আশুলিয়ায় ছয় লাশ পোড়ানো মামলায় ঢাকা ১৯ এর সাবেক এমপি সাইফুল সহ ছয়জনের মৃত্যুদন্ড

মাহবুব আলম মানিক (সাভার): জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ঢাকার আশুলিয়ায় ছয়জনের মরদেহ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম ও আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনিসহ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বাকী আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড এবং রাজসাক্ষী হওয়ায় পুলিশের সাবেক উপ-পরিদর্শক আবজালুল হককে খালাস দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম (পলাতক), বিশ্বজিৎ সাহা (পলাতক), সাবেক এসআই আব্দুল মালেক, সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার, পুলিশের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম (পলাতক), এ.এফ.এম সায়েদ রনি (পলাতক)। এরমধ্যে সাবেক এমপি সাইফুলের সমস্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি রনিকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ প্রাপ্তরা হলেন, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম, ডিবির সাবেক পরিদর্শক আরাফাত হোসেন আরজু, মোঃ আসাদুজ্জামান রিপন (পলাতক), মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান (পলাতক), নির্মল কুমার দাস (পলাতক)।
সাত বছর কারাদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত দুজন হলেন, সাবেক এসআই আরাফাত উদ্দিন ও কামরুল হাসান (পলাতক)। তাদের যথাক্রমে ৫ ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
মামলার রায়ে সাবেক এসআই ও মামলার রাজসাক্ষী শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করা হয়েছে।
এ মামলার ১৬ আসামির মধ্যে গ্রেফতার আছেন আটজন। গ্রেফতাররা হলেন— ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, এসআই শেখ আবজালুল হক ও কনস্টেবল মুকুল।
পলাতক আট আসামি হলেন- ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান রিপন, আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনি, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) নির্মল কুমার দাস, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রনি ভূঁইয়া।
এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় তৃতীয় রায়।
এ মামলায় মোট ৫৩ জনকে সাক্ষী করেছে প্রসিকিউশন। গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে শেষ হয় চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি। প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন শহীদ আস সাবুরের ভাই রেজওয়ানুল ইসলাম ও শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের বাবা মো. খলিলুর রহমান। ২২ কার্যদিবসে তদন্ত কর্মকর্তা জানে আলম খানসহ ২৪ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়।
এরপর সাফাই সাক্ষ্য দেন আসামি আরাফাত হোসেন। ১৪ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। আসামিপক্ষসহ প্রসিকিউশনের যুক্তি পাল্টা যুক্তি খণ্ডন শেষ হয় ২০ জানুয়ারি। ওই দিন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল।
পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার এটি তৃতীয় রায়। গত ১ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল।
এ ঘটনায় শহীদ হয়েছেন সাজ্জাদ হোসেন সজল, আস সাবুর, তানজিল মাহমুদ সুজয়, বায়োজিদ বোস্তামী, আবুল হোসেন, ওমর ফারুক ও মোহাম্মদ শাহাবুল ইসলাম।
গত বছরের ২১ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। ওই সময় উপস্থিত আট আসামির সাতজনই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তবে দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন এসআই শেখ আবজালুল হক। একই বছরের ২ জুলাই প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন আদালত। অভিযোগের সঙ্গে অন্যান্য তথ্যসূত্র হিসেবে ৩১৩ পৃষ্ঠা, দালিলিক প্রমাণাদি ১৬৮ পৃষ্ঠা ও দুটি পেনড্রাইভ যুক্ত করে প্রসিকিউশন।



