চট্টগ্রাম বিভাগপ্রশাসন

অভিযোগের পাহাড়ে চাপা পড়া পতেঙ্গা থানা কৃষক দলের আহ্বায়ক নাসির, হত্যা থেকে মাদক পর্যন্ত বিস্ফোরক তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সী-বিচ সংলগ্ন আমপাড়া মার্কেট এলাকায় ঘটে যাওয়া এক রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে এখন চরম উত্তেজনা, উদ্বেগ এবং ক্ষোভ বিরাজ করছে। নিহত রাসেল মল্লিক ওরফে পলাশের মৃত্যু শুধু একটি সাধারণ ঘটনা নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে একটি সম্ভাব্য পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে সামনে আসছে। এই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছে স্থানীয় প্রভাবশালী পতেঙ্গা থানা কৃষক দলের আহবায়ক মোঃ নাসিরের নাম, যিনি “সী-বার্ড রেস্টুরেন্ট” এর মালিক হিসেবেও পরিচিত।

নিহতের পরিবার, বিশেষ করে তার মা সচী মল্লিক, একজন অসহায় বৃদ্ধা নারী, এই ঘটনাকে সরাসরি হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন। তার অভিযোগ, তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে লাশ গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। মামলায় নাসিরকে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও তার ভাই মোঃ নেজাম এবং রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার মোঃ জসিমসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।

ঘটনার শুরু ২০২৫ সালের ১৬ জুন। ওইদিন সন্ধ্যার দিকে নিহত রাসেল মল্লিক তার স্ত্রীর সঙ্গে সর্বশেষ কথা বলেন। তিনি জানান, অল্প সময়ের মধ্যে টাকা পাঠাবেন। কিন্তু এরপর হঠাৎ করেই তার মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যায়। পরিবার প্রথমে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিলেও ধীরে ধীরে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

পরদিন থেকে শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নেওয়া হয়, কিন্তু কোথাও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। এরপর ১৮ জুন নিহতের স্ত্রী এবং মা তার কর্মস্থল সী-বার্ড রেস্টুরেন্টে যান। সেখানে গিয়ে তারা নাসিরের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি অসংলগ্ন ও অস্পষ্ট বক্তব্য দিতে থাকেন। তার কথাবার্তায় স্বাভাবিকতা না থাকায় পরিবারের সন্দেহ আরও বাড়তে থাকে।

রেস্টুরেন্টের অন্যান্য কর্মচারীদের সঙ্গেও কথা বলা হয়, কিন্তু তারা কেউই কোনো স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। বরং অনেকেই নীরবতা বজায় রাখেন, যা পরিস্থিতিকে আরও রহস্যময় করে তোলে। একইদিন বিকেলে পরিবার স্থানীয় থানায় যায় এবং নিখোঁজ ডায়েরি করার চেষ্টা করে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ তাদের তেমন গুরুত্ব দেয়নি এবং প্রথমে আত্মীয়দের কাছে খোঁজ নিতে বলে।

এদিকে ২১ জুন রাতে আমপাড়া মার্কেটের নিচে একটি জেনারেটর রুম থেকে একটি অজ্ঞাত ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে সেই মরদেহের একটি ছবি নিহতের পরিবারকে দেখানো হলে তারা সেটিকে রাসেল মল্লিক হিসেবে শনাক্ত করেন।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়, বরং এখান থেকেই শুরু হয় আরও বড় প্রশ্ন। কেন একটি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পরও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হত্যা মামলা রুজু করা হয়নি? কেন পরিবারকে যথাযথভাবে জানানো হয়নি? কেন মরদেহের আলামত সংরক্ষণ করা হয়নি?

পরিবারের অভিযোগ, তারা যখন থানায় গিয়ে বিস্তারিত জানতে চান, তখন পুলিশ কোনো স্পষ্ট জবাব দেয়নি। বরং জানানো হয়, মরদেহ ইতোমধ্যে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। এই তথ্য শুনে পরিবার ভেঙে পড়ে এবং একইসঙ্গে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে তারা আঞ্জুমান ট্রাস্টে যোগাযোগ করলেও সেখান থেকেও সঠিক তথ্য পায়নি। এতে তাদের সন্দেহ আরও দৃঢ় হয় যে, পুরো ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।

মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে রাসেল মল্লিককে হত্যা করে এবং পরে লাশ গোপন করার চেষ্টা করে। ঘটনাস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আমপাড়া মার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা একটি জেনারেটর রুম, যা আসামিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিচেই অবস্থিত।

এলাকাবাসীর মধ্যেও নাসিরকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই দাবি করেন, তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মাদক সেবন হয়। এছাড়াও অবৈধ কার্যক্রম, অসামাজিক কর্মকাণ্ড এবং সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, খুব অল্প সময়ের মধ্যে তার বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া। কয়েক বছর আগেও যেখানে একটি ছোট দোকান ছিল, সেখানে এখন একাধিক রেস্টুরেন্ট এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। এই দ্রুত উত্থান নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

নাসিরের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তিনি স্থানীয় একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। অনেকের মতে, এই রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেই তিনি প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছেন এবং বিভিন্ন অভিযোগ থেকে নিজেকে রক্ষা করে আসছেন।

এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একজন কর্মচারীর মরদেহ তারই কর্মস্থলের নিচে পাওয়া গেল, অথচ প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। এটি শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ব্যর্থতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

নিহতের পরিবার বারবার দাবি করছে, তারা ন্যায়বিচার চায়। তারা বলছে, যদি সঠিক তদন্ত হয়, তাহলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। তারা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে এবং আশা করছে, আইনের মাধ্যমে তারা তাদের প্রাপ্য বিচার পাবে।

এদিকে তদন্তকারী সংস্থা এখনো পুরো ঘটনার রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি। ময়নাতদন্ত রিপোর্টও দেরিতে পাওয়া গেছে বলে জানা যায়। ফলে তদন্ত প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগোচ্ছে, যা পরিবারকে আরও হতাশ করছে।

স্থানীয় জনগণও এ ঘটনার দ্রুত বিচার দাবি করছে। তাদের মতে, যদি এমন একটি স্পষ্ট ঘটনায় দোষীরা শাস্তি না পায়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় অপরাধ ঘটতে পারে।

এই ঘটনাটি এখন শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, বরং পুরো এলাকার মানুষের জন্য একটি আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ এখন প্রশ্ন তুলছে আইন কোথায়? নিরাপত্তা কোথায়? একজন সাধারণ মানুষ কি আদৌ নিরাপদ?

অভিযুক্ত নাসিরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি স্পষ্ট কোনো জবাব দেননি। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, এই ঘটনা একটি বড় সামাজিক ও আইনি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং বিচারহীনতার আশঙ্কা।

এখন সবার দৃষ্টি তদন্তের দিকে। সত্য উদঘাটন হবে কিনা, দোষীরা শাস্তি পাবে কিনা তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, এই ঘটনা সহজে মানুষের মন থেকে মুছে যাবে না। নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক স্থায়ী একজন ব্যবসায়ী বলেন শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর নাসিরের ক্ষমতা আকাশছোঁয়া তার কথাই পতেঙ্গা এলাকায় রাইত হয় তার কথাই দিন হয়। তাছাড়া তার অপকর্মের শেষ নেই,পতেঙ্গা থানা পুলিশ নাসিরের পকেটে থাকে সবসময়। সাগরকুলে ঘষে কয়েকটা রেস্টুরেন্ট রয়েছে খাবারদাবার সবকিছুই প্রশাসনের জন্য ফ্রি। এলাকাবাসীর প্রশ্ন নাসিরের তো লেখাপড়া তেমন নেই তাহলে সে কৃষক দলের আহ্বায়ক পথপদবী পায় কি করে?কোন মহলের পকেট ভারি করে এই পথ পদবী পায় সে। অতীতেও বেশ কিছু অনলাইন পোর্টাল এবং পত্র-পত্রিকায় তার একাধিক অপকর্ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলেও নাসির নীরব ভূমিকা পালন করেন। নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক আরেকজন দোকান কর্মচারী বলেন এই নাসিরের পকেটে শুধু পতেঙ্গা থানা পুলিশই নয়, কিছু ভুয়া সাংবাদিক আছে নাসিরের ছত্রছায়ায়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button