অনুসন্ধানঅভিযানদুর্নীতিপ্রতারনা

সাংবাদিক ও ‘সনাতনী স্বেচ্ছাসেবক’ পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগ পলাশ সেনকে ঘিরে নানা প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম নগরীতে নিজেকে কখনো সাংবাদিক, কখনো সনাতনী স্বেচ্ছাসেবক, আবার কখনো বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পলাশ সেন নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে প্রতারণা, বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আদায়, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার মতো একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্ট ও অভিযোগে বলা হচ্ছে, পলাশ সেনের নাম ও পরিচয় নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি নিজের পরিচয় পরিবর্তন করে ‘সেন পলাশ’ নাম ব্যবহার শুরু করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি পোস্টে অভিযোগ করা হয়েছে, একজন হিন্দু যুবকের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি করে দেওয়ার কথা বলে পলাশ সেন বিকাশের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। অভিযোগকারীর দাবি, টাকা নেওয়ার পরও এনআইডি করে দেওয়া হয়নি এবং টাকা ফেরত চাইলে ওই যুবককে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে।

এ ঘটনায় টাকা লেনদেনের একটি স্ক্রিনশটও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে স্ক্রিনশটটির সত্যতা, লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগকারীদের বক্তব্য, এনআইডি তৈরি করে দেওয়ার নামে কারও কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়ে থাকলে সেটি প্রতারণার আওতায় পড়ে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

অভিযোগ রয়েছে, পলাশ সেন বিভিন্ন সময় নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেন। এমনকি রাতের বেলায় পুলিশ কর্মকর্তাদের ফোন করে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।
তবে তিনি কোন গণমাধ্যমে কর্মরত, তার পদবি কী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার বর্তমান সম্পর্ক কী—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

এ কারণে তার সাংবাদিক পরিচয়ও যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে যদি কেউ ব্যক্তিগত সুবিধা নেন কিংবা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন, তাহলে সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিষয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

পলাশ সেনকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে রাজনৈতিক সহিংসতায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে, ওই সময় চট্টগ্রাম নগরীর নিউমার্কেট, চকবাজার, বহদ্দারহাট ও বাকলিয়া এলাকায় সংঘটিত বিভিন্ন সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় পলাশ সেন উপস্থিত ছিলেন।

একটি ভাইরাল পোস্টে তাকে হেলমেট পরা অবস্থায় হাতে লাঠি এবং কোমরে অস্ত্র সদৃশ বস্তু নিয়ে অবস্থান করার অভিযোগ করা হয়েছে। পোস্টটিতে দাবি করা হয়, তিনি কথিতভাবে হামলায় অংশ নিয়েছিলেন এবং সে সময় যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এখনো আছেন।

পলাশ সেনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় দায়ের হওয়া একটি দাঙ্গা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এক মাসেরও বেশি সময় কারাগারে থাকার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মামলায় গ্রেপ্তারের পর তিনি কারাগারে ছিলেন এবং পরবর্তীতে জামিনে বা আইনগত প্রক্রিয়ায় মুক্তি পান।

অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, কারাগারে যাওয়ার পর তার পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা করেছিলেন ড. কুশল বরণ চক্রবর্তী। এমনকি পরবর্তীতেও তাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

পলাশ সেনকে ঘিরে আরেকটি অভিযোগ হলো-তিনি বিভিন্ন সময় সনাতনী সম্প্রদায়ের সেবা ও বিভিন্ন ধর্মীয় বা সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ করেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, কখনো সাংবাদিক, কখনো সনাতনী সংগঠনের কর্মী কিংবা স্বেচ্ছাসেবক পরিচয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে কোন কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে, কোন উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে এবং সেই অর্থের কী হয়েছে-এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও নথি প্রকাশ করা হয়নি।

পলাশ সেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংগঠন ও পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কখনো সাংবাদিকতার পরিচয়, কখনো ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার পরিচয় এবং কখনো ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়।

পলাশ সেনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলোতে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কোতোয়ালী, চকবাজার, বাকলিয়া ও চান্দগাঁও থানার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে, কোতোয়ালী থানার এক কর্মকর্তার সঙ্গে পলাশ সেনের বিশেষ সখ্যতা রয়েছে এবং তাদের একসঙ্গে থাকা কিছু ছবিও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন-যদি পলাশ সেনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বা অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা কী নেওয়া হয়েছে এবং কোনো কর্মকর্তা তাকে সুবিধা দিয়েছেন কি না, তা তদন্ত করা হয়েছে কি না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পলাশ সেন নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘সেন পলাশ’ ব্যবহার শুরু করেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে তিনি পরিচয় পরিবর্তন করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাই একাধিকবার ফোন দিলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button