ইসলামের অবমাননাকারী ও কবি কা’ব বিন আশরাফের ঐতিহাসিক নিধন
ইসলামিক বিচিত্রা ডেস্ক: ইসলামের প্রাথমিক যুগে মদিনা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা এবং ইসলাম ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়ে বনু নজীর গোত্রের প্রধান ও প্রভাবশালী কবি কা’ব বিন আশরাফের নিধনের ঘটনা ইসলামিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও কৌশলগত একটি অধ্যায়। কুরাইশদের উসকে দেওয়া এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শত্রুতা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে সাহাবিদের হাতে তার পরিণতির ঐতিহাসিক বিবরণ সিরাত গ্রন্থগুলোতে সংরক্ষিত রয়েছে।
কা’ব বিন আশরাফ তার বিত্তবৈভব, রূপ-সৌন্দর্য এবং কাব্য প্রতিভার সুবাদে গোটা আরবজুড়ে পরিচিত ছিল। তবে বদর যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের পর সে চরম ইসলামবিদ্বেষী হয়ে ওঠে। মক্কার মুশরিকদের শিবিরে গিয়ে সে নবী করিম (সা.) ও সাহাবিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ায় এবং মুসলিমদের নির্মূলে তাদের উসকে দেয়। মদিনায় ফিরে এসে সে কবিদের মাধ্যমে মহানবী (সা.) ও মুসলিম নারীদের নিয়ে অবমাননাকর ও কুরুচিপূর্ণ কবিতা রচনা করে জনসম্মুখে প্রচার করতে শুরু করে, যা তৎকালীন মুসলিম সমাজে তীব্র মানসিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করলে মহানবী (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন, কে এমন আছে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে কষ্টদানকারী কা’ব বিন আশরাফের ব্যবস্থা নিতে পারে? এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে হযরত মুহাম্মদ বিন মাসলামা (রা.) এগিয়ে আসেন এবং তাঁর সাথে আরও কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবি—আবু নায়েলা, আব্বাদ বিন বিশর, হারেস ইবনে আউস ও আবু আবস ইবনে জবর (রা.) এই ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেন।
মুহাম্মাদ বিন মাসলামা (রা.)-এর নেতৃত্বে সাহাবিরা অত্যন্ত সুকৌশলে কা’বের কেল্লায় প্রবেশ করেন। তাঁরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে কা’বের সাথে আলোচনা চালিয়ে তার বিশ্বাস অর্জন করেন এবং অস্ত্র বন্ধক রাখার বাহানায় তার সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ তৈরি করেন। অপর সদস্য আবু নায়েলাও কা’বের সাথে সুগন্ধি ও বন্ধুত্বের ছলে তার নৈকট্য লাভ করেন।
হিজরি দ্বিতীয় বর্ষের রবিউল আউয়াল মাসের চতুর্দশ দিন রাতে পূর্ণিমার জোছনায় সাহাবিদের এই দলটি কা’ব বিন আশরাফের দুর্গের সামনে উপস্থিত হয়। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, আবু নায়েলা সুগন্ধি শোঁকার ছলে কা’বের চুল শক্ত করে ধরে ফেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে অন্য সাহাবিরা আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে তাকে পরাস্ত করেন। সফল এই অভিযান শেষে সাহাবিরা নিরাপদে মদিনায় ফিরে আসেন এবং মহানবী (সা.)-এর কাছে পৌঁছান। মহানবী (সা.) তাঁদের এই সফলতায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং তাঁদের জন্য বিশেষ দোয়া করেন।
এই টার্গেট কিলিং বা কৌশলগত অভিযানের পর মদিনার অন্যান্য বিরোধী পক্ষ ও ইহুদি গোত্রগুলোর মধ্যে একধরনের মানসিক সতর্কতা ও ভীতি তৈরি হয়। এর ফলে সাময়িকভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রকাশ্য ষড়যন্ত্র ও শত্রুতা অনেকাংশে প্রশমিত হয়েছিল, যা নবগঠিত মদিনা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।



