে তুলতে সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।



