অনুসন্ধানঅপরাধ

অনিক ও সোহেলের ভুয়া “প্রাচীন পিলার ও কয়েন” চক্রে নিঃস্ব হচ্ছে অনেকে

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে এক অভিনব প্রতারণার চক্রের উন্মোচন ঘটেছে, যা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে দেশের ধন্যাঢ্য ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের পর্যন্ত নিঃস্ব করে ফেলেছে। এই চক্রের মূল হোতারা হলেন অনিক ও মাজারুল ইসলাম সোহেল। তাদের প্রতারণা কৌশল ভুয়া “প্রাচীন পিলার” ও কয়েনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা অত্যন্ত সুচিন্তিত, অভিনব এবং জটিল। প্রাথমিক তদন্ত ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনার ভিত্তিতে দেখা গেছে, প্রতারণার কৌশল এতটাই সূক্ষ্ম এবং পেশাদার ছিল যে কেউ সহজে সন্দেহ করতে পারেননি।

মাজারুল ইসলাম সোহেল কৃষকলীগ ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সহ-সভাপতি হিসেবে পরিচিত। তিনি ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে নেত্রকোনা জেলার পূর্বধল্লা আসনে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছিলেন। তিনি নেত্রকোনা জেলার আওয়ামী লীগের নেতা ও যুবলীগের নেতা হিসেবেও পরিচিত বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া মাজারুল ইসলাম সোহেল হত্যা মামলার আসামি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এই প্রতারণা চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগে উঠে এসেছে যে প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান ডা. এস বি ইকবালের কাছ থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। ডজলেন গ্রুপের আরিফ সাহেবের কাছ থেকে ১৬ কোটি টাকা এবং সিবিএম গ্রুপের জয়নাল ওরফে জামান সাহেবের কাছ থেকে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও আরও অনেক কোম্পানি রয়েছে এবং তালিকাটি আরও দীর্ঘ বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।

ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার এবং অনুসন্ধান অনুযায়ী জানা গেছে, অনিক ও সোহেলের প্রতারণা কৌশল ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। প্রতারকেরা সাধারণ কয়েন, পাথর বা সিলিন্ডার আকৃতির বস্তুকে প্রাচীন বলে দাবি করতেন। কৃত্রিমভাবে বয়স দেখানোর জন্য তারা প্যাটিনা, দাগ এবং বিভিন্ন চিহ্ন তৈরি করতেন। বস্তুগুলোকে ইতিহাসভিত্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে “বিশেষ বিনিয়োগ” হিসেবে উপস্থাপন করা হত।

রূপা (ছদ্মনাম), একজন ভুক্তভোগী বলেন, “ওরা বলেছিল পিলারটি প্রাচীন মন্দিরের অংশ। আমরা ছবি এবং ইতিহাস দেখে বিশ্বাস করেছিলাম। পরে বুঝলাম এটি কৃত্রিম। আমাদের অর্থের সবটাই হারালাম।” ফরহাদ নামে আরেক ভুক্তভোগী জানান, “কয়েনগুলো ‘রেয়ার’ বলেই চাপ দেওয়া হয়েছিল। আমরা লেনদেন করেছি। পরে মেটাল টেস্টে বোঝা গেল সব ভুয়া।”

প্রতারকেরা ফাইভস্টার হোটেলের লাউঞ্জ, কনফারেন্স রুম এবং রেস্টুরেন্টে প্রদর্শনী ও ব্যক্তিগত ডিলের আয়োজন করতেন। বিলাসবহুল পরিবেশ ভুক্তভোগীদের মনে আস্থা তৈরি করত। হোটেলের পরিবেশ, সজ্জা এবং প্রফেশনাল আচরণ দেখেই ক্রেতারা বড় অঙ্কের লেনদেনে ঝুঁকতেন। ভুক্তভোগীরা বলেন, “হোটেলের বিলাসবহুল লাউঞ্জে বসে তারা এত পেশাদারীভাবে প্রেজেন্টেশন করেছিল যে কেউ সন্দেহ করতে পারেনি। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম এটি নিরাপদ বিনিয়োগ।”

চক্রটির একটি প্রধান কৌশল ছিল দেশের ধন্যাঢ্য ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের টার্গেট করা। তারা নিজেদেরকে প্রফেশনাল, অভিজ্ঞ এবং ইতিহাস বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করতেন। বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা তাদের টার্গেট হয়েছিলেন। ভুক্তভোগীরা জানান, বিলাসবহুল পরিবেশ এবং পেশাদারী প্রেজেন্টেশন দেখে তারা ভুল করে বড় অঙ্কের অর্থ প্রদান করেছিলেন।

এই প্রতারণা প্রক্রিয়ায় শত শত মানুষকে বড় অঙ্কের অর্থ প্রদান করানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিক অভিযোগ অনুযায়ী দেশের শতাধিক ব্যক্তি এই চক্রের শিকার হয়েছেন। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ধন্যাঢ্য ব্যক্তি—সবারই অর্থ ক্ষতি হয়েছে।

লেনদেনের পর অনেক সময় প্রতারকেরা আর উপস্থিত থাকতেন না। আবার কখনও অর্ধেক বস্তু বা কৃত্রিম কাগজপত্র দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করতেন। এই কৌশল ভুক্তভোগীদের হতবিহ্বল করে দিত এবং তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই তারা অনেক দূরে চলে যেত।

প্রাথমিকভাবে জানা যায় সাধারণ মানুষ ৫০ থেকে ৭০ জন এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। বৃহৎ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি প্রায় ১০ থেকে ২০ জন পর্যন্ত এই চক্রের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন শহর থেকে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা এবং রাজশাহী। প্রায় সকল ভুক্তভোগী একই পদ্ধতিতে অর্থ হারিয়েছেন—ফাইভস্টার হোটেলে প্রদর্শনী দেখার পর বড় অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে।

প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী চক্রটি কয়েকটি ধাপে পরিচালিত হয়েছে। প্রথমে বিশ্বাস তৈরি করা হতো ফাইভস্টার হোটেলের বিলাসবহুল পরিবেশে প্রদর্শনীর মাধ্যমে। এরপর সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি বা অনলাইনে যোগাযোগ করে প্রচারণা ও বিক্রয় কার্যক্রম চালানো হতো। তারপর লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পর অর্থ গ্রহণ করে অনেক সময় অদৃশ্য হয়ে যাওয়া বা ভুয়া কাগজপত্র দেখানোর ঘটনা ঘটত। এভাবে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করে দেশের ধন্যাঢ্য ব্যক্তিদেরও শিকার বানানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন ধরনের প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে লেনদেনের রশিদ, ব্যাংক ট্রান্সফারের তথ্য, ফেসবুক ও মেসেঞ্জারের কথোপকথনের স্ক্রিনশট, প্রদর্শিত বস্তু বা নমুনা এবং প্রত্যক্ষদর্শী ও হোটেলকর্মীদের বিবৃতি।

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে এসব বস্তু পরীক্ষা করার জন্য মেটাল কমপজিশন টেস্ট, স্ট্রাকচারাল বিশ্লেষণ এবং প্যাটিনা পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রফেশনাল বিশেষজ্ঞরা বলেন, “প্রাচীন বস্তু যাচাই করার জন্য শুধুমাত্র চেহারা বা ইতিহাসভিত্তিক ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। ল্যাবরেটরি টেস্ট এবং প্রমাণভিত্তিক যাচাই প্রয়োজন।”

আইনগত দিক থেকে প্রতারণা, জাল বিক্রয় এবং প্রতারণামূলক ব্যবসায়িক কৌশল এই চক্রের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ভুক্তভোগীরা থানায় জিডি বা মামলা দায়ের করে প্রমাণাদি জমা দিতে পারেন।

এই প্রতারণার ফলে দেশের শতাধিক মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।

অনিক ও সোহেলের এই প্রতারণা কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং দেশের ধন্যাঢ্য ও সাধারণ মানুষের আস্থাকেও নষ্ট করেছে। প্রমাণভিত্তিক তদন্ত এবং আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এ ধরনের চক্র আরও বিস্তার লাভ করতে পারে। ভুক্তভোগীরা একত্রিত হয়ে মামলা করলে প্রমাণাদি ও ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই চক্র ভেঙে ফেলা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সামাজিক সচেতনতা এবং পেশাদারী যাচাই ছাড়া বিনিয়োগ না করার জন্যও সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button