কাশিয়ানীতে সাইনবোর্ডে ডেন্টিস্ট, ভেতরে প্রতারক! নীরব দর্শক কতৃপক্ষ

শেখ শোভন আহমেদ, কাশিয়ানী প্রতিনিধি: নেই কোন প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা অভিজ্ঞতা, চাকচিক্যময় চেম্বার আর রঙিন সাইনবোর্ডে কেবলমাত্র উচ্চতর দন্ত চিকিৎসা বিষয়ক ডিগ্রি যোগ করলেই বর্তমানে হওয়া যায় ডেন্টিস্ট। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর বিভিন্ন ইউনিয়ন কেন্দ্রিক বাজারগুলোতে চেম্বার খুলে এসকল ডেন্টিস্টরা দাঁত তোলা, দাঁত লাগানো,স্কেলিং এবং রুট ক্যানেলসহ সার্জারির মতো গুরুত্বপূর্ণ সকল ধরণের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে। নামমাত্র এসব ডেন্টিস্টদের সেবা থেকে সংক্রমণ ও ভয়াবহ ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে স্থানীয় সেবা প্রত্যাশীরা।
তবে,এসব ভুয়া ডেন্টিস্টদের আঁতুরঘর কাশিয়ানী উপজেলার রামদিয়া বাজার।মূলত রামদিয়া বাজার কাশিয়ানীর বড় ও প্রধান বাজারের তালিকার শীর্ষে। কাশিয়ানী সদর ইউনিয়ন থেকে দূরে হওয়ায় সেখানে তুলনামূলক কম নজর থাকে প্রশাসনের, আর সে সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে তারা। রামদিয়া বাজারে একে একে তৈরি হয়েছে ৮ থেকে ১০ টা ডেন্টাল চেম্বার। যাদের মধ্যে অধিকাংশ ডেন্টিস্টদের সার্টিফিকেট ভুয়া বা কোন কিছুই নেই।যেখানে গড়ে প্রায় অর্ধ শতাধিক সেবা প্রত্যাশীরা প্রতিদিন এ সকল ডেন্টিস্টের চেম্বারে সেবা নিয়ে থাকে।কেউ কম টাকায় চাকচিক্যময় চেম্বার আর উচ্চতর ডিগ্রি লেখা সাইনবোর্ড দেখে সেবা নিচ্ছে আর কেউ এসব বিষয়ে অজ্ঞতা অসচেতনতার কারণে।তবে,এসব ভুয়া ডেন্টিস্টদের থেকে সেবা নিয়ে কেউ কেউ অসুস্থতায় জড়িয়ে পড়ছে।
এ রামদিয়া বাজারে একজন কথিত ভুয়া ডেন্টিস্ট আছেন যার কাছে এক এর ভিতরে তিন রোগের চিকিৎসা পাওয়া যায়। বিশ্বাস ডেন্টাল পলিপাস ও পাইলস সেন্টার যার মালিক তুষার বিশ্বাস। তিনি তার সাইনবোর্ড মোতাবেক তিনি ডেন্টাল, পলিপাস ও পাইলস এর সেবা দেন। শুধুমাত্র DDT কোর্স নিয়েই। তার চেম্বার রয়েছে দুটি একটি রাহুথড় বাজারে অন্যটি রামদিয়া।দুটোতেই একই সেবা দিচ্ছে।
রাহুথড় বাজারে গেলে যায় যে তিনি একটা ছোট্ট টিনশেড দোকানে অন্ধকারে টর্চ লাইট জ্বালিয়ে একজন রোগীর দাঁত তুলছে এবং আরো বেশকিছু রোগী বসে আছে। তবে, তিনি দাঁত তোলার সময় কোন ধরণের এন্টিসেপ্টিক, হ্যান্ড গ্লাভস বা কোন সুরক্ষা সামগ্ৰী নেই। পুরাতন একটি পুরাতন স্লিপিং চেয়ার আর কিছু পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়ে সেবা দিচ্ছে।তার কাছে সেবা নিতে আসা এক সেবা প্রত্যাশী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন, আমি এসেছি পাইলসের সমস্যায়,তুষারের কাছ থেকে এক মাসের বেশি সময় ধরে ঔষধ খাচ্ছি এখনো কোন পরিবর্তন পাচ্ছি না তাই আজকে আবার আসছি।দেখি কি হয়।
তার রামদিয়া চেম্বারে গেলে তার এসব বিষয়ে তুষার বিশ্বাস জানান, আমি DDT ডিগ্ৰিধারী। আমি ডেন্টাল ও অন্যান্য সব সব কাজ পারি।আর এভাবেই সেবা দিতে পারব আমি।
তবে তুষার বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট অনলাইনে সার্চ দিলে তার কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়া যায়নি।রামদিয়ার বাজারের সুরক্ষা ডেন্টাল কেয়ার যেখানে সাম্প্রতিককালে সাইনবোর্ড থেকে তার প্রোপাইটর ও কথিত ডেন্টিস্ট বরুণ কুমার রায় নীজের নাম কেটে দিলেও লেখা আছে দাঁত তোলা, লাগানো, স্কেলিং,রুট ক্যানেলসহ যাবতীয় দাঁতের চিকিৎসা দেওয়া হয়।আর এসকল চিকিৎসা বরুণ কুমার রায় নীজেই দীর্ঘদিন করেন বলে তিনি জানিয়েছেন। মূলত এ বরুণ কুমার রায় কথিত ভুয়া ডেন্টিস্টের পেশা গ্ৰহণের পূর্বে একটি স্থানীয় ব্যাংকের অফিস সহকারী হিসেবে কাজ করত। তবে, হঠাৎ তিনি সেই চাকরি ছেড়ে দুই থেকে তিন মাস স্থানীয় একজন ডেন্টিস্টের কাছে কাজ শিখে বর্তমানে একজন ডেন্টিস্ট বনে গেছেন। কথিত ভুয়া ডেন্টিস্ট বরুণ কুমার রায় এর কাছে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি DDT কোর্স করেছি।তবে আশ্চর্যজনক হলেও এটাই যে, তিনি তার দাবি করা কোর্স অর্থাৎ DDT এর সম্পূর্ণ অর্থ জানতে চাইলে তা বলতে ব্যার্থ হয় এবং তার কোর্স গ্রহণ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম বা ঠিকানা কিছুই বলতে পারে না।রামদিয়া বাজারে তুষার বিশ্বাস ও বরুণ কুমার রায় এই দুজন ছাড়াও একইভাবে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন, চন্দন ডেন্টাল কেয়ার এর নিখিল চন্দ্রসহ আরও একাধিক ভুয়া ডেন্টিস্ট যাদের শাস্তি হোক বলে দাবি এলাকাবাসীর।
তথ্য মতে, DDT মানে Diploma in Dental Technology / Diploma in Medical Technology (Dental)
অনেকেই একে Diploma Dentist বলে, কিন্তু আইন অনুযায়ী তারা ডাক্তার না।বিএমডিসি আইন ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সর্বশেষ রায় অনুযায়ী DDT ডিগ্রিধারীরা কোনোভাবেই স্বতন্ত্রভাবে চেম্বার খুলে চিকিৎসা দিতে পারেন না। নিজের নামে আলাদা চেম্বার খুলতে পারবে না,রোগীকে স্বাধীনভাবে দেখতে বা প্রেসক্রিপশন দিতে পারবে না,
নামের আগে ডা. লিখতে পারবে না (শুধু BDS/MBBS রা পারবে)। তবে এসব চেম্বার মালিকেরা শুধু একজন রেজিস্টার্ড BDS ডেন্টিস্টের তত্ত্বাবধানে থেকে ডেন্টিস্টকে অ্যাসিস্ট করা যেমন:স্কেলিং, পলিশিং,ডেঞ্চার, ক্রাউন, ব্রিজ বানানো ও মেরামত করা,জীবাণুমুক্তকরণ, রোগীকে মৌখিক স্বাস্থ্য শিক্ষা দেওয়া এসব পারবে।তবে তারা আইনের তোয়াক্কা না করেই নীজেরা সকল সেবা দিচ্ছে।কাশিয়ানীতে যারা আলাদা সাইনবোর্ড লাগিয়ে দাঁত তোলা, ফিলিং করছেন, তারা সবাই অবৈধ।
উপজেলার শুধু রামদিয়া বাজারেই নয় এমন অবৈধ ভুয়া ডেন্টিস্ট এর চেম্বার যেন তৈরি হয়েছে ব্যাঙের ছাতার মতো যেখানে সেখানে।তবে, স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন সেটা,আমরা তাহলে বুঝবো কিভাবে কে আসল কে নকল? প্রশাসন কি কালো চশমা পড়ে এসব দেখছে না? নাকি আমরা এভাবেই সেবা নিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হবো?
সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষের একটাই দাবি এসব ভুয়া ডেন্টিস্টদের যাচাই বাছাই এর ভেতর আনা হোক।যারা ভুয়া তাদের চেম্বার বন্ধ করে দিয়ে আইনের আওতায় আনা হোক।



