শিরোনামহীন একটি কবিতা
বিল্লাল বিন কাশেম:
একটু তাড়াতাড়িই ঘুম ভেঙে গেল আজ।
যেন ঘুম আমাকে ছেড়ে চলে গেল
অভিমানী কোনো পুরোনো বন্ধুর মতো-
বলল,
“এতদিন পর ফিরে এসেছো,
ঘুমিয়ে সময় নষ্ট কোরো না,
দেখো, ভোর তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
আমি বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম।
আকাশ তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি,
এক ধরনের নীলচে অন্ধকার
চারপাশে ছড়িয়ে আছে-
যেন পৃথিবী ফজরের আগে
নিজেকে শেষবারের মতো নিরবতায় মুড়ে রাখে।
হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এলো
ফজরের আজানের সেই চিরচেনা পবিত্র ধ্বনি-
“আল্লাহু আকবার…”
কী আশ্চর্য!
একটি শব্দও কি মানুষের আত্মাকে
এত গভীরভাবে স্পর্শ করতে পারে?
মনে হলো
এই ধ্বনি কেবল মসজিদের মিনার থেকে নয়,
আমার শৈশবের উঠান থেকেও ভেসে আসছে,
আমার মৃত দিনগুলোর ভেতর থেকেও,
আমার হারিয়ে যাওয়া সকালগুলোর ভিতর থেকেও।
হৃদয়ের কোথাও
একটি নরম আলো নেমে এলো।
আমি নিঃশব্দে বললাম-
সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর।
একই ঘরে
আনার মা সুস্থ শরীরে ঘুমাচ্ছেন-
এ দৃশ্যের মধ্যে এমন এক শান্তি আছে
যা ভাষায় বলা যায় না।
একসময় আমরা ভাবতাম
প্রিয় মানুষরা বুঝি সবসময় থাকবে।
তারপর একদিন হঠাৎ দেখি
মানুষ হারিয়ে যায়,
চেয়ারে ধুলো জমে,
ঘরের কোণে নীরবতা জন্ম নেয়,
শুধু কিছু অভ্যাস
একা একা বেঁচে থাকে।
আজ তাই কারও নিঃশ্বাসের শব্দও
আমাকে কৃতজ্ঞ করে তোলে।
রাতের পোকামাকড়ের নিরবচ্ছিন্ন শব্দ-
অদ্ভুত!
এই শব্দ কি কখনো বদলায়?
সময়েরও কি কিছু কিছু জায়গায়
প্রবেশাধিকার নেই?
সেই একই ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক,
সেই একই রাতের শরীর,
সেই একই বাতাস-
যেন সতেরো বছর
আসলে কোথাও যায়নি,
শুধু আমার ভেতর দিয়ে হেঁটে গেছে।
আমি ভাবলাম-
সত্যিই কি এতদিন পরে ফিরলাম?
নাকি আমি কখনো এখান থেকে যাইনি?
কারণ কিছু জায়গা আছে
যেগুলো মানুষ ছেড়ে যায় না-
বরং সেগুলো মানুষের ভেতরে
স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে ফেলে।
এখানেই আমার জন্ম।
এখানেই প্রথম হাঁটা শেখা,
প্রথম পড়ে যাওয়া,
প্রথম বৃষ্টিতে ভেজা,
প্রথম আকাশ চিনে নেওয়া।
এই মাটির গন্ধ
আমার শরীরের ভেতরে লুকিয়ে আছে-
যেন রক্তেরও আগে
আমি এই মাটির সন্তান ছিলাম।
এখানকার মানুষেরা
আমাকে বড় করেছিলো
পানির মতো ভালোবাসায়।
যেমন পানি মাছকে ঘিরে রাখে
নিঃশর্ত, অদৃশ্য, নিরবচ্ছিন্ন—
তেমনি তারা আমাকে ঘিরে রেখেছিলো।
কেউ কখনো বলে দেয়নি
“আমরা তোমাকে ভালোবাসি”-
তবু বুঝেছি,
ভালোবাসা অনেক সময় উচ্চারণহীন হয়।
পুরোনো মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে
একবারও মনে হলো না
সময় বদলেছে।
তাদের কণ্ঠে সেই আগের স্নেহ,
চোখে সেই আগের মায়া,
হাসিতে সেই আগের গ্রামবাংলার সহজ সরল আলো।
এক বৃদ্ধ আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“কেমন আছো?”
সেই প্রশ্নে
আমি শুধু বর্তমান শুনিনি-
শুনেছি শৈশব, কৈশোর,
শুনেছি এক হারিয়ে যাওয়া পৃথিবী।
নতুন মানুষদের সঙ্গেও
কেমন যেন চিরচেনা আপন অনুভূতি।
মনে হলো
জন্মভূমি কাউকে অচেনা হতে দেয় না।
তুমি যত দূরেই যাও,
যত বছরই হারিয়ে ফেলো,
ফিরে এলে সে ঠিক চিনে নেয়-
মায়ের মতো।
তবু
দুজন প্রিয় মানুষের অভাব
বারবার এসে দাঁড়ালো।
বিষাদের তানপুরা
মাঝে মাঝে এমন সুর তোলে
যা কেবল হৃদয় শুনতে পায়।
কিছু নাম আছে
যেগুলো উচ্চারণ করলেই
আকাশ একটু ভারী হয়ে যায়।
কিছু মানুষ আছে
যারা চলে যাওয়ার পরও
বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে থেকে যায়,
চায়ের কাপের পাশে বসে থাকে,
পুরোনো গল্পের ভেতরে নিঃশব্দে হাঁটে।
আমি জানি
এই অভাব আর কোনোদিন পূরণ হবে না।
মানুষের জীবনে
কিছু শূন্যতা থাকে
যা পূরণ করার জন্য নয়-
শুধু সঙ্গে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য।
তবু এত কিছুর পরও
জন্মভূমি আমাকে কোলে তুলে নিলো।
যেন দীর্ঘ অভিমান শেষে
একজন মা তার সন্তানকে বুকে টেনে নেয়-
কোনো প্রশ্ন ছাড়াই,
কোনো অভিযোগ ছাড়াই।
অর্ধ শতাধিক বছরের ক্লান্ত মানুষটিকে
সে বলল-
“এসেছো?
দেখো, তোমার জন্য ভোর এখনও রেখে দিয়েছি।”
আমি দাঁড়িয়ে থাকি বারান্দায়।
আজানের ধ্বনি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।
আকাশে আলো বাড়ে।
হঠাৎ মনে হয়-
মানুষ আসলে কোথায় ফিরে যেতে চায়?
শহরে?
বাড়িতে?
নাকি সেই অনুভূতিতে
যেখানে তাকে নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করা হয়েছিলো?
ভোরের বাতাসে দাঁড়িয়ে
আমি শুধু এটুকু বুঝলাম-
পৃথিবীতে যত দূরেই যাওয়া হোক,
জন্মভূমি শেষ পর্যন্ত
একটি মায়ের অন্য নাম।
ইকবাল রোড, মোহাম্মদপুর
ঢাকা


