অনুসন্ধানস্বাস্থ্য

ওষুধের বাজারে লেবেলিং জালিয়াতি, জীবনঝুঁকিতে সাধারণ মানুষ

​এম এ মান্নান: দেশের ওষুধের বাজারে জেঁকে বসেছে এক ভয়াবহ ও মরণঘাতী জালিয়াতি চক্র। জীবন রক্ষাকারী ওষুধের কৃত্রিম সংকটকে পুঁজি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা কম দামি ওষুধের গায়ে নামি ও দামি ওষুধের লেবেল লাগিয়ে বাজারে ছেড়ে দিচ্ছে। এই ভয়াবহ ‘লেবেলিং জালিয়াতির’ কারণে সাধারণ মানুষ যেমন আর্থিকভাবে প্রতারিত হচ্ছে, তেমনি ভুল ওষুধের প্রভাবে বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকি।

ভয়াবহ জালিয়াতি: ডায়াজিপাম হচ্ছে নেলবুফিন
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে ব্যথানাশক ইনজেকশন ‘নেলবুফিন’ (Nalbuphine)-এর তীব্র সংকট চলছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র মাত্র ৩-৪ টাকা মূল্যের ‘ডায়াজিপাম’ (Diazepam) অ্যাম্পুলের গায়ের লেবেল পরিবর্তন করে তাতে নেলবুফিনের লেবেল লাগিয়ে দিচ্ছে। বাজারে নেলবুফিন না থাকায় নিরুপায় রোগীরা এই নকল ও জাল ওষুধই ২০০ থেকে ৪০০ টাকায় কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। চিকিৎসকদের মতে, ব্যথানাশক হিসেবে ভুলবশত ঘুমের ওষুধ (ডায়াজিপাম) শরীরে প্রবেশ করায় রোগীর স্নায়ুতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতিসহ মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

জীবন রক্ষাকারী ওষুধের কৃত্রিম সংকট
বাজারে শুধু নেলবুফিন নয়, প্রসবকালীন মায়েদের রক্তক্ষরণ বন্ধের অতি জরুরি ওষুধ ‘মেথারস্প্যান’ (Metharspan) গত দুই বছর ধরে প্রায় নিখোঁজ। জীবন রক্ষাকারী এসব ওষুধের সংকট মেটাতে কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ও চিকিৎসকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, “বাজারে মনিটরিং ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। একজন চিকিৎসক যখন প্রেসক্রিপশন লিখছেন, তিনি জানেন না ওষুধের শিশির ভেতরে আসলে কী আছে। ভুল লেবেলিংয়ের কারণে রোগীর মৃত্যু হলে এই দায়ভার কে নেবে?”

অতীতের আতঙ্ক ও বর্তমান বাস্তবতা
সম্প্রতি ভেজাল ‘হ্যালোথেন’ (Halothane) ব্যবহারের ফলে সুন্নতে খাতনা করাতে গিয়ে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বর্তমান লেবেলিং জালিয়াতি সেই আতঙ্ককে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সামান্য কয়েকশ টাকার মুনাফার লোভে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এই সংকটের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
১. ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) মাঠ পর্যায়ের তদারকির চরম অভাব।
২. আমদানিকৃত বা বিশেষায়িত ওষুধের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা।
৩. ভেজাল ওষুধ চক্রের হোতাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব।

জনসাধারণের জন্য সতর্কতা
এমন পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বিশেষজ্ঞরা জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন। যেকোনো ইনজেকশন বা জরুরি ওষুধ কেনার সময় অবশ্যই অনুমোদিত ও বিশ্বস্ত ফার্মেসি থেকে কেনা উচিত। এছাড়া কেনার সময় ওষুধের ব্যাচ নম্বর, এক্সপায়ারি ডেট এবং লেবেলের গুণগত মান ভালোভাবে যাচাই করে নিতে হবে। কোনো ওষুধ বা ফার্মেসি নিয়ে সন্দেহ হলে দ্রুত স্থানীয় প্রশাসন বা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে অবহিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এখনই এই ‘ওষুধ সন্ত্রাস’ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়বে। অবিলম্বে বাজার মনিটরিং জোরদার এবং জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ নাগরিকরা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button