আন্তর্জাতিক

ইরান-সৌদি সংঘাতের মাঝে চরম সংকটে পাকিস্তান: চুক্তির জালে আটকে কি এবার মিসাইলের নিশানায় ইসলামাবাদ?

নিজিস্ব প্রতিবেদকঃ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এবার বেশ বাজেভাবেই ফেঁসে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে পাকিস্তান। একদিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরান, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব। সম্প্রতি মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার জেরে ইরান যখন সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, তখন পাকিস্তানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এক বড় অগ্নিপরীক্ষা। এর মূল কারণ, ২০২৫ সালে সৌদি আরবের সাথে করা পাকিস্তানের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি।

কী ছিল ২০২৫ সালের চুক্তিতে? ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ (Strategic Mutual Defense Agreement) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মূল শর্তটি ছিল পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’-এর মতো। অর্থাৎ, সৌদি আরব বা পাকিস্তান—যেকোনো এক দেশের ওপর সামরিক আগ্রাসন হলে তা উভয় দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। বর্তমানে সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগার, রিয়াদ এবং অন্যান্য স্থানে ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলার পর এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পাকিস্তানের হস্তক্ষেপের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে।

পাকিস্তানের বর্তমান পদক্ষেপ: সৈন্য প্রেরণ নাকি কড়া সতর্কতা? সাধারণ মানুষের মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে যে, চুক্তির শর্ত রক্ষার্থে পাকিস্তান হয়তো ইতিমধ্যেই সৌদিতে মিসাইল এবং সৈন্য পাঠাচ্ছে। তবে বাস্তব এবং বর্তমান পরিস্থিতি হলো, পাকিস্তান এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করার জন্য সৈন্য বা মিসাইল মোতায়েন করেনি। বরং তারা এই চুক্তির ওপর ভিত্তি করে কঠোর কূটনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে।

পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সম্প্রতি নিশ্চিত করেছেন যে, তাঁরা ইরানকে এই চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কড়া ভাষায় সতর্ক করেছেন। পাকিস্তান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, সৌদি আরবের ওপর বড় কোনো হামলা হলে ইসলামাবাদ চুপ করে বসে থাকবে না। এই মধ্যস্থতা এবং সতর্কবার্তার কারণেই সৌদি আরবে ইরানের হামলার তীব্রতা কিছুটা কমেছে বলে পাকিস্তান দাবি করেছে। তবে পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে পাকিস্তানের সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ইরানের মিসাইল কি এবার পাকিস্তানে আঘাত হানবে? এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—পাকিস্তানের এই সতর্কবার্তা এবং চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে ইরান কি এবার পাকিস্তানের দিকে তাদের মিসাইল তাক করবে? ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঝুঁকি একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না:

  • ভৌগোলিক ও সামরিক ঝুঁকি: ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। পাকিস্তান যদি শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের হয়ে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করে বা সামরিক সরঞ্জাম পাঠায়, তবে ইরান নিজেদের রক্ষার্থে পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে নিশানা করে মিসাইল হামলা চালাতে পারে।
  • আভ্যন্তরীণ অস্থিরতার ভয়: পাকিস্তানের ভেতরে প্রায় ৪ কোটি শিয়া মতাবলম্বী মানুষের বসবাস, যাদের অনেকেরই ইরানের প্রতি সহানুভূতি রয়েছে। তাই সৌদি আরবের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে পাকিস্তানের ভেতরে মারাত্মক গৃহদাহ ও বিক্ষোভ তৈরি হতে পারে, যা পাকিস্তানের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য ধ্বংসাত্মক হবে।

উপসংহার সব মিলিয়ে পাকিস্তান এখন আক্ষরিক অর্থেই ‘শাঁখের করাত’-এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সৌদি আরবের সাথে করা চুক্তি রক্ষা করতে গেলে প্রতিবেশী ইরানের সাথে ভয়ংকর যুদ্ধে জড়াতে হবে, আবার চুক্তি রক্ষা না করলে সবচেয়ে বড় মিত্র ও অর্থনৈতিক সহায়তাকারী সৌদির কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা চিরতরে হারাতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button