অনুসন্ধানচট্টগ্রামদুর্নীতি

আনোয়ারা ভূমি অফিসে হরিলুট, ১১৭০ টাকার নামজারিতে গুনতে হয় ১০ হাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নামজারি (মিউটেশন) কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা তিলক শীলের বিরুদ্ধে অফিসের ক্যাজুয়েল কর্মী নয়ন ও আইমনকে সঙ্গে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাগ্রহীতা। অভিযোগ রয়েছে, নামজারির ফাইলের প্রস্তাব পাঠাতে প্রতিটি ফাইলে সর্বনিম্ন ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। ঘুষ না দিলে দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখা হয়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী মাত্র ৭০ টাকার আবেদন ফি এবং ১১৭০ টাকার ডিসিআর ফি জমা দিয়ে নামজারির খতিয়ান পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে একজন আবেদনকারীকে বিভিন্ন ধাপে ১০ হাজার টাকারও বেশি খরচ করতে হচ্ছে।

প্রস্তাব পাঠানো, সার্ভেয়ার, কানুনগো, ডিসিআরসহ নানা অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সেবাগ্রহীতারা জানান, অনলাইনে আবেদন ও দলিলের স্ক্যান কপি জমা দেওয়ার পরও আবেদনকারীদের বারবার অফিসে ডেকে এনে অরিজিনাল দলিল দেখাতে বলা হয়। কাগজে সমস্যা আছে, ইত্যাদি নানা অজুহাতে ঘুরানো হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।

অভিযোগ রয়েছে, টাকা না দিলে ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়, আর ঘুষ দিলে একই দিনের ফাইল একই দিনেই প্রস্তাব আকারে পাঠানো হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী বলেন, আমরা নাম প্রকাশ করতে চাই না। কারণ নাম প্রকাশ করলে ভবিষ্যতে আমাদের কাজ হবে না। বাস্তবে ১১৭০ টাকার নামজারি কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা ছাড়া পাওয়া যায় না।

একজন সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করে বলেন, গত ২৩ তারিখে আমি বারখাইন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা তিলক শীলের কাছে দুইটি ফাইল জমা দিই এবং নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিই। এরপরও আরও বেশি টাকার জন্য ১৫ দিনেও আমার ফাইলের প্রস্তাব পাঠানো হয়নি।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রতিবেদক নিজেই গ্রাহক সেজে দুইটি ফাইল নিয়ে অফিসে গেলে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা তিলক শীল ফাইল ও টাকা ক্যাজুয়েল নয়নের কাছে বুঝিয়ে দিতে বলেন। পরে নয়নের কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, তিনি আলাদা রুমে বড় কর্মকর্তার মতো চেয়ার, টেবিল সাজিয়ে বসে আছেন।সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে আইমন নামের অপর এক ক্যাজুয়েল কম্পিউটার সংক্রান্ত কাজ পরিচালনা করেন বলে জানা গেছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, অফিসের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ যাচাই করলে পুরো ঘটনার সত্যতা বেরিয়ে আসবে। তাদের ভাষ্য, ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি হয় না।

স্থানীয়দের মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে, তিলক শীল, নয়ন ও আইমন দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের মালিক বনে গেছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি মাসে অন্তত ৫০টি নামজারির ফাইল প্রস্তাব আকারে পাঠানো হলে শুধুমাত্র সর্বনিম্ন ২ হাজার টাকা হিসাব করলেও মাসে প্রায় ১ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হতে পারে। প্রকৃত অঙ্ক আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বারখাইন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা তিলক শীলের কাছে সেবাগ্রহীতা হিসেবে ফাইল কেন পাঠাচ্ছেন না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বড় প্রস্তাব হলে একটু সময় লাগে এবং খরচ একটু বাড়তি লাগে। আরও কিছু খরচের টাকা এসে দিয়ে যান, আমি পাঠিয়ে দেব।

অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে ঘুষ গ্রহণের প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “তরু ভাই, আপনার কাজ হয়ে যাবে।

এ বিষয়ে আনোয়ারা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট দীপক ত্রিপুরা কে ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button