হজের সক্ষমতা: কেবল অর্থ নয়, প্রয়োজন শারীরিক ও মানসিক পূর্ণ প্রস্তুতি
বিল্লাল বিন কাশেম: ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো হজ। তবে এই ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে ইসলাম ‘সামর্থ্য’ বা সক্ষমতাকে প্রধান শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে বাংলাদেশের হজযাত্রীদের জন্য এই সক্ষমতার বিষয়টি কেবল আর্থিক সংগতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর সঙ্গে শারীরিক সুস্থতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আমাদের দেশে সাধারণত মানুষ সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে শেষ বয়সে হজে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। ধর্মীয় অনুরাগের জায়গা থেকে এটি ইতিবাচক হলেও, হজের শারীরিক পরিশ্রমের দিকটি বিবেচনায় নিলে তা বেশ চ্যালেঞ্জিং। সৌদি আরবের তীব্র দাবদাহ, জনসমুদ্রের চাপ এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলা হজের নিয়মাবলি পালনে যে শারীরিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তা অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। ইসলাম ধর্ম কখনোই মানুষের ওপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেয় না। তাই অর্থবিত্তের পাশাপাশি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়াও হজের জন্য একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত।
শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি মানসিক প্রস্তুতির গুরুত্বও অপরিসীম। হজের প্রতিটি ধাপে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরীক্ষা দিতে হয়। প্রতিকূল আবহাওয়া, আবাসন বা যাতায়াত ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে বিচলিত না হয়ে শান্ত থাকা হজের অন্যতম শিক্ষা। যারা মানসিকভাবে প্রস্তুত নন, তারা অনেক সময় তুচ্ছ কারণে মেজাজ হারিয়ে ফেলেন, যা হজের আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যকে ম্লান করে দেয়। হজ আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থার শিক্ষা দেয়।
পারিবারিক সক্ষমতা বা দায়িত্ববোধের বিষয়টিও এখানে বিশেষ বিবেচ্য। পরিবার ও নির্ভরশীলদের মৌলিক প্রয়োজন অপূর্ণ রেখে বা তাদের আর্থিক সংকটে ফেলে হজে যাওয়া ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নিজের ওপর অর্পিত পারিবারিক দায়িত্বসমূহ যথাযথভাবে পালন করার পর উদ্বৃত্ত সামর্থ্য থাকলেই কেবল হজের বিধান কার্যকর হয়।
বর্তমানে হজের উচ্চমূল্য একটি বড় বাস্তবতা। বিমান ভাড়া ও আনুষঙ্গিক সেবামূল্য বৃদ্ধির কারণে এটি এখন একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে সক্ষমতার শর্তটি আরও নিবিড়ভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। মনে রাখতে হবে, হজ কোনো প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট ইবাদত যা সামর্থ্যবানদের জন্যই নির্ধারিত।
আমাদের দেশে তরুণ বয়সে হজ করার প্রবণতা তুলনামূলক কম। অথচ শারীরিক শক্তি ও ধৈর্য বেশি থাকার কারণে যুবকদের জন্য হজের কষ্টগুলো সহ্য করা সহজতর হয়। বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশে অপেক্ষাকৃত কম বয়সে হজ পালনের রেওয়াজ রয়েছে, যা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।
হজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবিক আচরণ। অনেক হজযাত্রী গাইড বা সেবাকর্মীদের সঙ্গে রুক্ষ আচরণ করেন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। হজ আমাদের বিনয়ী হতে শেখায়। গাইডরা হজযাত্রীদের সহায়তাকারী, তারা ব্যক্তিগত ভৃত্য নন। তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও সহানুভূতি প্রদর্শন করা ঈমানি দায়িত্ব।
এক্ষেত্রে হজ-পূর্ব প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে হজযাত্রীদের কেবল নিয়ম-কানুনই নয়, বরং আচরণগত শিক্ষা ও ধৈর্যের গুরুত্ব সম্পর্কেও সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি, রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব হলো হজের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং হজযাত্রীরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা।
পরিশেষে বলা যায়, হজ কেবল একটি পবিত্র সফর নয়, এটি আত্মশুদ্ধির এক মহাযাত্রা। শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক ও আর্থিক সক্ষমতার সঠিক সমন্বয়েই একজন হাজী তার ইবাদতকে পূর্ণতা দিতে পারেন। বিনয়, ধৈর্য ও ত্যাগের এই মহান শিক্ষা ধারণ করে হজের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা আজ সময়ের দাবি।
লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন।



