হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-কে ঘিরে ৩ ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণ

ফিচার ডেস্ক: উপমহাদেশের প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক, তৌহিদী জনতার পথপ্রদর্শক এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা আমীরে শরীয়ত হযরত মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-কে ঘিরে ৩টি ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ স্মৃতিচারণ সংকলিত করা হয়েছে। মুফতী আনাস হুসাইন কর্তৃক সংগৃহীত এই তথ্যে হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর মর্যাদা, তাঁর অনন্য উপাধির ইতিহাস এবং তাঁর সান্নিধ্যে গড়ে ওঠা প্রখ্যাত আলেমদের পরিচয় উঠে এসেছে।
১. হযরত থানভী (রহ.)-এর মন্তব্য ও ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী
উপমহাদেশের খ্যাতনামা বুজুর্গ হাকীমুল উম্মাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর নিকট তাঁর এক খাদেম মাওলানা আব্দুল আযীয (রহ.) জানতে চেয়েছিলেন, “হযরত! আপনার ইন্তেকালের পর আমরা কার কাছে যাব?” জবাবে হযরত থানভী (রহ.) হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন:
“আমার খলিফাদের মধ্যে সবথেকে স্বল্পভাষী, পরিমিত আহার গ্রহণকারী এবং অধিক ইবাদতগুজার মৌলভী মুহাম্মাদুল্লাহর মত আর কেউ নেই।”
পরবর্তীতে স্বীয় অন্তর্দৃষ্টি (কাশফ)-এর মাধ্যমে হযরত থানভী (রহ.) উপস্থিত লোকজনকে উদ্দেশ্য করে আরো বলেছিলেন, “আল্লাহ তাআলা এর (হাফেজ্জী হুজুর) মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বড় কাজ সমাধা করাবেন।” ওলামায়ে কেরামদের মতে, পরবর্তীতে খেলাফত আন্দোলনের মাধ্যমে ঐতিহাসিক সামাজিক ও রাজনৈতিক জাগরণ সৃষ্টির প্রতিই ছিল হাকীমুল উম্মাতের সেই ইঙ্গিত।
২. ‘হাফেজ্জী হুজুর’ নামকরণের প্রেক্ষাপট
হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর আসল নাম ছিল ‘মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ’। তবে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ওলামায়ে কেরামের মাঝে তিনি ‘হাফেজ্জী হুজুর’ নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন।
এই উপাধির পিছনের ইতিহাস সম্পর্কে হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) নিজেই জানিয়েছিলেন, প্রখ্যাত আলেম শামসুল হক ফরিদপুরী (ছদর ছাহেব হুজুর রহ.) একদিন সকলকে ডেকে বলেন, “তোমরা সবাই ওনাকে কেবল ‘হাফেজ্জী-হাফেজ্জী’ বলে ডাকো, এই নামটা শুনতে কেমন যেন অনভ্যস্ত বা অসম্পূর্ণ লাগে। তোমরা বরং ‘হাফেজ্জী’ নামের সঙ্গে ‘হুজুর’ যুক্ত করে ‘হাফেজ্জী হুজুর’ বলে ডাকবে।” ছদর ছাহেব (রহ.)-এর সেই নির্দেশের পর থেকেই তিনি সর্বমহলে ‘হাফেজ্জী হুজুর’ নামে সুপরিচিতি লাভ করেন।
৩. হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর প্রখ্যাত কয়েকজন ছাত্র
ইসলামি শিক্ষা ও দাওয়াতের প্রসারে হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) অসংখ্য যোগ্য আলেম তৈরি করে গেছেন। তাঁর বিশিষ্ট ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন:
- হযরত মাওলানা হেদায়তুল্লাহ (রহ.) — সাবেক মুহতামিম, জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ, ঢাকা।
- হযরত মাওলানা আজিজুল হক (রহ.) [শাইখুল হাদিস] — সাবেক প্রধান মুহাদ্দিস, লালবাগ মাদ্রাসা ও জামিয়া আরাবিয়া মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
- হযরত মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করীম (রহ.) — সাবেক পীর সাহেব চরমোনাই, বরিশাল।
- হযরত মাওলানা আব্দুল আজীজ (রহ.) — প্রবীণ মুহাদ্দিস, লালবাগ মাদ্রাসা।
- হযরত মাওলানা উবায়দুল্লাহ (রহ.) — সাবেক মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা।
- হযরত মাওলানা আমিনের রহমান (রহ.) — সাবেক খতিব, লালবাগ শাহী মসজিদ, ঢাকা।
- হযরত মাওলানা আলী আকবর (রহ.) — প্রবীণ মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া, ঢাকা।
- হযরত মাওলানা আব্দুল রউফ পাহাড়পুরী (রহ.) — সাবেক শাইখুল হাদিস, জামিয়া আরাবিয়া মোহাম্মদপুর (ও হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর ছোট জামাতা)।
- হযরত মাওলানা মুফতী মনসূরুল হক (দা.বা.) — প্রধান মুফতী ও শাইখুল হাদিস, জামিয়া আরাবিয়া মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
- হযরত মাওলানা রেফায়াত রহমান (দা.বা.) — মুহতামিম ও প্রবীণ মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
- আলহাজ মৌলভী আব্দুর রশীদ (রহ.) — সিরাজগঞ্জ।
- হযরত মাওলানা উবাইদুল হক (রহ.) — সাবেক খতিব, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ।
- হযরত কারী আশরাফ (রহ.) — বড় সাহেবজাদা, হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)।
- হযরত মাওলানা আব্দুল হক (দা.বা.) — মুহাদ্দিস ও ইমাম, ময়মনসিংহ বড় মসজিদ।
(তথ্যসূত্র: প্রফেসর আহমাদ সাঈদ রহ. রচিত ‘বায়ূমে আশরাফ কে চেরাগ’ এবং ডা. হাফেজ কারী ফুয়্যুর রহমান রচিত ‘খুলাফায়ে হাকীমুল উম্মাত’)



