অপরাধচট্টগ্রাম

সাতকানিয়ায় ‘ভুয়া জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক: হত্যা, চাঁদাবাজি, প্রতারণা ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদের দীর্ঘ অভিযোগের তালিকা; প্রশাসনিক তদন্তের দাবি এলাকাবাসীর

চট্টগ্রামের দক্ষিণ জেলার সাতকানিয়া উপজেলায় “কমরু মাস্টার” নামে পরিচিত কামরুল ইসলামকে ঘিরে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে এলাকায় প্রভাব ধরে রাখা এই ব্যক্তি এখন নিজেকে “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যোদ্ধা” পরিচয়ে সরকারি স্বীকৃতি ও সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

অভিযোগ উঠেছে, ২০২৪ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও ভুয়া চিকিৎসা সনদ, সাজানো তথ্য, জাল মেডিকেল রিপোর্ট ও রাজনৈতিক তদবির ব্যবহার করে নিজেকে “আহত জুলাই যোদ্ধা” হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। প্রকৃত আন্দোলনকারীরা বলছেন, “যারা রাজপথে জীবনবাজি রেখে আন্দোলন করেছে, তাদের তালিকায় একজন বিতর্কিত ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া পুরো আন্দোলনের চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।”

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কামরুল ইসলাম ওরফে কমরু মাস্টার একসময় এলাকায় চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালী টাউট হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি নিজেকে সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, রাজনৈতিক সংগঠক, এমনকি কখনো ম্যাজিস্ট্রেট, আর্মি অফিসার কিংবা পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রতারণা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকের কাছ থেকে প্রভাব খাটিয়ে টাকা নেওয়া, মামলা ম্যানেজ করার আশ্বাস দেওয়া এবং প্রশাসনিক সংযোগের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজিরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কমরু মাস্টারের রাজনৈতিক অবস্থান বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করতেন। নিজেকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ঘনিষ্ঠজন দাবি করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সরকার পরিবর্তনের পর তিনি হঠাৎ করে নতুন রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেন এবং ধর্মভিত্তিক একটি রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে নিজেকে “জুলাই যোদ্ধা” পরিচয়ে সক্রিয় করেন। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, এটি মূলত রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার একটি কৌশল।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, জুলাই আন্দোলনের সময় তার ফেসবুক আইডি থেকে আন্দোলনবিরোধী বিভিন্ন পোস্ট দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সরকার পরিবর্তনের পর তিনি সেসব পোস্ট সম্পাদনা করে আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান দেখানোর চেষ্টা করেন। ফেসবুকের এডিট হিস্টোরি বিশ্লেষণে একাধিক পোস্টে পরবর্তীতে পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

এ নিয়ে আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন তরুণ বলেন, “যারা আন্দোলনের সময় আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, তারা এখন নিজেদের আন্দোলনের নেতা দাবি করছে। এটা শুধু দুঃখজনক নয়, বরং প্রকৃত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রতারণা।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্র ও আদালতের নথি অনুযায়ী, কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, প্রতারণা ও জালিয়াতিসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। সাতকানিয়া থানাসহ বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে বিচারাধীন একাধিক মামলা, জিডি ও অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

একটি আদালতে দায়ের করা জিডিতে উল্লেখ করা হয়, তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালানোয় তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্নভাবে হুমকি দেন। অভিযোগে বলা হয়, অনুসন্ধান কার্যক্রম বন্ধ না করলে হামলা, অপহরণ, প্রাণনাশ কিংবা মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

জিডিতে আরও উল্লেখ করা হয়, তিনি বিভিন্ন সময় ফোনে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অনুসন্ধান বন্ধের চাপ সৃষ্টি করেছেন। এতে অভিযোগকারীরা নিজেদের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও আদালতকে জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে কমরু মাস্টার নিজেকে “সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী” হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যাতায়াত করেন। তবে তিনি কোনো নিবন্ধিত গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত নন বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া সংগঠনের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে প্রশাসনিক দপ্তরে প্রবেশ এবং তদবির বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

চট্টগ্রামের কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিকের দাবি, বিভিন্ন সময় তিনি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতেন। কেউ সহযোগিতা না করলে তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানোরও অভিযোগ রয়েছে।

সাতকানিয়া ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের একাধিক সূত্র বলছে, কমরু মাস্টারের নেতৃত্বে একটি স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিভিন্ন সরকারি সহায়তা, ত্রাণ প্রকল্প ও সামাজিক সংগঠনের নামে অর্থ সংগ্রহ এবং কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।

তারা নিজেদের “জুলাই যোদ্ধা” ও “মানবাধিকার সংগঠন” পরিচয় দিলেও এসব সংগঠনের কোনো বৈধ নিবন্ধন নেই বলে স্থানীয়দের দাবি।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, “এই ধরনের ভুয়া সংগঠন ও ভুয়া যোদ্ধাদের কারণে প্রকৃত আন্দোলনকারীরা বঞ্চিত হচ্ছে। প্রশাসন যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনেক প্রতারক এই সুযোগ নেবে।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, কামরুল ইসলামের বিষয়ে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং তার দাখিল করা কাগজপত্র পুনরায় যাচাই করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার কথিত জুলাই যোদ্ধা স্বীকৃতি বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

তিনি বলেন, “ভুয়া তথ্য দিয়ে কেউ যদি সরকারি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে সেটা গুরুতর অপরাধ। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।”

জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন তরুণ জানান, আন্দোলনের সময় তারা হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অথচ এখন এমন কিছু ব্যক্তি সুবিধাভোগী তালিকায় নাম তুলতে চাইছেন, যারা আন্দোলনের সময় রাজপথে ছিলেন না।

তাদের ভাষায়, “একজন বিতর্কিত ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক প্রভাব ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে নিজেকে যোদ্ধা দাবি করতে পারে, তাহলে প্রকৃত আন্দোলনের ইতিহাসই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে।”

স্থানীয়দের দাবি, কামরুল ইসলামের সব ধরনের কাগজপত্র, মেডিকেল রিপোর্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে যেসব কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি তাকে সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

সচেতন মহলের মতে, এই ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; বরং এটি প্রশাসনিক দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও ভুয়া পরিচয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সুবিধা নেওয়ার একটি বড় উদাহরণ। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে পুরো ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button