অনুসন্ধানঅপরাধঅব্যাবস্থাপনাএক্সক্লুসিভ

কাঠের চশমা চসিক মেয়রের চোখে, ফুটপাত গিলে খাচ্ছে নেতারা

মুহাম্মদ জুবাইর

রমজান ঈদে ফুটপাত দখলের মহোৎসব,কোটি টাকার চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া সিন্ডিকেট,ফুটপাত হারিয়ে রাস্তায় মানুষ,দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে,নগরবাসীর প্রশ্নে নীরব সিটি কর্পোরেশন। পুলিশ ভুয়া সাংবাদিকরাও এসব ফুটপাত থেকে নিয়ে থাকেন টাকা।

জনগণের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত রাস্তা ও ফুটপাত আজ সাধারণ মানুষের নয়,দখলদার চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে,ফুটপাত এখন আর পথচারীদের চলাচলের জায়গা নয়,বরং এটি পরিণত হয়েছে অবৈধ দোকান আর চাঁদাবাজির বিশাল বাজারে।বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাস এবং আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে এই অবৈধ বাণিজ্য যেন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ব্যস্ত এলাকাগুলোতে ফুটপাত জুড়ে সারি সারি দোকান বসানো হয়েছে।এসব দোকানের অধিকাংশই বসানো হয় কথিত কিছু নেতা ও তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে এসব চাঁদাবাজদের নামের সাথে এডজাস্ট আছে বিএনপি।তারা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ফুটপাত দখল করে দোকান বসানোর সুযোগ দেয় এবং বিনিময়ে আদায় করে মোটা অঙ্কের টাকা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,একটি দোকান বসাতে প্রথমেই দিতে হয় এককালীন ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত।এলাকাভেদে এই অঙ্ক আরও বেশি হতে পারে। এরপর রয়েছে সাপ্তাহিক কিংবা মাসিক মাসোহারা।এই মাসোহারা নিয়মিত না দিলে দোকান বসানোর সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয় কিংবা দোকান উচ্ছেদ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে এই অবৈধ চাঁদা দিতে থাকে।

নগরবাসীর অভিযোগ,এই অবৈধ বাণিজ্যের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট। অনেকেই মনে করেন, প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি ও অসাধু কর্মকর্তার নীরব সমর্থন না থাকলে এত বড় আকারে ফুটপাত দখল করা সম্ভব নয়। মাঝে মাঝে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা অধিকাংশ সময়ই লোক দেখানো বলে মনে করেন নগরবাসী। কয়েকদিন পর আবার আগের মতোই ফুটপাতে দোকান বসে যায় এবং চাঁদাবাজি আবার শুরু হয়।

ফুটপাত দখলের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। যে ফুটপাত দিয়ে মানুষ নিরাপদে হাঁটার কথা, সেখানে এখন দোকান আর ভিড়ের কারণে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে পথচারীদের গাড়ি চলাচলের রাস্তায় নেমে হাঁটতে হচ্ছে। এতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই দেখা যায়, রাস্তার পাশে মানুষ হাঁটছে আর পাশ দিয়ে দ্রুতগতির গাড়ি চলাচল করছে। এই পরিস্থিতি যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে। ইতিমধ্যেই ছোট বড় অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যেখানে আহত হয়েছেন সাধারণ পথচারীরা।

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, ফুটপাত মানুষের চলাচলের অধিকার। সেই অধিকার কেড়ে নিয়ে অবৈধ দোকান বসানো শুধু আইন বিরোধী নয়, এটি জনস্বার্থেরও চরম অবহেলা। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি এই অবকাঠামো দখল করে একটি সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, অথচ সাধারণ মানুষ প্রতিদিন ভোগান্তি আর ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করছে।

নগরবাসীর মধ্যে এখন একটি বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, এই ফুটপাতের টাকা আসলে কারা খাচ্ছে। সাধারণ মানুষ বলছেন, সবকিছু সবারই জানা। তবুও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় রহস্য।
অনেকেই বলছেন, যদি কঠোরভাবে এবং স্থায়ীভাবে ফুটপাত উচ্ছেদ করা হতো, তাহলে এই অবৈধ দখল এতটা বিস্তার লাভ করতে পারত না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, উচ্ছেদের নামে কিছুদিন অভিযান চালানো হয়, তারপর আবার আগের মতোই অবৈধ দোকান বসে যায়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নগরীর কিছু ফুটপাত এলাকায় প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অনেক জায়গায় গাঁজা ও ইয়াবা সহজেই পাওয়া যায়। এসব স্থানে তরুণদের আড্ডা বসে এবং মাদক সেবনের ঘটনাও ঘটে। এতে করে এলাকার সামাজিক পরিবেশ দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে।
নগরীর সচেতন মহল বলছে, যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। ফুটপাত দখল, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা মিলিয়ে একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যা শহরের আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
নগরবাসীর দাবি, ফুটপাত দখলমুক্ত করতে হবে স্থায়ীভাবে। যারা ফুটপাত দখল করে চাঁদাবাজি করছে এবং যারা এই অবৈধ কার্যক্রমকে প্রশ্রয় দিচ্ছে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে এই সমস্যা কখনোই বন্ধ হবে না।

সাধারণ মানুষ এখন একটি নিরাপদ শহর চায়,যেখানে তারা নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারবে, দুর্ঘটনার ভয় থাকবে না এবং তাদের অধিকার কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। ফুটপাত মানুষের জন্য, দখলদারদের জন্য নয়। এখন সময় এসেছে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার, যাতে নগরীর ফুটপাত আবার মানুষের কাছে ফিরে আসে এবং শহর সত্যিকারের নিরাপদ ও বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button