
মুহাম্মদ জুবাইর
অস্ত্রের ভাণ্ডার,মাদক সাম্রাজ্য,অপহরণ চাঁদাবাজির , অস্ত্রের আস্তানা জঙ্গল সলিমপুর খুনি ইয়াসিন,রোকন মেম্বার, লাল বাদশাদের নিয়ন্ত্রণে পাহাড়ি অপরাধ সাম্রাজ্য
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় শুরু হয়েছে দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সাঁড়াশি অভিযান। দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী, অস্ত্র ব্যবসায়ী, মাদক কারবারি, অপহরণকারী, ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বিশাল যৌথ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। সোমবার ভোর ফজরের নামাজের পর থেকেই সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনের সদস্যরা জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন প্রবেশমুখ দিয়ে এলাকায় প্রবেশ করে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী প্রায় সাড়ে তিন হাজার সদস্য এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন।
অভিযানে প্রায় ৫৫০ জন সেনাসদস্য, ১৮০০ পুলিশ সদস্য, ৪০০ র্যাব সদস্য, ৩৩০ এপিবিএন সদস্য এবং ১২০ বিজিবি সদস্য অংশ নিচ্ছেন। পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে সাঁজোয়া এপিসি যান, ডগ স্কোয়াড এবং আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি। প্রয়োজনে সহায়তার জন্য হেলিকপ্টারও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় দুই যুগ ধরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা বিভিন্ন অপরাধী চক্রের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। পাহাড়ি দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এখানে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল ছিল। সেই সুযোগে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এখানে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করে।
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি অঞ্চল জঙ্গল সলিমপুর। একসময় ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল এই এলাকা। কিন্তু বছরের পর বছর নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে এখন অধিকাংশ পাহাড় ন্যাড়া হয়ে গেছে। পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে রাস্তা, বসতি, মার্কেট, দোকানপাট এবং অসংখ্য প্লট। সরকারি পাহাড় কেটে কোটি কোটি টাকার প্লট বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে কুখ্যাত সন্ত্রাসী ইয়াসিন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। পাহাড় কেটে একদিকে মাটি বিক্রি করা হয়েছে, অন্যদিকে দখল করা জমি প্লট আকারে বিক্রি করা হয়েছে। পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে ইটের দেয়াল তুলে তৈরি করা হয়েছে প্লট। নিম্ন আয়ের মানুষ কম দামে জমি পাওয়ার আশায় সেখানে বসতি গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত—ছিন্নমূল এলাকা এবং আলীনগর। এই দুই অংশেই পাহাড় কেটে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বসতি, মার্কেট এবং দোকানপাট।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগে নোয়াখালী থেকে জীবিকার সন্ধানে চট্টগ্রামে আসেন ইয়াসিন নামের এক ব্যক্তি। প্রথমদিকে তিনি সিএনজি অটোরিকশা চালাতেন এবং নগরের একটি বস্তিতে বসবাস করতেন। পরে একটি জুট মিলে চাকরিও করেন। ধীরে ধীরে তিনি সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে একটি ঘর ভাড়া নেন। এরপর নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে সন্ত্রাসী ও দাগী আসামিদের এনে সেখানে আশ্রয় দিতে শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠে তার নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী। পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি ও জমি দখল করে প্লট বিক্রির মাধ্যমে অল্প সময়েই বিপুল অর্থ উপার্জন করতে থাকেন ইয়াসিন ও তার ভাই ফারুক। পরে বিশাল একটি এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তারা ওই জায়গার নাম দেন ‘আলীনগর’। স্থানীয়দের ভাষায় এটি হয়ে ওঠে একটি অঘোষিত রাজ্য, যেখানে দেশের প্রচলিত আইন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
আলীনগরে প্রবেশের জন্য ছিল তিনটি নির্দিষ্ট পথ। এই তিনটি পথেই সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকত ইয়াসিন বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। তাদের অনুমতি ছাড়া বাইরের কেউ সেখানে প্রবেশ করতে পারত না। এমনকি ভেতরে থাকা কেউও অনুমতি ছাড়া বাইরে যেতে পারত না। কেউ অতিথি নিয়ে এলে অতিথির জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন কার্ড জমা দিতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা ছিল। যারা স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করতেন তাদের ইয়াসিনের স্বাক্ষর করা বিশেষ পাস দেওয়া হতো। সেই পাস দেখিয়ে তারা বাইরে যাতায়াত করতে পারতেন। কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলেও কেউ থানায় অভিযোগ করতে পারতেন না। বরং ইয়াসিন ও ফারুকের কথিত আদালতেই বিচার হতো বলে অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের।
জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়ে আসছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এখানে এমন কোনো অপরাধ নেই যা ঘটে না। মাদক ব্যবসা এই এলাকার অন্যতম বড় অপরাধ। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক এখানে মজুদ করা হয় এবং সেখান থেকে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। এছাড়া পাহাড়ের গহীন এলাকায় সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানায় বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র মজুদ রাখা হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। মাঝে মাঝে সেখানে অস্ত্রের মহড়া দেওয়া হয় এবং নতুন সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনাও এখানে নিয়মিত ঘটে। ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া জুয়া, অবৈধ বাণিজ্য এবং নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চলেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
নব্বইয়ের দশকে কুখ্যাত সন্ত্রাসী আলী আক্কাস প্রথম জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পাহাড় কেটে বসতি গড়ে তোলেন। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি কম থাকায় তিনি সেখানে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেন। পরে র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন আক্কাস। তার মৃত্যুর পর কাজী মশিউর রহমান, গফুর মেম্বার, গাজী সাদেক ও ইয়াসিন মিয়া পৃথক সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলেন। বর্তমানে এলাকায় ইয়াসিন, রোকন মেম্বার ও লাল বাদশা নামে কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর প্রভাব রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। লাল বাদশা দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুর ও বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয়দের দাবি। তার অন্যতম সহযোগী নান্নু এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে র্যাব–৭ চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আহত হন আরও কয়েকজন র্যাব সদস্য। এই ঘটনার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয় এবং বড় ধরনের অভিযানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, অভিযানের সময় বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে। আলীনগরে প্রবেশের মুখে একটি ট্রাক দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। পরে সেটি সরিয়ে সামনে এগোনো হয়। কিছুদূর গিয়ে দেখা যায় রাতের আঁধারে একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়েছে। পরে ইট-বালু ফেলে সেটি ভরাট করে বাহিনীর গাড়ি সামনে এগিয়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে জঙ্গল সলিমপুরের অধিকাংশ পাহাড় ন্যাড়া হয়ে গেছে। পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে সড়ক, ঘরবাড়ি, মার্কেট ও প্লট। পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে রয়েছে অসংখ্য কাঁচা ও পাকা ঘরবাড়ি। কোথাও কোথাও পাহাড় ধাপে ধাপে কেটে ফেলা হচ্ছে। এলাকাবাসীর অনেকেই জানিয়েছেন, কম দামে জমি পাওয়ার কারণে তারা এসব প্লট কিনে বসতি গড়ে তুলেছেন। তবে উচ্ছেদ করা হলে সরকারের কাছে বিকল্প বসতির দাবি জানিয়েছেন তারা।
২০২২ সালে জেলা প্রশাসন জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে সেখানে নতুন কেন্দ্রীয় কারাগার, মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটারসহ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু জমি দখলমুক্ত না হওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধ দমনের জন্য এই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরো এলাকা কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রাখা হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানা ধ্বংস করা এবং এলাকাটিকে অপরাধমুক্ত করাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। দীর্ঘদিন ধরে অপরাধের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত এই পাহাড়ি এলাকায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এখন প্রশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



