মতামত

নির্বাচনের পরও কাটছে না ব্যবসার সংকট: ঈদ পরবর্তী কৃষি খাতের বাস্তব চিত্র

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার: নির্বাচনের উত্তাপ অনেকটাই স্তিমিত হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে ধীরে ধীরে স্বস্তির আবহ ফিরছে। টকশোর তর্ক কমেছে, ব্যানার-ফেস্টুন সরেছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও কিছুটা কমেছে। অনেকের প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলেই অর্থনীতির চাকা নতুন গতি পাবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং ব্যবসায়ীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন। কিন্তু বাস্তবতা এখনো সেই আশার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।

রাজনীতির মাঠ শান্ত হলেও ব্যবসার মাঠে এখনও অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিশেষ করে ঈদুল আজহার পর দেশের বাজারে যে মন্দাভাব তৈরি হয়েছে, তা কৃষিভিত্তিক ব্যবসা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং উৎপাদনমুখী খাতগুলোকে নতুন করে চাপে ফেলেছে।

ঈদকে ঘিরে সাধারণত বাজারে একটি বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য, পোশাক কিংবা অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের বিক্রি বাড়ে। কিন্তু উৎসব শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই চাহিদা হঠাৎ করেই কমে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বরং মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার সংকটের কারণে ঈদ-পরবর্তী বাজারে স্থবিরতা আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য বলছে, দীর্ঘ সময় ধরে দেশের মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের আশপাশে অবস্থান করছে। মানুষের আয় বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় তার চেয়ে দ্রুতগতিতে বেড়েছে। ফলে পরিবারগুলো এখন প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত খরচ কমিয়ে দিচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, দুগ্ধজাত পণ্য এবং অন্যান্য ভোক্তা পণ্যের বাজারে।

সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (SMEs)। অনেক উদ্যোক্তা এখন নতুন বিনিয়োগের কথা ভাবছেন না; বরং বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষি খাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্য বাজার নিশ্চিত না হওয়ায় কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা প্রত্যাশিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিও বড় একটি কারণ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সার, কীটনাশক, পশুখাদ্য এবং কৃষি যন্ত্রপাতির খরচ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেলেও বাজারে সেই অনুপাতে মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে লাভের মার্জিন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার। বর্তমানে অনেক উদ্যোক্তাকেই ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ বা তারও বেশি সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। কৃষি ও SME খাতের জন্য এমন সুদহার দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা পরিচালনাকে কঠিন করে তুলছে। নতুন উদ্যোক্তারা যেমন নিরুৎসাহিত হচ্ছেন, তেমনি পুরোনো উদ্যোক্তারাও ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন।

লজিস্টিক ও Supply Chain ব্যবস্থার দুর্বলতাও সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেশে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য এখনও কোল্ড চেইনের অভাব, সংরক্ষণ সংকট এবং অদক্ষ পরিবহন ব্যবস্থার কারণে নষ্ট হয়ে যায়। কৃষক উৎপাদন করেন, কিন্তু বাজার পর্যন্ত পণ্য পৌঁছানোর আগেই তার একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়। এতে যেমন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি ভোক্তাকেও বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়।

আমি দীর্ঘদিন ধরে কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাজ করছি। ‘কতকিছুর হাট’-এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক, খামারি ও ভোক্তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে খুব কাছ থেকে দেখেছি—উৎপাদনের চেয়ে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা অনেক সময় বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায়। কৃষক ভালো পণ্য উৎপাদন করলেও ন্যায্য বাজার না পেলে তার পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। অন্যদিকে ভোক্তাও নিরাপদ খাদ্য সহজে পান না।

তবে সংকটের মাঝেও সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সংস্কার। কৃষি ও ব্যবসা খাতকে এগিয়ে নিতে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, কৃষি ও SME খাতের জন্য সহজ শর্তে এবং Single Digit সুদে ঋণের সুযোগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোল্ড স্টোরেজ ও আধুনিক Supply Chain অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল মার্কেটিং ও Direct Marketing ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষককে সরাসরি ভোক্তার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। চতুর্থত, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য ও Food Processing শিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে। পঞ্চমত, রপ্তানিমুখী কৃষি পণ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যবসায়ীরা এখন আর শুধু আশ্বাস শুনতে চান না। তারা দেখতে চান বাস্তব উদ্যোগ, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। কারণ ব্যবসা সচল না হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, বিনিয়োগ বাড়বে না এবং অর্থনীতির গতি ফিরবে না।

আজও দেশের কৃষক রোদে পুড়ে মাঠে কাজ করছেন। উদ্যোক্তারা প্রতিকূলতার মধ্যেও লড়াই করে যাচ্ছেন। তরুণরা এখনও নতুন স্বপ্ন দেখছেন। তাদের এই আস্থা ধরে রাখতে হলে অর্থনীতিকে বাস্তব অর্থেই গতিশীল করতে হবে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পর এখন সময় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার। কারণ শক্তিশালী ব্যবসা, সমৃদ্ধ কৃষি এবং নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাই পারে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি আরও মজবুত করতে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button