অপরাধদুর্নীতি

ভুয়া “প্রাচীন পিলার-কয়েন” ২য় পর্ব, কৃষকলীগ নেতা মাকসুদ-সোহেল সিন্ডিকেটের শত কোটি টাকা প্রতারণা

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে বহুমুখী প্রতারণার এক বিস্তৃত নেটওয়ার্কের অভিযোগ উঠেছে, যার সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে কৃষক লীগসংশ্লিষ্ট নেতা মাকসুদুল ইসলাম ও মাজারুল ইসলাম সোহেলকে। মাকসুদ ঢাকা মহানগর উত্তর কৃষকলীগের সভাপতি আর সোহেল ঢাকা মহানগর উত্তর কৃষকলীগের সহ-সভাপতি। ভুয়া “প্রাচীন পিলার ও কয়েন” বিক্রির নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং পৃথকভাবে জমি জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পত্তি আত্মসাত-এই দুই ধারার অভিযোগে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের চিত্র।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সোহেলের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে “প্রাচীন নিদর্শন” বিক্রির নামে প্রতারণা চালিয়ে আসছে। তারা সাধারণ ধাতব বস্তু, পাথর বা সিলিন্ডার আকৃতির জিনিসকে কৃত্রিমভাবে পুরোনো করে তুলে তা “দুর্লভ ঐতিহাসিক সম্পদ” হিসেবে উপস্থাপন করত। প্যাটিনা, দাগ এবং বিশেষ কৌশলের মাধ্যমে এসব বস্তুতে প্রাচীনত্বের ছাপ দেওয়া হতো।

চক্রটি সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের টার্গেট করে ফাইভস্টার হোটেলের লাউঞ্জ, কনফারেন্স রুম কিংবা রেস্টুরেন্টে ব্যক্তিগত প্রদর্শনীর আয়োজন করত। বিলাসবহুল পরিবেশ, প্রেজেন্টেশন এবং নিজেদের “বিশেষজ্ঞ” পরিচয় দিয়ে তারা ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করত। এরপর “গোপন বিনিয়োগ সুযোগ” দেখিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন সম্পন্ন করা হতো।

অভিযোগ অনুযায়ী, এই চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যে উঠে এসেছে-

প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান ডা. এস বি ইকবালের কাছ থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

ডজলেন গ্রুপের আরিফ সাহেবের কাছ থেকে প্রায় ১৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি।

সিবিএম গ্রুপের জয়নাল ওরফে জামান সাহেবের কাছ থেকে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, তালিকাটি এখানেই শেষ নয়—আরও বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে, যার পরিমাণ আরও বড় হতে পারে।

লেনদেনের পর অনেক সময় প্রতারকেরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিত বা ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে সময়ক্ষেপণ করত। পরবর্তীতে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় তথাকথিত “প্রাচীন” বস্তুগুলো ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক ভুক্তভোগী।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। প্রাথমিক হিসেবে শতাধিক ব্যক্তি এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, পৃথক একটি মামলায় কৃষক লীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মাকসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে জমি জালিয়াতির অভিযোগে আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়েছে। মিরপুরের বাউনিয়া এলাকায় এক ব্যক্তির জমি জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে তা নামঞ্জুর করা হয়।

এই মামলার তদন্ত করেছে সিআইডি। তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হলে বিচারক মাকসুদুল ইসলামসহ চারজনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আর্থিক প্রতারণা ও সম্পত্তি জালিয়াতির এই দুই ধরনের অভিযোগ একই নেটওয়ার্ক বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকতে পারে। যদিও বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন, তবুও ভুক্তভোগীদের দাবি-এটি একটি সুসংগঠিত চক্র, যারা বিভিন্ন কৌশলে মানুষের অর্থ ও সম্পদ আত্মসাৎ করছে।

ভুক্তভোগীরা ইতোমধ্যে ব্যাংক লেনদেনের তথ্য, রশিদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথোপকথন, প্রদর্শিত বস্তু ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যসহ বিভিন্ন প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন।

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “প্রাচীন” দাবি করা যেকোনো বস্তু যাচাইয়ের জন্য বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা অপরিহার্য। শুধু বাহ্যিক চেহারা বা গল্পের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতারণা, জালিয়াতি ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের আওতায় পড়তে পারে। ভুক্তভোগীদের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি প্রমাণ সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সিন্ডিকেট কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, সমাজে আস্থার সংকটও তৈরি করছে। যথাযথ তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের প্রতারণা আরও বিস্তার লাভ করতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা সাধারণ মানুষকে যেকোনো “দুর্লভ” বা “গোপন বিনিয়োগ” প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং যাচাই ছাড়া বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ না করার পরামর্শ দিয়েছেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button