ইসলামের মূল ভিত্তি তাওহিদ: পরিচয়, গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা
ইসলামিক ডেস্ক: ইসলামি শরিয়তের প্রাণভোমরা এবং ঈমানের প্রধান শর্ত হলো তাওহিদ। তাওহিদ বলতে মূলত মহান আল্লাহ তায়ালাকে তাঁর প্রভুত্ব (রুবুবিয়্যাত), ইবাদত (উলুহিয়্যাত) এবং সুমহান নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে একক ও অদ্বিতীয় হিসেবে মনে-প্রাণে বিশ্বাস ও স্বীকার করাকে বোঝায়।
তাওহিদের তাৎপর্য ও গুরুত্ব
মানবজাতি ও জিন সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, “আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি” (সূরা যারিয়াত: ৫৬)। এটিই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রেরিত সকল নবী ও রাসূলের দাওয়াতের মূল কেন্দ্রবিন্দু। সূরা আম্বিয়ার ২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, তিনি এমন কোনো রাসূল পাঠাননি যাকে এই প্রত্যাদেশ দেওয়া হয়নি যে—আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই, সুতরাং কেবল তাঁরই ইবাদত করো।
তাওহিদের প্রকারভেদ
আলেমদের মতে, তাওহিদ প্রধানত তিন প্রকার:
১. তাওহিদুর রুবুবিয়্যাত: আল্লাহকে মহাবিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা, রিজিকদাতা, জীবন-মৃত্যুর মালিক এবং নিয়ন্ত্রক হিসেবে বিশ্বাস করা। আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ বা জমিন থেকে ফসল উৎপাদন—সবই তাঁর একক কর্তৃত্বাধীন।
২. তাওহিদুল উলুহিয়্যাত: ছোট-বড় সকল ইবাদত এবং আনুগত্য কেবল আল্লাহর জন্য নিবেদন করা। নামাজ, রোজা, দোয়া, মানত বা কুরবানি থেকে শুরু করে মনের গভীরের ভয় ও ভরসা—সবই হবে কেবলমাত্র তাঁর উদ্দেশ্যে।
৩. তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত: কুরআন ও সুন্নাহর বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহর সুন্দর নাম ও গুণাবলিকে কোনো প্রকার বিকৃতি, অস্বীকার বা সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা ছাড়াই সাব্যস্ত করা। যেমন—তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। সূরা শূরার ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়।”
তাওহিদের স্তম্ভ ও শিরক থেকে সতর্কতা
তাওহিদের মূল ভিত্তি দুটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রথমটি হলো ‘নাফি’ বা অস্বীকার করা (লা ইলাহা—নেই কোনো সত্য মাবুদ) এবং দ্বিতীয়টি হলো ‘ইসবাত’ বা সাব্যস্ত করা (ইল্লাল্লাহ—আল্লাহ ছাড়া)।
অন্যদিকে, তাওহিদের সম্পূর্ণ বিপরীত হলো শিরক, যা এই একত্ববাদকে বিনষ্ট করে। শিরকে আকবর বা বড় শিরক (যেমন—মাজারে মানত বা আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া) মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় এবং তওবা ছাড়া মৃত্যু হলে পরকালে চিরস্থায়ী জাহান্নাম অবধারিত করে। শিরকে আসগর বা ছোট শিরক (যেমন—লোকদেখানো ইবাদত বা তাবিজ-কবজ ব্যবহার) ইসলাম থেকে বের না করলেও এটি তাওহিদকে ক্ষুণ্ণ করে এবং আমলকে নষ্ট করে দেয়।
তাওহিদের সুফল
তাওহিদের ওপর অটল থাকার নানাবিধ উপকারিতা রয়েছে। এটি আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জনের সহজ পথ। বুখারি শরিফের হাদিস অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শাফায়াত লাভের জন্য তাওহিদে একনিষ্ঠ হওয়া প্রধান শর্ত। সহিহ মুসলিমের বর্ণনা মতে, যে ব্যক্তি এই বিশ্বাস নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে যে—আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাওহিদ কেবল মানুষের গোনাহই মোচন করে না, বরং দনিয়া ও আখেরাতে চূড়ান্ত সাফল্যের দ্বার উন্মোচন করে।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে একনিষ্ঠভাবে তাওহিদ চর্চার তাওফিক দিন এবং শিরকের অন্ধকার থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
– আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি



