পতেঙ্গায় ইজারার আড়ালে ‘ম্যানেজ’ করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ, চালকদের হয়রানি ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রামের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত। কর্ণফুলী নদীর মোহনা ঘেঁষা এই পর্যটন এলাকায় প্রতিদিন দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটকের সমাগম হয়। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য, সমুদ্রের ঢেউ, বন্দরে অপেক্ষমাণ জাহাজ, বিভিন্ন বিনোদন ব্যবস্থা, খাবারের দোকান এবং আশপাশের দর্শনীয় স্থানকে কেন্দ্র করে পতেঙ্গা দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সরকারি পর্যটন তালিকাতেও পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।
কিন্তু এই জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রের গাড়ি পার্কিং এলাকাকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর চাঁদাবাজি, প্রভাব বিস্তার, চালকদের হয়রানি এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগরীর ৪০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির পতেঙ্গা এলাকার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেওয়া সালাউদ্দিন এবং তার সহযোগী হিসেবে পরিচিত ফোরকান। অভিযোগকারীদের দাবি, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের বিশাল পার্কিং এলাকায় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন থেকে নির্ধারিত ইজারা ফি’র বাইরে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সিএনজি অটোরিকশা থেকে ২০ টাকা, প্রাইভেটকার থেকে ৫০ টাকা, মাইক্রোবাস থেকে ৬০ টাকা এবং বাস থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত চাঁদাবাজির টাকা আদায় করা হয়। সংশ্লিষ্টদের আরও অভিযোগ, প্রতিদিন এই পার্কিং এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হচ্ছে এবং আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন ব্যক্তি ও মহলের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
প্রতিবেদকের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনে সালাউদ্দিন নিজেকে পতেঙ্গা বীচের পার্কিং এলাকার ইজারাদার হিসেবে দাবি করেন। তিনি জানান, নাহার এন্টারপ্রাইজের নামে তিনি জায়গাটি ইজারা নিয়েছেন এবং ইজারার খরচ মেটাতে বিভিন্ন জায়গায় অর্থ দিতে হয়। প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রশাসন, বিভিন্ন নেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ‘ম্যানেজ’ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পার্কিং এলাকা থেকে টাকা আদায়ের জন্য কয়েকজন লোক রাখা হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইজারার অর্থ ও অন্যান্য খরচের কারণে শুধু নির্দিষ্ট জায়গা থেকে আদায় করা অর্থ দিয়ে ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন। প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ফোরকানও ভুয়া সাংবাদিক, পুলিশ প্রশাসন ও বিভিন্ন নেতাকে ‘ম্যানেজ’ করার প্রসঙ্গ তুলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি সংবাদ প্রকাশ না করার বিনিময়ে প্রতিবেদককে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল একাধিকবার।পরবর্তীতে ফোন করে টাকা পাঠানোর জন্য বিকাশ নম্বর চাওয়া এবং প্রতি মাসে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব কথা একাধিক গোপন ভিডিও ও কল রেকর্ড রয়েছে প্রতিবেদকের হাতে।
স্থানীয় এক ভাসমান দোকানদার অভিযোগ করে বলেন, সালাউদ্দিন, ফোরকান, আলমগীর ও শফিকসহ কয়েকজনের মাধ্যমে প্রতিদিন দোকানদারদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয়। তার দাবি, প্রতিদিন ১৫ হাজার টাকারও বেশি অর্থ আদায় করা হয় এবং পুলিশ বিষয়টি জানে।
কয়েকজন সিএনজি, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও বাসচালক অভিযোগ করেন, অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, ভয়ভীতি প্রদর্শন এমনকি মারধরের ঘটনাও ঘটে। চালকদের দাবি, পার্কিং এলাকায় টাকা আদায়ের কারণে তারা নিয়মিত চাপের মুখে থাকেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে এবং বিষয়টি বন্ধে কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। আরও দাবি করা হয়েছে, পার্কিং এলাকা থেকে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ আদায় হয়, যা মাসে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত দাঁড়াতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি, নেতা, পুলিশ কর্মকর্তা, টিআই, ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং কথিত সাংবাদিকদের মধ্যে অর্থ বণ্টনের অভিযোগও করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এককালীন ব্যয়ের হিসাবেও কয়েকটি খাত উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে জেলা প্রশাসকের পে-অর্ডার বাবদ ৪৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, ভাড়া, শিডিউল ও নাস্তা/ভাত বাবদ ১১ হাজার টাকা, আগের ইজারাদারের চিঠির কারণে শেষ দিনের খরচ ৪০ হাজার টাকা, সেটআপ ক্রয় বাবদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, মেশিনের অগ্রিম জমা ৫০ হাজার টাকা, দুটি শিডিউল নেগোসিয়েশন বাবদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং অতিরিক্ত খরচ বাবদ ২০ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব খাতের মোট হিসাব ৭১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিবেদকের হাতে থাকা বলে দাবি করা জেলা প্রশাসনের কার্যাদেশের তথ্য। ওই নথিতে দেখা যায়, পতেঙ্গা বীচের গাড়ি পার্কিং এলাকার ইজারা নাহার এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর মো. সালাউদ্দিনের অনুকূলে দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে পতেঙ্গার মেইন পয়েন্ট থেকে পূর্ব পাস। কার্যাদেশে উদ্ধৃত ইজারা মূল্য ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, অবশিষ্ট ইজারা মূল্য ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ৫ শতাংশ জামানত হিসেবে ১ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ টাকা, ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং ১০ শতাংশ আয়কর বাবদ ৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা সরকারি কোডে জমা দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। সব মিলিয়ে নথিতে ৩৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকার হিসাব পাওয়া যায়। কার্যাদেশে ১৪৩৩ বাংলা সনের ১ বৈশাখ থেকে ৩০ চৈত্র পর্যন্ত এক বছরের জন্য ইজারা প্রদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই নথিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পতেঙ্গা সার্কেল ভূমি অফিস এবং পতেঙ্গা থানাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরকে অবগত করা হয়েছে। কার্যাদেশে ইজারা এলাকার চৌহদ্দি নির্ধারণ করে ইজারাগ্রহীতার অনুকূলে দখল বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনার কথাও রয়েছে। অর্থাৎ, ইজারা বৈধভাবে দেওয়া হয়ে থাকলেও ইজারার আওতার বাইরে কোনো ব্যক্তি বা যানবাহন থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় এবং সেটি আইনগতভাবে যাচাইয়ের দাবি রাখে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সরকারি তথ্যেও ইজারা কার্যক্রম ও এ-সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য দালিলিক প্রমাণ, সাক্ষী, অডিও-ভিডিও বা স্থিরচিত্রসহ অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় পতেঙ্গা ট্যুরিস্ট পুলিশের ওসি ইমাম হাসান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, পার্কিংয়ের ওই স্থানটি তাদের আওতাভুক্ত নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকাটি জেলা প্রশাসন, পতেঙ্গা থানা পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ একাধিক সংস্থার আওতাধীন। তিনি নিজে কোনো চাঁদার টাকা নেননি বলেও দাবি করেন। তার বক্তব্য, কেউ অনিয়ম বা জোরপূর্বক অর্থ আদায় করলে প্রশাসন বিষয়টি দেখবে। অন্যদিকে টিআই সেলিমের বিরুদ্ধে গাড়িচালকদের বিভিন্ন অভিযোগের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলেও তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হয়েছিল এবং তিনি ফোন রিসিভ করেননি । ফলে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে পতেঙ্গা থানার ওসি পারভেজ আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি জানার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পর্যটন এলাকায় ইজারার নামে নির্ধারিত ফি’র বাইরে কোনো অর্থ আদায় হচ্ছে কি না, হলে কারা আদায় করছে, সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সংস্থাগুলো এতদিন কী ব্যবস্থা নিয়েছে। সরকারি কার্যাদেশে ইজারা প্রদানের বিষয়টি একদিকে নথিভুক্ত থাকলেও ইজারার আড়ালে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে সেটি জনস্বার্থের গুরুতর বিষয়। তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, পার্কিং এলাকার সীমানা ও ইজারার শর্ত প্রকাশ, আদায়ের হার স্পষ্টভাবে নির্ধারণ, প্রতিটি যানবাহনকে বৈধ রসিদ প্রদান এবং জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তি বা অন্য কোনো প্রভাবশালী মহল এই অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত কি না, অভিযোগে যেসব অর্থ বণ্টনের কথা বলা হয়েছে সেগুলোর কোনো আর্থিক বা প্রামাণ্য ভিত্তি আছে কি না এবং ইজারাদার প্রকৃতপক্ষে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন-এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। পতেঙ্গা সৈকত পর্যটকদের নিরাপদ ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার জায়গা হওয়ার কথা। সেখানে ইজারা ব্যবস্থার বৈধতা এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট না থাকলে ভোগান্তির শিকার হবেন সাধারণ পর্যটক ও পরিবহনশ্রমিকরাই। তাই এখন মূল প্রশ্ন একটাই-ইজারার বৈধতার আ দিক থেকেও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকে। সরকারি ওয়েবসাইটে পতেঙ্গা পর্যটন স্পট হিসেবে তালিকাভুক্ত এবং ইজারা-সংড়ালে যদি অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সেই ‘ওপেন’ অর্থ আদায় চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে কে?



