গদ্য সাহিত্য সান্ত্বনা ও প্রত্যুত্তর

আফসানা আরেফিন: আমার জীবন ও গবেষণার ক্যানভাসে কিছু ব্যক্তিগত অধ্যায় এমনভাবে জড়িয়ে আছে যা কেবল পুঁথিগত বিদ্যার ফ্রেমে বন্দি করা যায় না। সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি নিজের ভেতরের এক গভীর শূন্যতা নিয়ে আমি প্রতিদিন লড়াই করি। সেই শূন্যতাটি আমার আব্বার চলে যাওয়ার পরে আরো বিশালতা ধারণ করেছে।
একজন মেয়ের জীবনে পিতা শুধু একজন মানুষ নন তিনি এক চিরন্তন আশ্রয়। আব্বার আকস্মিক প্রস্থান আমার চেনা জগতটাকে এক নিমিষে বদলে দিয়েছে। আব্বার কথা অন্য লেখায় প্রকাশ করার ইচ্ছে আছে। তবে চারপাশের আলো আর উৎসব যখন আমার ভেতরের অদৃশ্য একাকীত্বকে আরও তীব্র করে তুলছিল ঠিক তখনই আমার স্বামী বিল্লাল বিন কাশেম আমার এই ব্যক্তিগত শোক ও কান্নার সারথি হতে চেয়েছে। দাম্পত্যের প্রথাগত সম্পর্কের বাইরে গিয়ে সে আমার শোককে গভীর মমতায় ধারণ করেছে। আমার আত্মকথনের পাতা থেকে উঠে আসা সেই পরম প্রাপ্তি, সান্ত্বনা এবং আশ্রয়ের কিছু খণ্ডচিত্র এখানে হুবহু তুলে ধরলাম যা আমার জীবনের এক অবিনশ্বর দলিল।
বিল্লাল লিখেছে প্রিয় আফসানা, আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। এই চিঠি যখন তোমার হাতে পৌঁছাবে, হয়তো সন্ধ্যা নেমে আসবে ধীরে ধীরে। জানালার বাইরে কোনো ক্লান্ত আলো গাছের পাতায় পড়ে থাকবে কিংবা তুমি হয়তো নিঃশব্দে বসে থাকবে তোমার নিজের ভেতরের এক অদৃশ্য শূন্যতার সঙ্গে। সেই শূন্যতার নাম— তোমার বাবা।
জানো আফসানা, পৃথিবীতে কিছু শোক আছে যার ভাষা হয় না। মানুষ কেবল তা বয়ে বেড়ায়। পিতাকে হারানোর বেদনা তেমনই এক গভীর নদী। বাইরে থেকে যার স্রোত বোঝা যায় না কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে কত পাথর ক্ষয় করে কত নিঃশব্দ কান্না বয়ে নেয় তা শুধু সেই মানুষই জানে যে হারিয়েছে।
আমি জানি, তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়ের মানুষ ছিলেন তোমার বাবা। একজন মেয়ের কাছে পিতা শুধু একজন মানুষ নন তিনি প্রথম নিরাপত্তা, প্রথম সাহস, প্রথম নির্ভরতা। পৃথিবী যখন অপরিচিত লাগে তখন মনে হয় একজন মানুষ আছেন যিনি সব ঠিক করে দেবেন। সেই মানুষটি হঠাৎ না থাকলে পৃথিবীটা কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যায়। আকাশ ঠিক আগের মতোই থাকে, মানুষও একই থাকে কিন্তু ভেতরের পৃথিবীটা বদলে যায়। আমি বুঝি হয়তো তুমি অনেক সময় চুপচাপ থাকো। সবাই ভাবে তুমি স্বাভাবিক হয়েছো। কিন্তু মানুষ কি কখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়? কিছু অভাব মানুষের রক্তে মিশে যায়। কোনো কোনো পারিবারিক আয়োজনে কিংবা হঠাৎ কোনো স্মৃতির ভেতর মানুষ ভেঙে পড়ে নিঃশব্দে। কেউ দেখে না কেউ বুঝেও না বোঝার ভান করে।
আফসানা, আমি একটা কথা আজ খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই আমি জানি আমি তোমার বাবার জায়গা কখনো নিতে পারব না। পৃথিবীতে পিতার স্থান কেউ নেয় না। কিন্তু আমি চেষ্টা করতে চাই তোমার একাকীত্বের পাশে একটা ছায়া হয়ে দাঁড়াতে। এমন একজন মানুষ হতে যার কাছে তুমি দুর্বল হতে পারবে, কাঁদতে পারবে, কোনো ভান ছাড়াই বলতে পারবে আজ খুব মন খারাপ। তুমি হয়তো মাঝে মাঝে ভাবো আমি তোমার পাশে থেকেও যেন পাশে নেই। এই দূরত্ব, এই না পারা, এই ব্যস্ততা এগুলো আমাকেও কষ্ট দেয়। বিশ্বাস করো একজন স্বামী যখন তার প্রিয় মানুষটির কষ্ট জানে অথচ ঠিকমতো পাশে থাকতে পারে না তার ভেতরেও এক ধরনের অপরাধবোধ জন্মায়। আমি হয়তো সবসময় তোমার হাত ধরে বসতে পারি না, তোমার চোখের জল মুছে দিতে পারি না কিংবা রাতে তোমার নীরবতার পাশে বসে থাকতে পারি না কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি তোমার কষ্ট অনুভব করি না। জীবনকে আমি একটি সরল রেখার মতো দেখি। এই রেখায় কেউ হঠাৎ আসে, কেউ নেমে যায়, কেউ মাঝপথে হারিয়ে যায়। কিছু সম্পর্ক খুব অল্প সময়ের, কিছু সম্পর্ক দায়িত্বের, কিছু সম্পর্ক কেবল সামাজিক নামের। কিন্তু কিছু মানুষ থাকে যাদের ছাড়া নিজের জীবনকে কল্পনা করাও কঠিন। তুমি আমার কাছে সেই রকম একজন মানুষ।
ভালোবাসা নিয়ে মানুষ বড় বড় কথা বলে। কেউ ফুল দেয়, কেউ প্রতিশ্রুতি দেয়, কেউ আকাশ ছুঁয়ে ফেলার গল্প বলে। আমি এত কিছু পারি না। আমি শুধু জানি দিনের শেষে আমার ক্লান্তি যদি কোথাও থামে সে তোমার কাছে। পৃথিবীর ভিড়ের মধ্যে যদি একজন মানুষের জন্য আমার হৃদয় আলাদা স্পন্দিত হয় সে তুমি। আমি তোমাকে ভালোবাসি এই কথাটা হয়তো খুব সাধারণ শোনায়। কিন্তু এই চারটি শব্দের ভেতরে কত ভয়, কত নির্ভরতা, কত না বলা আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে থাকে তা ভাষায় বোঝানো কঠিন।
আমি চাই তুমি তোমার দুঃখ একা বহন কোরো না। তুমি যখন তোমার বাবাকে খুব মনে করবে আমাকে বলবে। আমরা একসাথে তার কথা বলব। তুমি তার স্মৃতি নিয়ে কথা বলবে আমি শুনব। মানুষ চলে যায় কিন্তু স্মৃতিগুলোকে সুন্দরভাবে বাঁচিয়ে রাখলে তারা একেবারে হারিয়ে যায় না। জানো আমি মাঝে মাঝে ভাবি জীবনটা আসলে কত ছোট! কত অপ্রয়োজনীয় অভিমান, কত না বলা কথা, কত অযথা দূরত্ব নিয়ে আমরা দিন পার করি। অথচ একদিন হঠাৎ বুঝি সময় কারও জন্য থেমে থাকে না। যে মানুষটিকে আজ বলতে পারি ভালোবাসি কাল হয়তো সে দূরে চলে যাবে সময়ের নিয়মে। তাই আমি চাই না আমাদের মধ্যে কোনো অনুচ্চারিত দেয়াল থাকুক। আমি চাই তুমি জানো তোমার দুঃখে, তোমার নিঃসঙ্গতায়, তোমার ভয়ের ভেতরে একজন মানুষ আছে যে নিঃশব্দে তোমার জন্য দোয়া করে। তুমি হয়তো খুব শক্ত মনের মানুষ হয়ে গেছো। জীবন মানুষকে শক্ত হতে শেখায়। কিন্তু সবসময় শক্ত থাকতে হয় না। কখনো কখনো ক্লান্ত হওয়া যায়। কখনো কখনো মাথা রেখে কাঁদাও যায়। যদি পৃথিবী তোমাকে ক্লান্ত করে ফেলে তাহলে আমার কাছে এসো অন্তত কথায় কিংবা নীরবতায়। আমি জানি না ভবিষ্যৎ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে। কিন্তু এটুকু জানি আমি চাই যতদিন বাঁচি তুমি যেন কখনো নিজেকে একা না ভাবো। তোমার বাবার অনুপস্থিতি আমি পূরণ করতে পারব না কিন্তু তোমার জীবনের শূন্য বিকেলগুলোতে আমি আলো হতে চাই। তোমার দীর্ঘ নীরবতার মধ্যে একটা আশ্রয়ের শব্দ হতে চাই। তুমি যখন ভেঙে পড়বে আমি চাই তুমি মনে করো একজন মানুষ আছে যে আমাকে সত্যিই ভালোবাসে।আজ এই পর্যন্তই। নিজের যত্ন নিও। নামাজে আমাকে রেখো। আর যখন খুব মন খারাপ হবে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে কোরো পৃথিবীর কোথাও একজন মানুষ তোমার হাসির জন্য দোয়া করছে। ইতি তোমার প্রিয় স্বামী বিল্লাল।
বিল্লালের এই চিঠি আমার অন্ধকার একলা জীবনে এক অনন্য আলোর মতো। একজন লেখক হিসেবে নয় একজন মানুষ এবং এক অবাধ্য মেয়ে হিসেবে আমার ভেতরের কান্নাগুলো কেবল সে-ই দেখতে পেয়েছিল। আমার একাকীত্ব আর একগুঁয়েমির মাঝে সে তার নিখাদ ভালোবাসা দিয়ে যে ছায়া তৈরি করেছে তার জবাবে আমি আমার মনের গহীন থেকে এক আন্তরিক প্রতিত্তোর লিখেছি। যেখানে লুকিয়ে ছিল আমার আব্বার স্মৃতি ও বিল্লালের প্রতি আমার অন্তহীন ভালোবাসা। আমার সেই
প্রত্যুত্তরে ছিলো প্রিয় বিল্লাল, আসসালামু আলাইকুম। তোমার চিঠিটা যখন পড়ছিলাম তখন জানালার ওপাশে একটা একটা করে তারা ফুটছিল। শূন্যতা তো আসলে কোনো ফাঁকা জায়গা নয়। শূন্যতা মানে বিশালতা…। এখন রাত তিনটা বেজেছে। হোয়াটসঅ্যাপে কানেকটেড ওপারে তোমার ঘুমন্ত শরীর থেকে ঘন ঘন নিশ্বাসের শব্দ পাচ্ছি।
বিল্লাল, এক বিশাল নীরবতা যা আব্বার চলে যাওয়ার পর আমার ভেতর ঘর বেঁধেছে। কিন্তু তোমার শব্দগুলো সেই অন্ধকার শূন্য ঘরে এসে নীরবতা ভেঙে আমার কর্ণ ছুঁয়ে গেল। দর্শন বলে মানুষ একা আসে একা যায়। কিন্তু এই দুই একাকীত্বের মাঝে সৃষ্টিকর্তা কিছু মানুষকে পাঠান ছায়া হওয়ার জন্য। এখন তুমি আমার সেই ছায়া।
বিল্লাল, আমি তোমাকে ভালোবাসি শুধু এই জন্য নয় যে তুমি আমার স্বামী বরং এই জন্য যে তুমি আমার ভেতরের সেই মেয়েটিকে বোঝো যে আজও তার আব্বার আঙুল ধরে হাঁটতে চায়। যখন আমি জিদ ধরেছিলাম যে আমি আমার আব্বার কাছেই থেকে যাব তুমি কোনো পুরুষতান্ত্রিক অহংকার দেখাওনি বরং আমার সেই বায়না মেনে নিয়েছিলে। জানো স্মৃতির বারান্দায় দাঁড়ালে আজ কোথায় যেনো একটু স্বস্তি হয়। তুমি আর আব্বা দুজনেই ছিলে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কট্টর সমালোচক। আমার খামখেয়ালিপনা, স্বাধীন চেতনা আর ভুলত্রুটি নিয়ে তোমরা দুজন যখন একসঙ্গে বসতে মনে হতো পুরো পৃথিবী একজোট হয়েছে। কিন্তু সেই তীব্র সমালোচনার শেষে তোমরা দুজনেই একই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে মেয়েটা একটু রাগী, একটু জেদি কিন্তু মনটা তার বড্ড ভালো! একটু রাগ ছাড়া যে আমার বিষয়ে আর কোনো আপত্তি নেই এই সনদ তোমরা দুজনেই আমায় দিয়েছিলে। এ কারণেই তোমায় এত ভালোবাসি বিল্লাল। আব্বা জানতেন তার এই অবাধ্য মেয়েটাকে আগলে রাখার জন্য পৃথিবীতে একজন মানুষ প্রয়োজন। আব্বার সেই শাসনের সুর আজ তোমার মাঝে বেঁচে আছে। আমাদের ভালোবাসার শিকড়টা আসলে খুব গভীরে প্রোথিত কারণ আমাদের দুজনের সবচেয়ে বড় মিলটি হলো উভয়ের মা-বাবার প্রতি গভীর টান ও ভক্তি। যে মানুষ নিজের জন্মদাতাকে সম্মান করতে জানে সে কখনো অন্য কারো হৃদয় ভাঙতে পারে না। তোমার এই ভক্তিই আমাকে তোমার প্রতি প্রতিদিন নতুন করে অনুরাগী করে তোলে। আমার সবচেয়ে কঠিন সময়ে অর্থ দিয়ে, শ্রম দিয়ে, সময় আর এই সান্ত্বনার বাণী দিয়ে তুমি যেভাবে পাশে থাকলে আমিও সেভাবে পাশে থাকতে চাই ভালোবেসে। ইতি, তোমার আফসানা।
আমার জীবনের এই কঠিন মোড়ে শুধু যে আমার অতি কাছের মানুষই পাশে ছিল তা নয়। আমার চেনা পরিচিত জগৎ ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভেতর থেকেও সামাজিক ও মানবিক সান্ত্বনার এক ভিন্ন রূপ আমি দেখেছি। অনেকে এমন পরিস্থিতিতে কী বলতে হবে তা ভেবে পায় না এক ধরনের সংকোচ ও দ্বিধা কাজ করে তাদের ভেতর। কিন্তু সেই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মাঝেও যে এক অকৃত্রিম মায়া আর সহমর্মিতা লুকিয়ে থাকে তার একটি চিরন্তন প্রমাণ দ্বিতীয় সান্ত্বনাবার্তাটি। যা আমার জীবনের ডায়েরিতে আরও একটি স্মৃতির পাতা যোগ করেছে।
সেই সান্ত্বনার হুবহু এমনটা ছিলো। কেমন আছেন? শরীর কেমন? আন্টি কেমন আছেন? অনেক বার ভেবেছি আপনাকে কল করবো কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে আমি আসলে খুব পাজল্ড হয়ে যাই, কি বলবো কথা খুঁজে পাইনা। অনেক বার মনে হয়েছে আপনার খোঁজ নেই কিন্তু ফোন করে কি বলবো বুঝতে পারিনা। আসলে বাবা মা হারানোর যে লস তার জন্য তো পৃথিবীর কোন সান্ত্বনার ভাষা নেই। তবু আল্লাহর কাছে দোয়া করি আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য্য দিন ও আঙ্কেলকে বেহেশত নসিব করুন। দয়া করে নিজের ও আন্টির খেয়াল রাখবেন।
এই লৌকিক ও সামাজিক সান্ত্বনার সীমানা পেরিয়ে আমার মনের ভেতরের অবুঝ মেয়েটি তখন এক চিরন্তন নির্ভরতা খুঁজছিল। লৌকিকতার সমস্ত দেয়াল ভেঙে কোনো ভনিতা ছাড়াই তখন আমার অস্তিত্বের গভীরে যে সুতীব্র হাহাকার আর আকুলতা তৈরি হয়েছিল তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল একটি মাত্র সংক্ষিপ্ত কিন্তু সুগভীর বাক্যের মাধ্যমে। এটি ছিল কেবল একটি প্রতুত্তর নয় বরং আব্বার চলে যাওয়ার পর আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক আশ্রয় খোঁজার এক করুণ আকুতি।
প্রত্যুত্তরে লিখেছিলাম : ”If you can, please be like a father to me.”
সান্ত্বনা-৩ আবারো সাত সকালে বিল্লালের চিঠি। প্রিয় আফসানা, চিঠি লিখতে বসলে আজকাল আমার খুব ভয় লাগে। ভয় লাগে কারণ কোনো শব্দ হঠাৎ করে তোমার ভেতরের গোপন কান্নাকে ছুঁয়ে ফেলবে কিনা। মানুষ তো আর সবসময় চোখের জল ফেলে না। কেউ কেউ নদীর মতো কাঁদে ভেতরে, খুব নীরবে। বাইরে দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হয় সব স্বাভাবিক অথচ তলদেশে কত ভাঙন, কত মৃত শৈবাল জমে থাকে! এ্যানি তোমাকে আমি যখন দেখি মনে হয় তুমি এক অদ্ভুত আলো-আঁধারির মানুষ। বাইরে তুমি কঠিন—সিদ্ধান্তে দৃঢ়, কথায় সংযত, হাসিতে আত্মবিশ্বাসী। যেন পৃথিবীর কোনো ঝড় তোমাকে নড়াতে পারে না। কিন্তু মানুষের ভিতরেও তো আরেকটি মানুষ থাকে যে কাউকে দেখায় না তার পরাজয়, তার ভয়, তার একাকীত্ব। তোমার সেই ভেতরের মানুষটিকে আমি মাঝে মাঝে দেখতে পাই। সে ক্লান্ত! সে এক অদ্ভুত শূন্যতায় দাঁড়িয়ে আছে। কখনো মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত সাহস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির বুকের মধ্যে একটা ছোট্ট শিশু এখনও তার বাবাকে খুঁজে বেড়ায়।
তোমার বাবার চলে যাওয়ার গল্প আমি ভাবলে এখনও এক ধরনের অদ্ভুত নিস্তব্ধতা আমাকে গ্রাস করে। মৃত্যু আসলে কখনো কেবল একজন মানুষকে নিয়ে যায় না সঙ্গে করে নিয়ে যায় একটি সময়, একটি আশ্রয়, একটি নিশ্চয়তা। বাবারা বেঁচে থাকলে মানুষ যত বড়ই হোক কোথাও না কোথাও সে শিশু হয়ে থাকার অধিকার পায়। বাবা চলে গেলে হঠাৎ করেই পৃথিবীটা অন্যরকম হয়ে যায়। আকাশ একই থাকে, রাস্তাগুলোও বদলায় না, সকালের চায়ের স্বাদও হয়তো একই থাকে তবু মানুষ বুঝতে পারে তার মাথার ওপর থেকে এক বিশাল ছায়া সরে গেছে।
আমি জানি ২৭ মে সেই রাত তোমার জীবনের ভেতর এমনভাবে গেঁথে গেছে যেখান থেকে সহজে মুক্তি নেই। কিছু রাত থাকে যেগুলো কখনো ভোর হয় না। ক্যালেন্ডার বদলায়, ঋতু বদলায়, চারপাশের মানুষ স্বাভাবিক হয়ে যায় কিন্তু মানুষ নিজের ভেতরে আটকে থাকে সেই এক রাতের মধ্যে। তুমি হয়তো আজও মাঝরাতে হঠাৎ জেগে ওঠো মনে হয় সবটাই স্বপ্ন ছিল। মনে হয় দরজা খুললেই বাবা ডাকবেন “আফসানা, একটু পানি দে” কিংবা সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর ঘরের কোথাও ভেসে উঠবে। কিন্তু না, জীবন খুব নিষ্ঠুরভাবে মানুষকে শেখায় যাদের সবচেয়ে বেশি দরকার তারাই একসময় সবচেয়ে দূরে চলে যায়। আমি কল্পনা করি সেই মুহূর্তটি একজন মলিন, ক্লান্ত পিতা, জীবনের সমস্ত যুদ্ধ শেষ করে তোমার হাতের ওপর মাথা রেখে ধীরে ধীরে নিশ্বাস ফেলে যাচ্ছেন। কী ভয়ঙ্কর অসহায় দৃশ্য! মানুষ তখন আর কিছু করতে পারে না। ডাক্তার, ওষুধ, প্রার্থনা সবকিছু হঠাৎ অসহায় হয়ে দাঁড়ায় মৃত্যুর সামনে। তুমি হয়তো ভেবেছিলে একটু পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। হয়তো শেষবারের মতো বাবার হাত শক্ত করে ধরেছিলে। হয়তো মনে মনে বলেছিলে, “বাবা, তুমি যেও না।” কিন্তু মানুষ কি কাউকে ধরে রাখতে পারে? আমরা কেবল স্মৃতিকে ধরে রাখি। কখনো একটা শার্টের গন্ধে, কখনো পুরনো চশমায়, কখনো ব্যবহৃত জায়নামাজে, কখনো একটি পুরনো ডায়েরির পাতায়। আর কখনো হঠাৎ বিকেলের আলো এসে পড়ে কোনো চেয়ারে যেখানে একসময় তিনি বসতেন। তখন বুকের ভেতর হাহাকার ওঠে।
আফসানা, তুমি জানো? পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষ হয়তো সে-ই যে তার বাবাকে হারিয়েছে অথচ শক্ত থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে। কারণ সমাজ তাকে বলে কেঁদো না, শক্ত হও। অথচ মানুষ কি পাথর? মানুষের বুকের ভেতরে তো রক্তমাংসের স্মৃতি থাকে। কত কথা অপূর্ণ থেকে যায়! কত অভিমান! কত না বলা ভালোবাসা! তুমি হয়তো কখনো বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলোনি আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। আমাদের সমাজে এসব কথা বলা হয় না। আমরা ভালোবাসা লুকিয়ে রাখি দায়িত্বের ভেতরে, অভিমানের ভেতরে, চুপচাপ এক কাপ চা এগিয়ে দেওয়ার মধ্যে। আর যখন মানুষ চলে যায় তখন হঠাৎ মনে হয় ইশ! আরেকবার যদি বলা যেত! জানো আফসানা, আমার মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষ আসলে পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। যে মানুষকে খুব ভালোবাসা হয় সে থেকে যায়। তোমার হাঁটার ভঙ্গিতে হয়তো তোমার বাবার ছায়া আছে। তোমার রাগে, তোমার চুপ করে থাকার অভ্যাসে, মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ উদ্বেগে হয়তো তিনি এখনও বেঁচে আছেন। মানুষ শরীর নিয়ে চলে যায়, কিন্তু তার স্পর্শ, শিক্ষা, মায়া এসব কি কখনো মরে?
তুমি যখন খুব ভেঙে পড়বে, মনে হবে পৃথিবীটা অসহনীয় তখন আকাশের দিকে তাকিয়ো। আমি জানি এ কথা শুনতে খুব সাহিত্যিক লাগে কিন্তু সত্যি কিছু মানুষ চলে গিয়েও আমাদের ভেতরে পাহারাদারের মতো বেঁচে থাকে। তোমার বাবা হয়তো এখনও চান তুমি বাঁচো, তুমি হাসো, তুমি নিজের জীবনকে অসমাপ্ত শোকের অন্ধকারে ডুবিয়ে না রাখো। তবে এটাও সত্যি ভুলে যেতে হবে এমন কথা আমি বলছি না। মানুষ কি তার বাবাকে ভুলে যায়? যায় না। কেবল শোকের সঙ্গে বসবাস করতে শিখে। প্রথমে কান্না আসে ঝড়ের মতো, পরে বৃষ্টির মতো, তারপর একদিন হয়তো কেবল মেঘ জমে কিন্তু আকাশ ভেঙে পড়ে না। তুমি শক্ত মেয়ে এ কথা সবাই বলে। কিন্তু আমি বলি শক্ত মানুষও কাঁদে। আর কান্না দুর্বলতা নয়। কান্না মানে তুমি এখনও ভালোবাসতে জানো। তুমি এখনও মানুষ। একদিন হয়তো সন্ধ্যা নামবে তুমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবে। হঠাৎ মনে হবে বুকের ভেতরের ব্যথা আগের মতো তীব্র নয়। তখন অপরাধবোধে ভুগবে না। সময়ের কাজ সময় করে। মানুষকে বাঁচতে হয় এই নিষ্ঠুর অথচ সুন্দর পৃথিবীর নিয়মেই। শুধু একটা কথা মনে রেখো তোমার ভেতরের ভাঙা মানুষটাকে একা ফেলে দিও না। তাকে সময় দিও, কান্না দিও, স্মৃতি দিও। কারণ যে মানুষ শোককে সম্মান করতে পারে সে একদিন জীবনকেও গভীরভাবে ভালোবাসতে শেখে। তোমার বাবার জন্য দোয়া রইলো। আর তোমার জন্য একটা নরম আলোর প্রত্যাশা রইলো যে আলো একদিন তোমার দীর্ঘ অন্ধকারের পাশে জ্বলে উঠবে। শুধু ভালো থেকো তুমি। যদিও আমি জানি ভালো থাকা সাজানো কতগুলো শব্দের মতো এত সহজ নয়। ইতি তোমার স্বামী বিল্লাল বিন কাশেম (সোহেল)।
আজ যখন আমার জীবন ও ডায়েরির এই অধ্যায়গুলোর দিকে ফিরে তাকাই তখন বুঝতে পারি জীবন আসলে এক অবিরাম স্রোত যেখানে শোক আর ভালোবাসা একই সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে। দুঃখ আছে বলেই ভালোবাসা এসে পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দেয়। নৈমিত্তিক ও গতানুগতিক বিষয়ের বাইরে মানুষের মনের এই মনস্তাত্ত্বিক টান, একাকীত্ব ও পরম আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা আমাকে মানুষ হিসেবে প্রতিনিয়ত নতুন করে সাজিয়ে দেয়। জীবন থেকে নেয়া এই খণ্ডচিত্রগুলো আমার অস্তিত্বের এমন এক শাশ্বত সত্য যা আমি আমার নিশ্বাসের প্রতিটি স্পন্দনে অনুভব করি। যা আমার আব্বাকে আমার মাঝে এখনো জীবন্ত করে রাখে।
লেখক: কবি, লেখক, কলামিস্ট ও এমফিল গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।


