দুর্নীতিনোয়াখালী

নোয়াখালীর রাম বল্লভপুর স্কুলে প্রধান শিক্ষকের বেপরোয়া দুর্নীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২ নং দাদপুর ইউনিয়নের হাকিমপুর গ্রামে অবস্থিত রামবল্লভপুর উচ্চ বিদ্যালয় অত্র এলাকার অন্যতম প্রাচীন একটি বিদ্যাপীঠ। তবে গত এক যুগ ধরে একটি দুর্নীতিবাজ চক্রের কবলে পড়ে বিদ্যালয়টির উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ নজিরবিহীনভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি গত কয়েক বছরে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিগত সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ-ত্রিগুণ পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। নিজেদের ফ্যাসিস্ট সরকারের অন্যতম সমর্থক দাবি করে এই চক্রটি বিদ্যালয় থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা লুটে নিয়েছে। সূত্রমতে, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ বাণিজ্য, পুরাতন সামগ্রী বিক্রি, এসএসসি ফরম পূরণ এবং ভর্তি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

সর্বশেষ অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক মোঃ আবুল কাশেম এই চক্রের সাথে যোগসাজশ করে সোনালী ব্যাংক মাইজদী কোর্ট শাখা থেকে বিদ্যালয়ের গচ্ছিত আমানত ১,৮২,৭১৬ টাকা অবৈধভাবে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন। এই টাকাটি ছিল বিদ্যালয়ের ফিক্সড ডিপোজিট বা এফডিআর (হিসাব নং ৩৮১৮২৫৫০০৪০১৬)। গত ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর তিনি জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে এই টাকাটি উত্তোলন করেন। বিদ্যালয়ের এফডিআরের টাকা প্রধান শিক্ষক একা তুলতে পারেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সাংবাদিকদের জানান যে, এটি সম্ভব নয়; ম্যানেজিং কমিটির সভা ও রেজুলেশনের ভিত্তিতেই কেবল তা তোলা সম্ভব।

এই বিষয়ে গত ২২/০৪/২০২৬ তারিখে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর হোসেনের মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, “উক্ত টাকা সাধারণত সভাপতি ও সম্পাদকের যৌথ স্বাক্ষরে জমা রাখতে হয় এবং উত্তোলনের সময়ও ম্যানেজিং কমিটির রেজুলেশনসহ যৌথ স্বাক্ষরের প্রয়োজন পড়ে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সরকারি টাকা হিসেবে এটি এভাবে উত্তোলনের কোনো বিধান নেই এবং প্রধান শিক্ষক কীভাবে এটি করলেন তা তদন্তের বিষয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিতর্কিত প্রধান শিক্ষক মোঃ আবুল কাশেম এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এই বিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন। তার নিজের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মতিন এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শামীমা জাহান লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষের বিনিময়ে কাশেমকে লিখিত পরীক্ষায় ফেল করা সত্ত্বেও পাস দেখিয়ে নিয়োগ দেন। সে সময় অন্য প্রার্থীরা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি।

প্রধান শিক্ষক হিসেবে আবুল কাশেম যোগদানের পর থেকেই বিদ্যালয়টি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়। ২০২২ সালে চতুর্থ শ্রেণির ৩ জন কর্মচারী এবং একজন কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম হয়। নাইটগার্ড মাহফুজুর রহমান, আয়া আসমা বেগম, নিরাপত্তা প্রহরী মোঃ সোলাইমান এবং কম্পিউটার অপারেটর নুর ইসলাম রনি—এই চারজনের নিয়োগ থেকে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আবদুল মতিন, প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা অফিসার শামীমা জাহান মিলে প্রায় ১৬-১৭ লক্ষ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন বলে বঞ্চিত প্রার্থীরা অভিযোগ করেন।

বিদ্যালয়ের আরেক খণ্ডকালীন শিক্ষক শিপন করের বিরুদ্ধে চারিত্রিক স্খলন ও জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে, আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সভাপতি আবু নাসের ভূঁইয়া যোগ্যতা ছাড়াই তাকে নিয়োগ দেন এবং কোচিং বাণিজ্যের অবৈধ সুযোগ করে দেন। এই শিপন কর ছাত্রীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, যার প্রতিবাদে এলাকাবাসী এক সময় বিক্ষোভ মিছিলও করেছিলেন। তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ নুরুজ্জামান তদন্তে সত্যতা পেয়ে ২০০৮ সালে ১০ নং রেজুলেশনের মাধ্যমে শিপন করকে বিদ্যালয় থেকে চিরতরে বহিষ্কার করেন। কিন্তু ২০১১ সালে সভাপতি আবদুল মতিন ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মনজুর মোর্শেদ বাবুল শিক্ষা অফিসার শামীমা জাহানকে ম্যানেজ করে রেজুলেশন বুক থেকে ঐ বহিষ্কারাদেশ গায়েব করে দেন এবং শিপন করকে পুনরায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। দলীয় প্রভাব ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এজেন্টের দোহাই দিয়ে এই নিয়োগ কার্যকর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

আওয়ামী লীগের নেতা ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি

২০১২ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে আবুল কাশেমের স্থায়ী নিয়োগের পর অনিয়ম ও দুর্নীতির মাত্রা আরও বেড়ে যায়। ক্লাসে পাঠদান বন্ধ করে বিদ্যালয়ের ভেতরেই প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্যের হাট বসানো হয়। এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রে নকল সরবরাহের আশ্বাসে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে শিপন কর ও প্রহ্লাদ বাবুর বিরুদ্ধে। এমনকি শিপন কর একবার নকলসহ ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে ধরা পড়লেও রাজনৈতিক প্রভাবে মুক্তি পান। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি আমলেও শিপন করের দাপট অব্যাহত রয়েছে। তার বয়স হলেও বিয়ে না করায় স্থানীয়দের মধ্যে তাকে নিয়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে।

আর্থিক দুর্নীতির আরও চিত্র পাওয়া যায় বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ ও সংস্কার কাজে। প্রধান শিক্ষক ও তার সিন্ডিকেট পুরাতন ভবন মেরামতের নামে ব্যাংক থেকে ২২ লক্ষ টাকা উত্তোলন করে মাত্র ৮ লক্ষ টাকা ব্যয় করেন এবং বাকি ১৪ লক্ষ টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নেন। এছাড়াও বিদ্যালয়ের পুরাতন সরকারি বই বিক্রি করে ১ লক্ষ টাকা এবং ২০১৯ সালে পুরাতন সেমি-পাকা ভবন ভাঙার পর ইট, টিন ও কাঠ বিক্রির ২ লক্ষ টাকা প্রধান শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করেন। নতুন ভবন নির্মাণের সময় ভিত্তি খননের প্রায় ৩০০ পিকআপ মাটি প্রধান শিক্ষক নিজের বাড়িতে নিয়ে কবরস্থান ভরাট ও রাস্তা তৈরির কাজে ব্যবহার করেন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩-৪ লক্ষ টাকা।

শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক ও আর্থিক চাপ তৈরির জন্য প্রতি বছর গাইড বই কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে মোটা অংকের কমিশন নিয়ে নির্দিষ্ট কোম্পানির বই কিনতে বাধ্য করা হয়। এসএসসি ফরম পূরণের সময় কৃত্রিমভাবে টেস্ট পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ফেল করিয়ে বোর্ডে এলাউ করার নামে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়। বিদ্যালয়ের ৪ তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণের সময় ঠিকাদারের নিম্নমানের কাজের ছাড়পত্র দেওয়ার বিনিময়েও প্রধান শিক্ষক ও সভাপতি লক্ষাধিক টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন।

পরিবর্তন করা ভূয়া শিক্ষা সনদ ও ঘুষের বিনিময়ে ভোটার আইডি

সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগও উঠেছে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও ম্যানেজিং কমিটি পরিকল্পিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ হিন্দু শিক্ষক নিয়োগ দেয়। ফলে হিন্দু শিক্ষকদের চাপে ৯০% মুসলিম শিক্ষার্থীর জন্য বরাদ্দকৃত নামাজের কক্ষটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে ছাত্র-ছাত্রীরা নামাজ আদায়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।

গত ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পূর্বে নিজেদের দুর্নীতি আড়াল করতে তারা একটি ভুয়া ম্যানেজিং কমিটি গঠন করেন। যেখানে তৃতীয় শ্রেণি পাস মোশাররফ হোসেনকে শিক্ষানুরাগী এবং মোজাম্মেল হোসেন সোহাগ মেম্বারকে দাতা সদস্য দেখানো হয়। এই কমিটি ৫ লক্ষ টাকা ঘুষের বিনিময়ে জনৈক মনির হোসেনের এনআইডি ও জন্ম তারিখ পরিবর্তন করে ‘মোঃ সোলাইমান’ নামে ভুয়া নিয়োগ প্রদান করে। প্রধান শিক্ষক নিজেই তাকে ৮ম শ্রেণি পাসের ভুয়া সনদ প্রদান করেন, যদিও সোলাইমান কখনো এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেনি।

এলাকাবাসীর দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যদি সুষ্ঠু তদন্ত করে এবং ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের অডিট করা হয়, তবে এই সিন্ডিকেটের সকল দুর্নীতির গোমর ফাঁস হবে এবং বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button