অনুসন্ধানঅভিযান

সম্মানী নয়, ধর্মীয় নেতৃত্বের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার নতুন অধ্যায়

রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতার আওতায় চলতি অর্থবছরে ৮৬,৭০৯ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান

বিল্লাল বিন কাশেম

একটি রাষ্ট্র কেবল তার রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা কিংবা প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর মাধ্যমে আধুনিক হয়ে ওঠে না। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে তার মানুষের নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ওপর। আর এসব মূল্যবোধ নির্মাণে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম থেকে শুরু করে মন্দিরের পুরোহিত ও সেবাইত, বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ এবং গির্জার যাজক ও সহকারী যাজক- তাঁরা প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিপুলসংখ্যক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী এসব মানুষের একটি বড় অংশকে সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যেই ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। তাঁদের অনেকের জন্য ধর্মীয় দায়িত্ব পালন ছিল মূলত সেবামূলক কাজ; এর বিনিময়ে নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক কোনো রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছিল না। ফলে ধর্মীয় নেতৃত্বের সামাজিক গুরুত্বের সঙ্গে তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তার মধ্যে একটি বড় ধরনের বৈপরীত্য বিদ্যমান ছিল।

এই বাস্তবতার পরিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতার আওতায় আসছে দেশের ৮৬ হাজার ৭০৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে ৮২ হাজার ৬৫৬টি মসজিদ, ৩ হাজার মন্দির, ৭৫২টি বৌদ্ধ বিহার এবং ৩০১টি গির্জা। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোট ২ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪ জন ধর্মীয় নেতা ও কর্মী রাষ্ট্রীয় এই সুবিধার আওতায় আসবেন। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নেওয়া এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক নীতির ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি মাসেই এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন- এ তথ্য এই উদ্যোগের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে। কারণ এটি কেবল একটি ভাতা কার্যক্রম নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ধর্মীয় নেতৃত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া, তাঁদের জীবনযাত্রার ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে সামাজিক কল্যাণের আরও কার্যকর কেন্দ্রে পরিণত করার একটি বৃহত্তর প্রত্যাশা।

নির্বাচনি অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়নের পথে

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহার জনগণের সঙ্গে একটি নীতিগত অঙ্গীকার। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন তাই সরকারের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য মাসিক সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতিও এখন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত সেলের সাম্প্রতিক সভায় চলতি অর্থবছরের এই সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা, মন্ত্রী পদমর্যাদায়, এবং সেলের সভাপতি মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার, ধর্মসচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, সমাজকল্যাণ সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফসহ সেলের অন্যান্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- সরকার কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠানকে এই সুবিধার আওতায় আনছে না। মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধ বিহার ও গির্জা- চার ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় সম্মানী ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানসম্মত ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বাস্তবতায় এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে।

৮৬ হাজার ৭০৯ প্রতিষ্ঠান- কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

সংখ্যাটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নগরজীবন পর্যন্ত লাখ লাখ মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন।

চলতি অর্থবছরে ৮২ হাজার ৬৫৬টি মসজিদ এই কর্মসূচির আওতায় আসছে। পাশাপাশি ৩ হাজার মন্দির, ৭৫২টি বৌদ্ধ বিহার এবং ৩০১টি গির্জা অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভৌগোলিক বিস্তৃতি, সম্প্রদায়ভিত্তিক বৈচিত্র্য এবং সামাজিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে একটি বৃহৎ কাঠামো গড়ে উঠছে।

এই কর্মসূচির আওতায় মোট ২ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪ জন ধর্মীয় নেতা ও কর্মী সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় বাজেটের একটি অংশ সরাসরি এমন মানুষের কাছে পৌঁছাবে, যাঁরা প্রতিদিন মানুষের ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।

একজন ইমাম শুধু নামাজ পড়ান না। তিনি অনেক সময় পারিবারিক সংকটে পরামর্শ দেন, সামাজিক বিরোধ মীমাংসায় ভূমিকা রাখেন, তরুণদের নৈতিক শিক্ষা দেন, জানাজা পড়ান, বিয়ে পড়ান এবং দুর্যোগের সময়ে মানুষকে সংগঠিত করেন। একইভাবে একজন পুরোহিত, সেবাইত, বৌদ্ধ ভিক্ষু কিংবা গির্জার যাজকও নিজ নিজ সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

রাষ্ট্রীয় সম্মানী তাঁদের এই সামাজিক অবদানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

ভাতার কাঠামো: প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যের প্রশ্ন

নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় নেতাদের জন্য নির্ধারিত সম্মানীর কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ এবং গির্জার যাজক প্রত্যেকে মাসিক ৫ হাজার টাকা সম্মানী পাবেন। মসজিদের মুয়াজ্জিন, মন্দিরের সেবাইত, বৌদ্ধ বিহারের উপাধ্যক্ষ এবং গির্জার সহকারী যাজকের জন্য নির্ধারিত হয়েছে মাসিক ৩ হাজার টাকা। আর মসজিদের খাদেম পাবেন মাসিক ২ হাজার টাকা।

এই অর্থ সরাসরি উপকারভোগীদের ব্যাংক হিসাবে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার বা EFT-এর মাধ্যমে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমবে, অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং উপকারভোগীরা সরাসরি তাঁদের প্রাপ্য অর্থ পাবেন।

তবে এখানেই সরকারের দায়িত্ব শেষ নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ধর্মীয় নেতাদের সামাজিক দায়িত্ব বিবেচনায় নিয়ে এই সম্মানীর পরিমাণ ভবিষ্যতে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে। আজ যে অর্থ একজন ধর্মীয় নেতার জন্য সহায়ক, কয়েক বছর পর একই অর্থের প্রকৃত মূল্য কমে যেতে পারে। তাই সম্মানী ব্যবস্থাকে একটি স্থায়ী নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করে নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি।

নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

এত বড় একটি কর্মসূচির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো উপকারভোগী নির্বাচন। কারণ দেশের সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে এই সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কোন প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত হবে, আর কোনটি পরবর্তী ধাপে থাকবে- এ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ ও প্রত্যাশা থাকবে।

চলতি অর্থবছরে প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে ১৫টি মসজিদ নির্বাচন করা হবে। পৌরসভায় শ্রেণিভেদে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক মসজিদ নির্বাচন করা হবে- ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে চারটি, ‘খ’ শ্রেণির পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে তিনটি এবং ‘গ’ শ্রেণির পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে দুটি। সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ছয়টি করে মসজিদ নির্বাচন করা হবে।

মন্দিরের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রতিটি উপজেলা থেকে পাঁচটি মন্দির নির্বাচন করা হবে। এর মধ্যে ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভার প্রতিটি থেকে দুটি এবং অন্যান্য শ্রেণির পৌরসভা থেকে একটি করে মন্দির নির্বাচন করা হবে। অবশিষ্ট মন্দির ইউনিয়ন পর্যায় থেকে নির্বাচন করা হবে। বৌদ্ধ বিহার ও গির্জার সংখ্যা জেলাভিত্তিক ২৫ শতাংশ হারে নির্ধারণ করা হবে।

এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাকে। রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সুপারিশ, প্রভাবশালী মহলের চাপ কিংবা স্থানীয় দ্বন্দ্ব যেন কোনোভাবেই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অস্তিত্ব, নিয়মিত কার্যক্রম, জনসম্পৃক্ততা, ধর্মীয় সেবার পরিধি এবং সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় নেতার দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এক-চতুর্থাংশ থেকে শতভাগ

এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ। চলতি অর্থবছরে দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ধর্মীয় উপাসনালয় রাষ্ট্রীয় এই সুবিধার আওতায় আসছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তী তিন অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে দেশের শতভাগ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে এই সুবিধার আওতায় আনা হবে।

এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সামাজিক কল্যাণনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়ে যে কার্যক্রম শুরু হচ্ছে, সেটি ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ের একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় কল্যাণ কাঠামোয় রূপ নিতে পারে।

তবে শতভাগ প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করার আগে একটি নির্ভুল জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা জরুরি। কোন মসজিদ কোথায়, সেখানে কে ইমাম বা মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কেমন, কোন মন্দিরে কে পুরোহিত বা সেবাইত, কোন বৌদ্ধ বিহারে কে দায়িত্ব পালন করছেন কিংবা কোন গির্জায় কারা ধর্মীয় সেবা দিচ্ছেন- এসব তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

এতে ভবিষ্যতে ভাতা প্রদান, তথ্য হালনাগাদ, বদলি, দায়িত্ব পরিবর্তন, মৃত্যু, অবসর কিংবা নতুন নিয়োগ- সবকিছু দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

পাইলট প্রকল্প থেকে বৃহৎ কর্মসূচি

এই বৃহৎ কর্মসূচির ভিত্তি তৈরি হয়েছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ওই অর্থবছরে দেশের ৬ হাজার ১৭টি নির্বাচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মোট ১৩ হাজার ৯৪৯ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত, সেবাইতসহ অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিকে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় সম্মানী দেওয়া হয়।

পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার কর্মসূচির ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটানো হচ্ছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত শিক্ষা দেয়- বৃহৎ সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করে তার সমস্যা, সম্ভাবনা ও প্রশাসনিক জটিলতা চিহ্নিত করা কার্যকর পদ্ধতি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার গঠনের এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই ১৪ মার্চ ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে পাইলট কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছিলেন। এরপর মাত্র একটি অর্থবছরের ব্যবধানে কর্মসূচির পরিধি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাওয়া সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সম্মানীর পাশাপাশি প্রশিক্ষণ জরুরি

তবে এই উদ্যোগের সাফল্য শুধু টাকা দেওয়ার ওপর নির্ভর করবে না। ধর্মীয় নেতাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণকে এর সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

একজন আধুনিক ইমামকে শুধু নামাজ ও ধর্মীয় বিধিবিধান জানলেই হবে না; তাঁকে সামাজিক যোগাযোগ, পারিবারিক কাউন্সেলিং, কিশোর-তরুণদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশ, মাদকবিরোধী সচেতনতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসচেতনতা, নাগরিক দায়িত্ব এবং সামাজিক সম্প্রীতি সম্পর্কেও ধারণা দিতে হবে।

একইভাবে অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারীদের জন্যও তাঁদের নিজ নিজ ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামাজিক নেতৃত্ব, মানবিকতা, সম্প্রীতি ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।

কারণ একজন ধর্মীয় নেতা একটি এলাকার মতামত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর বক্তব্য মানুষের চিন্তা ও আচরণে প্রভাব ফেলে। তাই প্রশিক্ষিত, জ্ঞানসমৃদ্ধ, দায়িত্বশীল ও মানবিক ধর্মীয় নেতৃত্ব একটি দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতার বড় সম্পদ হতে পারে।

ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা সময়ের দাবি

রাষ্ট্রীয় সম্মানী প্রদানের এই বিশাল কার্যক্রমকে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। আবেদন, যাচাই, নির্বাচন, অনুমোদন, উপকারভোগীর তথ্য সংরক্ষণ এবং EFT-এর মাধ্যমে অর্থ প্রদান- প্রতিটি ধাপের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে।

এতে একই ব্যক্তির নামে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সুবিধা গ্রহণ, ভুয়া প্রতিষ্ঠান, মৃত বা দায়িত্বে না থাকা ব্যক্তির নামে অর্থ প্রদান কিংবা তথ্যের অসঙ্গতি সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

একটি কেন্দ্রীয় Religious Institutions & Religious Leaders Management System গড়ে তোলা হলে শুধু সম্মানী নয়, প্রশিক্ষণ, কল্যাণ, নিবন্ধন, পরিচয়পত্র, সনদ, বদলি, কর্মজীবনের তথ্য এবং ভবিষ্যৎ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও এর সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে।

এ ক্ষেত্রে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।

সামাজিক নিরাপত্তার বৃহত্তর কাঠামো প্রয়োজন

রাষ্ট্রীয় সম্মানীকে যদি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত করা যায়, তাহলে এটি কেবল মাসিক অর্থ প্রদানের কর্মসূচি না থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় নেতৃত্ব কল্যাণ ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।

দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকারী ধর্মীয় নেতাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, প্রশিক্ষণ, দুর্ঘটনা সহায়তা, অবসরকালীন সহায়তা, দুর্যোগকালীন সহায়তা কিংবা বিশেষ কল্যাণ তহবিলের মতো ব্যবস্থা ভবিষ্যতে বিবেচনা করা যেতে পারে।

বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক ইমাম, পুরোহিত, বৌদ্ধ ভিক্ষু কিংবা যাজক সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যে মানুষের ধর্মীয় সেবা দিয়ে থাকেন। তাঁদের সামাজিক অবদান বিবেচনায় এনে একটি সুসংগঠিত কল্যাণ কাঠামো তৈরি করা গেলে ধর্মীয় নেতৃত্ব আরও স্থিতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণ হবে।

ধর্মীয় সম্প্রীতির বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো ধর্মীয় সম্প্রীতি। মসজিদের আজান, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, বৌদ্ধ বিহারের প্রার্থনা এবং গির্জার ঘণ্টাধ্বনি—সব মিলিয়েই বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সামাজিক বাস্তবতা।

রাষ্ট্রীয় সম্মানী ব্যবস্থায় চার ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ সেই বহুত্ববাদী চেতনাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তবে এই নীতির বাস্তব প্রয়োগেও সমতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায় নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোনো ধর্মকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়; বরং প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে এই নীতিই হওয়া উচিত মূল ভিত্তি।

সামনে আরও বড় সম্ভাবনা

চলতি অর্থবছরে ৮৬ হাজার ৭০৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় সম্মানী ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে বড় একটি কর্মসূচি। কিন্তু এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের মানের ওপর।

অর্থ বরাদ্দ করা সহজ; সঠিক ব্যক্তির কাছে সঠিক সময়ে সেই অর্থ পৌঁছে দেওয়া কঠিন। তালিকা তৈরি করা সহজ; তালিকাটি নির্ভুল রাখা কঠিন। প্রশিক্ষণের আয়োজন করা সহজ; প্রশিক্ষণকে বাস্তব জীবনে কার্যকর করা কঠিন। তাই এই কর্মসূচির প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিয়মিত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় সম্মানী কোনো দান নয়- এটি ধর্মীয় ও সামাজিক সেবার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এই মানসিকতাই কর্মসূচির মূল দর্শন হওয়া উচিত। একজন ইমাম, পুরোহিত, বৌদ্ধ ভিক্ষু কিংবা যাজক যেন মনে করেন- রাষ্ট্র তাঁর সেবাকে মূল্যায়ন করছে, তাঁর দায়িত্বকে সম্মান করছে এবং তাঁর ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ে দায়িত্বশীল।

সবশেষে বলা যায়, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে ৮৬ হাজার ৭০৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সামাজিক নীতির ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। পাইলট প্রকল্প থেকে বৃহৎ কর্মসূচি, এক-চতুর্থাংশ প্রতিষ্ঠান থেকে আগামী তিন অর্থবছরে শতভাগ প্রতিষ্ঠানে সম্প্রসারণ- এই যাত্রা সফল হলে তা শুধু ধর্মীয় নেতাদের আর্থিক সহায়তা দেবে না; বরং দেশের নৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেবে।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হবে শুধু উপাসনার স্থান নয়- নৈতিক শিক্ষা, মানবিকতা, সামাজিক সম্প্রীতি, জনকল্যাণ ও শান্তির কেন্দ্র। আর সেই কেন্দ্রগুলোর নেতৃত্বে থাকা মানুষগুলোও যেন ন্যূনতম মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের সেবা করতে পারেন।

রাষ্ট্রীয় সম্মানী সেই বৃহত্তর স্বপ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। এখন প্রয়োজন- এই সূচনাকে সুশাসন, স্বচ্ছতা, প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণনীতির মাধ্যমে একটি টেকসই জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত করা। তাহলেই ৮৬ হাজার ৭০৯টি প্রতিষ্ঠানের এই সংখ্যা একদিন শুধু পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে একটি নৈতিক, মানবিক, সম্প্রীতিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশের নির্মাণযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
bbqif1983@gmail.com

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button