আইন-শৃঙ্খলাচট্টগ্রাম

বড় সাজ্জাদ-রায়হান চক্রে ডিবির হানা, অস্ত্র-গুলিসহ দুই সহযোগী আটক

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রাম মহানগরীতে আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠা শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি-উত্তর)। নগরজুড়ে চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, গুলি বর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী “বড় সাজ্জাদ” ও “রায়হান” বাহিনীর দুই অস্ত্রধারী সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এসময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ০২টি বিদেশি পিস্তল, ৩০ রাউন্ড তাজা গুলি ও শর্টগানের কার্তুজ।

সিএমপি সূত্রে জানা গেছে, সম্মানিত পুলিশ কমিশনারের কঠোর নির্দেশনায় নগরীর শীর্ষ সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী চক্র ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ডিবি (উত্তর) বিভাগের একটি চৌকস আভিযানিক টিম বৃহস্পতিবার (২২ মে ২০২৬) দিবাগত রাত আনুমানিক ১১টা ৩৫ মিনিটে চান্দগাঁও থানাধীন পুরাতন চান্দগাঁও এলাকার পাঠানিয়া গোদা গোলাম আলী নাজির সড়কে অবস্থিত জাকির হোসেন কন্ট্রাক্টরের ভাড়া বাসায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযানে গ্রেফতার করা হয় রাউজান উপজেলার আধার মানিক এলাকার বাসিন্দা মোজাম্মেল হকের ছেলে মোঃ শুভ (২২) এবং কদলপুর শমসের পাড়ার মৃত বাচা মিয়ার ছেলে মোঃ সুমনকে (৩৩)। পুলিশ বলছে, দীর্ঘদিন ধরে তারা চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ ও রায়হানের হয়ে অস্ত্র বহন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছিল।

ডিবি কর্মকর্তারা জানান, অভিযানের শুরুতেই সন্দেহভাজনদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা নিজেদের কাছে অস্ত্র ও গুলি থাকার বিষয়টি স্বীকার করে। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও লোকজনের উপস্থিতিতে তাদের দেহ তল্লাশি চালানো হয়।

তল্লাশিকালে গ্রেফতারকৃত মোঃ শুভ (২২)-এর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি পিস্তল, যার স্লাইডের এক পাশে ইংরেজিতে “MADE IN USA” লেখা রয়েছে। এছাড়া তার কাছ থেকে ০৮ রাউন্ড তাজা গুলিভর্তি একটি ম্যাগাজিন এবং ১৫ রাউন্ড শর্টগানের তাজা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়।

অপরদিকে গ্রেফতারকৃত মোঃ সুমন (৩৩)-এর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় আরও একটি বিদেশি পিস্তল। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রটির এক পাশে “MADE IN USA” এবং অপর পাশে “CHINA” লেখা রয়েছে। এছাড়া তার কাছ থেকে ০৭ রাউন্ড তাজা গুলিভর্তি একটি ম্যাগাজিন এবং একটি খালি ম্যাগাজিন জব্দ করা হয়।

ডিবি পুলিশের দাবি, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সেগুলো বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের প্রস্তুতি চলছিল। গ্রেফতারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, তারা শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ ও রায়হানের নির্দেশে চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, হামলা এবং প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের কাজ করত।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের চন্দনপুরা এলাকায় চাঁদার দাবিতে স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান এবং চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়িতে একাধিকবার গুলি বর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ওই ঘটনায় নগরজুড়ে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল এবং ব্যবসায়ী মহলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

শুধু তাই নয়, বায়েজীদ বোস্তামী থানাধীন রৌফাবাদ এলাকায় বোনের বাসায় বেড়াতে আসা যুবক রাজুকে গুলি করে হত্যার ঘটনায়ও এই চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছে ডিবি পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, চট্টগ্রামে আধিপত্য বিস্তার এবং সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতেই এসব হত্যাকাণ্ড ও গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটানো হচ্ছিল।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বড় সাজ্জাদ ও রায়হান চক্র দীর্ঘদিন ধরে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্রের মহড়া, চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একাধিক মামলা রয়েছে। তবে বিভিন্ন সময় গা-ঢাকা দিয়ে থাকায় তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। ফলে তাদের সহযোগীদের গ্রেফতার করে পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার চেষ্টা করছে পুলিশ।

ডিবি কর্মকর্তারা আরও জানান, গ্রেফতারকৃত মোঃ শুভ ও মোঃ সুমনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের রাউজান থানায় পৃথক দুটি হত্যা মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

অভিযান সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, “চট্টগ্রাম মহানগরীতে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে ছাড় দেওয়া হবে না। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চলমান রয়েছে। যারা নগরীর শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্টের চেষ্টা করবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।”

এদিকে অস্ত্র ও গুলিসহ দুই সহযোগী গ্রেফতারের ঘটনায় নগরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ডিবি পুলিশের এই অভিযানকে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখছেন নগরবাসী।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে চান্দগাঁও থানায় অস্ত্র আইনে ও সংশ্লিষ্ট ধারায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পাশাপাশি তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ ও রায়হানসহ পুরো চক্রকে ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button