
বিশেষ প্রতিনিধি : গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অভ্যন্তরে ঘটে যায় এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা, যা পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠানটির প্রেস শাখা থেকে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান সামগ্রী—যার মধ্যে ছিল কাগজ, ছাটপট্টি (প্রেসের অবশিষ্ট কাগজজাত উপকরণ), নতুন প্রিন্টিং প্লেটসহ বিভিন্ন দামি সরঞ্জাম—একটি ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন প্রেস ম্যানেজার মোহাম্মদ মহিউদ্দিন।
সন্দেহজনক ট্রাক ও দারোয়ানদের তৎপরতা
সেদিন সন্ধ্যার দিকে কুষ্টিয়া “ট ১১-২৬১২” নম্বরযুক্ত একটি ট্রাক ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রেস প্রাঙ্গণ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে গেটের দায়িত্বে থাকা দারোয়ানদের সন্দেহ হয়। নিয়ম অনুযায়ী, এত বড় পরিমাণ মালামাল বাইরে নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমতি ও নথিপত্র থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ট্রাকটির চালক বা সংশ্লিষ্টরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হন।
পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতা বুঝতে পেরে দারোয়ানরা তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাকটি আটকে দেন এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।
মহাপরিচালক ও সচিবের হস্তক্ষেপ
ঘটনার খবর দ্রুতই পৌঁছে যায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের কাছে। তিনি বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে তাৎক্ষণিকভাবে সচিবকে অবহিত করেন। পরবর্তীতে সচিব প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা আনোয়ারুল হক গাজীকে ঘটনাস্থলে পাঠান, যাতে পরিস্থিতি সরেজমিনে যাচাই করা যায়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তিনি ট্রাকটি, মালামাল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে প্রাথমিক তদন্ত করেন বলে জানা গেছে। এ সময় উপস্থিত অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এটিকে ‘পরিকল্পিত মালামাল পাচারের চেষ্টা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তদবির ও রহস্যজনক সিদ্ধান্ত: তবে ঘটনার পরবর্তী ধাপটি আরও বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বিভিন্ন মাধ্যমে তদবির ও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা শুরু করেন। একপর্যায়ে উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিজের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা চালান।
অভিযোগ রয়েছে, এই তদবিরের চাপের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত সচিব ট্রাকটি ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিতে বাধ্য হন। ফলে আটক হওয়া ট্রাকটি কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা বা জব্দ প্রক্রিয়া ছাড়াই প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে যায়।
‘পুরস্কার’ হিসেবে বদলি? : ঘটনার এখানেই শেষ নয়। বরং এর পরবর্তী ঘটনাগুলো আরও উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যে দারোয়ানরা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ট্রাকটি আটক করেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অভিযোগ না থাকলেও পরবর্তীতে তাদের বিভিন্ন স্থানে বদলি করে দেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে অনেকেই এই বদলিকে ‘শাস্তিমূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, দুর্নীতি বা অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে এই কর্মচারীদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা অন্যদের জন্য একটি নেতিবাচক বার্তা বহন করে।
নীরবতা ও অস্বস্তি: ঘটনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ মুখ খুলতে না চাইলেও, ভেতরে ভেতরে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী মনে করছেন, এমন একটি গুরুতর ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতা না থাকলে প্রতিষ্ঠানটির শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা আরও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“যারা দায়িত্ব পালন করলো, তারাই শাস্তি পেল। আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠলো—এটা খুবই হতাশাজনক।”
প্রশ্ন রয়ে যায় :এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো—একটি রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এত বড় পরিসরে মালামাল সরানোর চেষ্টা কীভাবে ঘটলো? এবং কেন তাৎক্ষণিকভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হলো না?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে আরও বড় অনিয়মের পথ তৈরি হতে পারে।



