অনুসন্ধানঅপরাধ

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার এসআই জনি কান্তি দে’র বিরুদ্ধে ৮৪ কেজি গাঁজা আত্মসাতের অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

এম শাহীন আলম: কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার এসআই (নিঃ) জনি কান্তি দে (বিপি-৯০১৯২২৩৮২৫), এএসআই (নিঃ) মো. কবির হোসেন (বিপি-০১৬৪১-৫৪৬১৫৪), এএসআই (নিঃ) আলী আহমেদ (বিপি-৯৮১৭১৯৬৪৮৩) এবং কনস্টেবল মো. জাহাঙ্গীর আলম (বিপি-৯২১২১৫৩৫৯১)-এর বিরুদ্ধে একটি মাদক মামলায় জব্দকৃত গাঁজার বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। উল্লেখিত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন মামলার ১নং আসামী ও মাদক কারবারি ড্রাইভার মিজান। তবে মামলার এজাহার, আসামিদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ঘিরে বেশ কিছু প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, একটি পিকআপ ভ্যানে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় গাঁজা বহনের সময় চালক মিজানকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে দায়েরকৃত মামলার এজাহারে ৬০ কেজি গাঁজা উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হলেও গ্রেফতারকৃত আসামি মিজান দাবি করেছেন, পিকআপ ভ্যানে মোট ৭ বস্তায় ১৪৪ কেজি গাঁজা ছিল। তার অভিযোগ, অবশিষ্ট ৮৪ কেজি গাঁজা ঘটনাস্থল থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে মামলার ১ নম্বর আসামি ও পিকআপচালক মিজান (২২) জামিনে মুক্ত হয়ে ভিডিও বক্তব্যে আরও বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন। তিনি স্বীকার করেন যে, উদ্ধার হওয়া গাঁজা তার ছিল এবং তিনি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে তার দাবি, পিকআপে মোট সাত বস্তায় ১৪৪ কেজি গাঁজা ছিল। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের পর সেই গাঁজার মধ্যে চার বস্তা বা প্রায় ৮৪ কেজি অন্যত্র সরিয়ে নেয় এবং পরে মাত্র ৬০ কেজি গাঁজা দেখিয়ে আদালতে তাকে চালান দেয়।মিজানের ভাষ্যমতে, তাকে ভাগলপুর এলাকা থেকে আটক করা হলেও মামলায় গ্রেপ্তারের স্থান হিসেবে চৌয়ারা বাজারের ফুলতলী এলাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সুয়াগাজী বাজারের উত্তর-পশ্চিম পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে একটি সিএনজি তেলের পাম্পের পার্শ্ববর্তী ইটের সলিং সংযোগ সড়কে তার পিকআপ থামিয়ে একটি সিএনজি ডেকে আনা হয় এবং তার সামনেই চার বস্তা গাঁজা অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়।

মামলার এজাহারে সদর দক্ষিণ উপজেলার মুড়াপাড়া গ্রামের ইকবাল হোসেনের ছেলে কলেজ শিক্ষার্থী ইকরাম হোসেন (২২)-কে ২ নম্বর আসামি করা হয়। তবে গণমাধ্যমের নিকট দেওয়া ভিডিও বক্তব্যে ইকরাম দাবি করেন, তিনি কখনো মাদক ব্যবসা বা মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে মামলার আসামি করা হয়েছে।

ভিডিও বক্তব্যে ইকরাম বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। আমার এলাকার ১০ জন মানুষের মধ্যে যদি দুইজন মানুষও বলতে পারেন যে আমি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাহলে প্রশাসন আমাকে যে শাস্তি দেবে আমি তা মেনে নেব।

তিনি আরও বলেন, তিনি একজন কলেজ শিক্ষার্থী এবং অতীতে কিংবা বর্তমানে কোনো সময়ই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাই তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে তাকে মামলাটি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানান।

এদিকে মামলার ১ নম্বর আসামি ও পিকআপচালক মিজান, যিনি জামিনে মুক্ত হয়েছেন, তিনিও গণমাধ্যমের নিকট দেওয়া পুনরায় ভিডিও বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি স্বীকার করেন যে উদ্ধারকৃত গাঁজা তার ছিল এবং তিনি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, পুলিশ তার পিকআপ থেকে উদ্ধার হওয়া ১৪৪ কেজি গাঁজার মধ্যে মাত্র ৬০ কেজি গাঁজা মামলায় দেখিয়ে আদালতে চালান দিয়েছে।

মিজান আরও অভিযোগ করেন, গ্রেফতারের পর এসআই জনি কান্তি দে তাকে তার ভাগিনা ইকরামের নাম বলার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। তিনি জানান, প্রায় ১ মাস ২৭ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে নিজের মোবাইল ফোন ফেরত চাইতে থানায় গেলে পুনরায় ইকরামের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে চাপ দেওয়া হয়। এতে রাজি না হওয়ায় তাকে ইয়াবা দিয়ে নতুন মামলা দেওয়ার এবং শারীরিক ক্ষতির হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ড্রাইভারের ডান পাশের সিটে থাকা ব্যক্তি পালিয়ে যায়। এ বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ সাধারণত বাংলাদেশে ব্যবহৃত অধিকাংশ পিকআপ ভ্যানের চালকের ডান পাশে পৃথক যাত্রী আসন থাকে না। ফলে এজাহারে উল্লেখিত বর্ণনার যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এসআই (নিঃ) জনি কান্তি দে (বিপি-৯০১৯২২৩৮২৫)-এর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

১৪৪ কেজি গাঁজার মধ্যে ৮৪ কেজি গাঁজা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগটি নাকচ করে দেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন করেন, আপনি মাদক কারবারির পক্ষে আমাকে কল করেছেন কেন? পরে তিনি পুনরায় দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।

এর আগে ইকরামকে কোন তথ্যের ভিত্তিতে মামলার আসামি করা হয়েছে জানতে চাইলে এসআই জনি কান্তি দে বলেন, গ্রেফতারকৃত আসামির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্তে সত্যতা না পাওয়া গেলে তার নাম বাদ দেওয়া হবে।

এ ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—যদি গ্রেফতারকৃত আসামির দাবি অনুযায়ী প্রকৃতপক্ষে ১৪৪ কেজি গাঁজা উদ্ধার হয়ে থাকে, তাহলে মামলায় মাত্র ৬০ কেজি গাঁজা উল্লেখ করা হলো কেন? আবার যদি এ দাবি অসত্য হয়, তাহলে আসামি এমন অভিযোগ কেন করছেন? একই সঙ্গে মামলার এজাহার, গ্রেফতারের স্থান, আসামি অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি এবং জব্দকৃত মাদকের পরিমাণ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তারও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

জনস্বার্থে উত্থাপিত এসব অভিযোগ, গণমাধ্যমকে দেওয়া ভিডিও বক্তব্য এবং মামলার নথিতে থাকা বিভিন্ন অসঙ্গতির বিষয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশ প্রশাসন ও প্রয়োজন হলে স্বাধীন তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের দাবি।

এসআই জনি কান্তি দে এর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি রকিবুল ইসলামকে তার মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি কলটি রিসিভ করে মিটিং এ আছেন বলে পরে কল দিতে বলে কলটি কেটে দেন পরোক্ষে তিন ঘন্টা পর তাকে একাধিক কল দিলেও তিনি কল রিসিভ না করে বার বার কেটে দেন। মোবাইলে তাকে না পেয়ে তার হোয়াটসঅ্যাপে নক করলেও তিনি কোন রিপ্লাই দেননি।

আইন অনুযায়ী অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button