চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১১ শতাংশ, ঘাটতি ৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা

মুহাম্মদ জুবাইর: চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায় বাড়লেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর-এই তিন মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২২ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। বিপরীতে, এ সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩২ হাজার ৩২ কোটি টাকা। ফলে তিন মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৩১ শতাংশ।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১৯ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ২ হাজার ১৮১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজস্ব আহরণকারী এই শুল্ক স্টেশন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি থাকলেও লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বড় ব্যবধান অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে আমদানি কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন শুল্ক স্তরের পণ্য আমদানির ধরনে পরিবর্তন রাজস্ব আদায়ের ওপর প্রভাব ফেলেছে। যদিও প্রথম প্রান্তিকে সামগ্রিক আমদানি ও পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য বেড়েছে, তারপরও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পিছিয়ে রয়েছে কাস্টম হাউস।

সেপ্টেম্বরে আমদানি কমেছে, রাজস্বে প্রবৃদ্ধি
চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দিয়ে পণ্য আমদানির পরিমাণ আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৪ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯০ দশমিক ৮৪ লাখ টনে। একই সঙ্গে আমদানি করা পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্যও প্রায় ৩ শতাংশ কমে ৪৮ হাজার ৬৪২ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

তবে আমদানি ও শুল্কায়নযোগ্য মূল্য কমলেও সেপ্টেম্বর মাসে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। মাসটিতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৭ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি। কিন্তু মাসিক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হয়েছে ২৭ দশমিক ৯০ শতাংশ।

অর্থাৎ, আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় বাড়লেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সেপ্টেম্বর মাসেও বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় গতি অর্জন করা এখনো সম্ভব হয়নি।

শুল্ক স্তরভিত্তিক রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যানে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। উচ্চ শুল্ক স্তরের কিছু পণ্য থেকে রাজস্ব আদায় কমলেও কয়েকটি নিম্ন শুল্ক স্তরে আদায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২৫ শতাংশ শুল্ক স্তর থেকে রাজস্ব আদায় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ শতাংশ কমে ২ হাজার ৩৩ কোটি টাকায় নেমেছে। অন্যদিকে, ৩ শতাংশ শুল্ক স্তর থেকে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ২৪১ শতাংশ। এ স্তরের রাজস্ব আদায়ের বড় প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক রাজস্ব বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
এ ছাড়া ১০ শতাংশ শুল্ক স্তর থেকে ১ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা, ৫ শতাংশ শুল্ক স্তর থেকে ৮৭৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা, ১৫ শতাংশ শুল্ক স্তর থেকে ৫৯০ কোটি টাকা, শূন্য শতাংশ শুল্ক স্তর থেকে ৮০৪ কোটি টাকা এবং ১ শতাংশ শুল্ক স্তর থেকে ৪৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।
শুল্ক স্তরভিত্তিক এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, সব ধরনের পণ্য থেকে রাজস্ব আদায়ের প্রবণতা এক রকম নয়। কোনো কোনো স্তরে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও অন্য স্তরে কমেছে। ফলে আমদানির মোট পরিমাণ বাড়লেই রাজস্ব আদায় একই অনুপাতে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আমদানি করা পণ্যের ধরন, শুল্কহার ও শুল্কায়নযোগ্য মূল্যের ওপরও রাজস্ব আহরণ নির্ভর করে।

সেপ্টেম্বর মাসে আমদানি কমলেও অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের সামগ্রিক চিত্র কিছুটা ভিন্ন। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে পণ্য আমদানির পরিমাণ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়ে প্রায় আড়াই কোটি টনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে আমদানি করা পণ্যের মোট শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৮০১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ, প্রথম প্রান্তিকে আমদানির পরিমাণ ও শুল্কায়নযোগ্য মূল্য-দুটিই বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।

বিশেষ করে ৩ শতাংশ শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এ ধরনের পণ্যের আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তিন গুণের বেশি বেড়েছে। পাশাপাশি এসব পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৬ হাজার ৬৭২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে আমদানি বাড়লেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, আমদানির পরিমাণ ও শুল্কায়নযোগ্য মূল্য বাড়ার পাশাপাশি পণ্যের শুল্ক কাঠামোও রাজস্ব আহরণের ওপর প্রভাব ফেলে। বেশি শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানি এবং কম শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানির অনুপাত পরিবর্তিত হলে মোট রাজস্ব আদায়ের প্রবণতাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দেশের আমদানি-বাণিজ্য ও রাজস্ব আহরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর দিয়ে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ পণ্যের শুল্কায়ন ও রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে এখানে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ও লক্ষ্যমাত্রার ব্যবধান জাতীয় রাজস্ব আহরণের সামগ্রিক চিত্র বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায়ে ১১ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও ৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকার ঘাটতি পূরণ করা কাস্টম হাউসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থবছরের বাকি মাসগুলোতে এ ব্যবধান কমাতে হলে আমদানি-বাণিজ্যের গতি, পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য এবং বিভিন্ন শুল্ক স্তরের পণ্যের আমদানির প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে শুধু আমদানির পরিমাণ বাড়লেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। কোন ধরনের পণ্য আমদানি হচ্ছে এবং সেগুলোর ওপর প্রযোজ্য শুল্কহার কত, তার ওপরও রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ নির্ভর করবে। এ কারণে সামগ্রিক আমদানি বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ে কতটা প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ আল আমীন বলেন, রাজস্ব আদায় মূলত আমদানি করা পণ্যের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। প্রথম প্রান্তিকে বেশি শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানি বাড়ায় রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরে আমদানির পরিমাণ কমলেও উচ্চমূল্যের পণ্য আমদানির কারণে সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে।
আগামী মাসগুলোতে আমদানি-বাণিজ্যের গতি বাড়লে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। ফলে অর্থবছরের বাকি সময়জুড়ে আমদানি-বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি এবং শুল্ক স্তরভিত্তিক পণ্য আমদানির প্রবণতা চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button