সিএমপির ‘আশীর্বাদপুষ্ট সিন্ডিকেট: বদলি আদেশ যাদের কাছে কেবলই কাগজ

রাশেদুল ইসলাম: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও প্রশাসনে এখনও রয়ে গেছেন বিগত আওয়ামী সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট অনেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা। তাঁদেরই একজন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া। অভিযোগ উঠেছে, ‘শেখ হাসিনার মাই ম্যান’ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা সুপারনিউমারারি পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়ার পর এখন বদলি আদেশকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। একই চিত্র দেখা গেছে সাব-ইন্সপেক্টর মানিকের ক্ষেত্রেও। সাবেক সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজের বিশেষ অনুগ্রহ আর অনৈতিক লেনদেনের এই চক্র নিয়ে আমাদের একটি বিশেষ প্রতিবেদন।
প্রশাসনের বিতর্কিত ‘সুপারনিউমারারি’ পদোন্নতি। ২০২৩ সালের ৬ নভেম্বর একযোগে ১৪০ জন কর্মকর্তাকে এই বিশেষ সুবিধায় অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেয় তৎকালীন আওয়ামী সরকার। সেই তালিকার ৩৭ নম্বরে ছিলেন হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া। আওয়ামী সরকারের আমলে বিশেষ সুবিধাভোগী ও বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতেই এই কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে কবির ভূঁইয়াকে সিএমপি থেকে বদলি করে হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার হিসেবে পদায়ন করা হয়। আদেশে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, জনস্বার্থে জারিকৃত এই বদলি অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে। কিন্তু প্রজ্ঞাপন জারির প্রায় ৫ মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি।
পিআইএমএস (PIMS) ডাটাবেজের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বদলি আদেশ থাকা অবস্থাতেই ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর তিনি রহস্যজনকভাবে পুনরায় সিএমপির একই পদে যোগদান দেখিয়েছেন। ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত তিনি সিএমপির দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবেই বহাল তবিয়তে আছেন।
তবে কেন এই অবাধ্যতা? সূত্র বলছে, সিএমপির সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজের প্রত্যক্ষ আশীর্বাদে কবির ভূঁইয়া গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আঁকড়ে আছেন। এমনকি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের কাছে কবিরের ‘গুরুত্ব’ তুলে ধরে তাঁর বদলি আদেশ প্রত্যাহার করার জন্য তদবির করে চিঠিও দিয়েছিলেন হাসিব আজিজ। এই সখ্যতার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও অন্ধকার অধ্যায়। অভিযোগ উঠেছে, কমিশনার হাসিব আজিজকে অনৈতিকভাবে নারী সরবরাহ করে নিজের প্রভাব বজায় রাখতেন কবির ভূঁইয়া। যার প্রমাণ হিসেবে হাসিব আজিজের বিদায়ের পরপরই এক নারীর সাথে কবির ভূঁইয়ার একটি কল রেকর্ড ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঘটনা এখন পুলিশ মহলে টক অফ দ্য টাউন।
এই অনিয়মের সিন্ডিকেট কেবল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সিএমপির উত্তর বিভাগে কর্মরত সাব-ইন্সপেক্টর মানিক চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধেও উঠেছে একই ধরনের অভিযোগ। ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট হাসিব আজিজ স্বাক্ষরিত এক আদেশে মানিককে দক্ষিণ বিভাগে বদলি করা হলেও, তিনি অদৃশ্য এক শক্তিতে এখনও একই কর্মস্থলে রয়ে গেছেন। মাঠ পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি বদলির বিনিময়ে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন করেন এই মানিক।

২৪তম বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তা কবির ভূঁইয়া থেকে শুরু করে এসআই মানিক—সিএমপির এই চক্রটি প্রশাসনের চেইন অফ কমান্ডকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আওয়ামী লীগের আমলে সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগের পাশাপাশি নৈতিক স্খলন আর বদলি বাণিজ্যের এসব অভিযোগ এখন ওপেন সিক্রেট।
জনস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ আর রাজনৈতিক প্রভাব যখন প্রশাসনে বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কবির ভূঁইয়া ও মানিকের মতো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।



