সূরা আত-তাকাসুরের জীবনঘনিষ্ঠ তাফসির ও আত্মশুদ্ধির বার্তা
ইসলামিক বিচিত্রা ডেস্ক: পবিত্র কুরআনের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও জীবনঘনিষ্ঠ একটি সূরা হলো ‘সূরা আত-তাকাসুর’। এই সূরার শুরুতেই মানবজীবনের এক চরম ও পরম সত্যকে চমৎকার উপমা ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ কেন তার জীবনের আসল উদ্দেশ্য ভুলে দুনিয়ার মোহ ও প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়ে পড়ে এবং এর শেষ পরিণতিই বা কী—তা এই সূরায় স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
১. ‘তাকাসুর’ ও অসুস্থ মানসিক প্রতিযোগিতা
আল্লাহ তাআলা সূরার শুরুতেই ইরশাদ করেছেন—
“অধিক পাওয়ার প্রতিযোগিতা তোমাদের ভুলিয়ে রেখেছে (গাফলতির মধ্যে ফেলে রেখেছে), যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপস্থিত হও।” (সূরা আত-তাকাসুর: ১-২)
এখানে আরবি ‘তাকাসুর’ (التكاثر) শব্দটি অত্যন্ত গভীর অর্থ বহন করে। এটি কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা মুদ্রার নাম নয়; এটি হলো মানুষের মনের এক ধরনের অসুস্থ মানসিকতা বা প্রবৃত্তি—“ওর চেয়ে আমার বেশি লাগবে”। একটি পশুখাদ্য বা অন্য কোনো জীব কেবল তার ক্ষুধা মেটানোর জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই গ্রহণ করে। কিন্তু মানুষই একমাত্র সৃষ্টি, যে পেট ভরার পরও কেবল অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার বা নিজেকে বড় দেখানোর অদম্য বাসনায় সম্পদ, ডিগ্রি, ক্যারিয়ার ও স্ট্যাটাস জমাতে থাকে। এই ‘আরো চাই, আরো চাই’ মানসিকতাই মানুষকে তার প্রকৃত রবের স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
২. কবর: স্থায়ী ঠিকানা নাকি একটি ‘ওয়েটিং রুম’?
আয়াত দুটিতে আরবি ‘হাত্তা যুরতুমুল মাক্বাবির’ বাক্যটি ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে ‘যুরতুম’ শব্দটি এসেছে ‘জিয়ারত’ বা ‘ভিজিট’ করা থেকে। মানুষ যখন মারা যায়, তখন তাকে কবরে দাফন করা হয়। কিন্তু আল্লাহ এখানে বলেননি যে তোমরা কবরে ‘বসবাস করো’ বা ‘স্থায়ীভাবে থাকো’; বরং তিনি বুঝিয়েছেন তোমরা কবরে ‘ভিজিট’ করতে বা বেড়াতে যাও!
ভিজিট তো মানুষ কিছুক্ষণের জন্যই করে, সেখানে স্থায়ীভাবে থাকার কোনো সুযোগ নেই। এই রূপক ও বাস্তবতা থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, কবর মানুষের শেষ গন্তব্য নয়; এটি মূলত একটি ‘ওয়েটিং রুম’ বা ট্রানজিট লাউঞ্জ মাত্র—যেখানে মানুষ কিয়ামতের মহামঞ্চের ফ্লাইটের অপেক্ষায় সাময়িকভাবে অবস্থান করে। অথচ বোকা মানুষ আমরা দুনিয়াকেই সব বলে ধরে নিই এবং চিরকাল থাকার প্রস্তুতি নিতে থাকি।
৩. ভুল ট্র্যাকে ইঁদুর দৌড় ও পরিণতির শিক্ষা
তাফসিরে ‘আলহাকুম’ শব্দটির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এটি এমন এক ধরনের অনর্থক খেলা বা ব্যস্ততা, যা মানুষকে তার সবচেয়ে জরুরি ও আসল কাজ বা পরীক্ষার কথা ভুলিয়ে দেয়। যেমন—আগামীকাল বিশাল কোনো পরীক্ষা বা প্রেজেন্টেশন থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি পুরো রাত নেটফ্লিক্সে সিরিজ দেখে কাটিয়ে দেয়, তবে সেই সিরিজ দেখাই হলো তার জন্য ‘আলহাকুম’।
ঠিক তেমনি, দুনিয়ার সাময়িক ব্যাংক ব্যালান্স, ক্যারিয়ারের ইঁদুর দৌড় এবং ‘সেটেল’ হওয়ার অন্তহীন টেনশন মানুষকে আখেরাতের মূল পরীক্ষার কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। মানুষ বুঝতে পারে না যে সে এমন এক গন্তব্যের জন্য জিনিসপত্র প্যাকিং করছে, যেখানে সে স্থায়ীভাবে থাকবেই না।
এর ক্রমধারাটি অত্যন্ত শিক্ষণীয়: ১. মানুষ ‘আরো লাগবে’ এই অন্ধ প্রতিযোগিতায় দৌড়াতে থাকে। ২. সে জীবনের আসল উদ্দেশ্য ও রবের ইবাদত ভুলে যায়। ৩. দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ একদিন সে মৃত্যুর মাধ্যমে কবরের ‘ওয়েটিং রুমে’ গিয়ে পৌঁছায়। ৪. তখন তার ঘোর কাটে, কিন্তু আর ফিরে আসার কোনো সুযোগ থাকে না। ৫. শেষমেশ তাকে চূড়ান্ত হিসাব দেওয়ার জন্য মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হয়।
৪. প্রাপ্ত নেয়ামতের হিসাব ও চূড়ান্ত উপলব্ধি
সূরার শেষাংশে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেছেন—
“কক্ষনো নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে। সেদিন তোমাদেরকে অবশ্যই নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সূরা আত-তাকাসুর: ৩, ৮)
সারাজীবন মানুষ যে অর্থ-সম্পদ, স্বাস্থ্য, যৌবন, সময় ও ক্ষমতার জন্য মরিয়া হয়ে দৌড়ায়, কবরের সেই ট্রানজিট লাউঞ্জে পা রাখার সাথে সাথেই সেগুলোর সমস্ত জাগতিক মূল্য নিমিষেই শূন্য বা জিরো হয়ে যায়। সেদিন প্রতিটি মানুষকে হিসাব দিতে হবে যে, আল্লাহ তাকে যে জীবন ও শক্তি দিয়েছিলেন, সেগুলোর শুকরিয়া সে কীভাবে আদায় করেছে।
পরিশেষে বলা যায়, পরিশ্রম করা বা জীবিকা অর্জন করা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়; বরং ভুল ট্র্যাকে বা ভুল গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটে চলাটাই হলো মানবজীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। মানুষ চিটাগাংয়ের টিকিট কেটে ভুলবশত সিলেটের ট্রেনে চড়ে যতই আয়েশ করুক না কেন, সে কখনো তার আসল গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না। তাই দুনিয়ার এই অলীক প্রতিযোগিতায় অন্ধ না হয়ে, রবের সন্তুষ্টি ও আখেরাতের পাথেয় অর্জনেই মুমিনের প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা নিহিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই সত্য উপলব্ধি করার এবং জীবনের সঠিক ট্র্যাকে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।



