অপরাধচট্টগ্রাম

সড়ক কেটে র‌্যাব-পুলিশের চৌকিতে গুলি: প্রশাসনকে রোকন-ইয়াসিন-ফারুক বাহিনীর সরাসরি চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বহুল আলোচিত জঙ্গল সলিমপুর আবারও রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। গভীর রাতে যৌথ বাহিনীর আলীনগর ক্যাম্পে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীদের হামলা, গুলিবর্ষণ ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। শুধু হামলাই নয়, অভিযানের পথ বন্ধ করতে সন্ত্রাসীরা ডাম্পট্রাক ও স্কেভেটর ব্যবহার করে এলাকায় প্রবেশের প্রধান পাঁচটি সড়ক কেটে ফেলে। এতে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পুরো জঙ্গল সলিমপুর এলাকা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি, যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প এবং চলমান অভিযানের মধ্যেও সন্ত্রাসীদের এমন প্রকাশ্য তাণ্ডব এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় কিভাবে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীরা রাতভর হামলা, গুলি ও সড়ক কেটে বিচ্ছিন্ন করার মতো ঘটনা ঘটালো তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল।
জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় স্থাপিত যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ উদ্বোধন করার কথা ছিল। কিন্তু উদ্বোধনের আগের রাতেই ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। রবিবার (২৪ মে) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে শতাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী ক্যাম্পে অতর্কিত হামলা চালায়। এসময় তারা ক্যাম্পে ভাঙচুর চালানোর পাশাপাশি দায়িত্বরত র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, হামলার আগে থেকেই পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসীরা এলাকায় প্রবেশের প্রধান সড়কগুলো বিচ্ছিন্ন করার কাজ শুরু করে। রাতের আঁধারে ডাম্পট্রাক, ট্রাক ও স্কেভেটর এনে একের পর এক রাস্তা কেটে ফেলা হয়। এতে বাহিনীর যানবাহন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি। স্থানীয়রা বলছেন, এটি ছিল সন্ত্রাসীদের পূর্বপরিকল্পিত সামরিক কৌশলের মতো অপারেশন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুর নিয়ন্ত্রণ করে আসা শীর্ষ সন্ত্রাসী রোকন মেম্বার, ইয়াসিন, ফারুক, লুৎফর ও লাল বাদশার অনুসারীরাই এই হামলার সঙ্গে জড়িত। এলাকাবাসীর দাবি, এসব সন্ত্রাসীর হাতে রয়েছে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র। পাহাড়ি এলাকা, দুর্গম পথ এবং ঘনবসতিপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান ব্যবহার করে তারা বছরের পর বছর ধরে নিজেদের অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে।

অনেকের ভাষ্য, প্রশাসনের চেয়েও এসব সন্ত্রাসীর অস্ত্রের ক্ষমতা বেশি। তাদের কাছে কয়েকশ অস্ত্র মজুদ রয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অস্ত্র উদ্ধার করলেও মূল হোতারা বারবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে। ফলে সন্ত্রাসীরা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

সোমবার সকাল ১১টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম। তিনি বলেন, “জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। একদিনে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। তবে সরকারের ধারাবাহিক অভিযানে সন্ত্রাসীরা এখন ছন্নছাড়া অবস্থায় রয়েছে। তাই তারা মরিয়া হয়ে এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের আলীনগর স্কুলে স্থাপিত ক্যাম্পকে টার্গেট করেই হামলা হয়েছে। কয়েক রাউন্ড গুলিও ছোড়া হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাল্টা প্রস্তুতির মুখে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়।”

পুলিশ সুপার জানান, অভিযানে ডাম্প ট্রাক, ট্রাক ও মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া অন্তত ১৬ জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তিনি বলেন, “সন্ত্রাসীরা নাড়াচাড়া দিচ্ছে, তবে কোনো লাভ হবে না। জঙ্গল সলিমপুরকে শান্তিপূর্ণ এলাকায় পরিণত করতে সরকার যা প্রয়োজন সব করবে।”

তিনি আরও বলেন, “এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা যোগাযোগ ব্যবস্থা। দুর্গম রাস্তা এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে অভিযান পরিচালনায় বেগ পেতে হয়। দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন না করলে অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।”

এদিকে র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক হাফিজুর রহমান জানান, হামলার পর থেকেই অতিরিক্ত র‌্যাব, সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুরো এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চলছে।

তিনি বলেন, “ঘটনায় জড়িত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনসহ তার অনুসারীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জঙ্গল সলিমপুরের ভৌগোলিক অবস্থান সন্ত্রাসীদের জন্য সুবিধাজনক। তারা পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করে থাকে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণে সোর্স নিয়োগ করে রেখেছে।”

র‌্যাব-৭ অধিনায়ক আরও বলেন, “সন্ত্রাসীরা দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি একে-৪৭ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছে। হামলায় ক্যাম্পটির প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে প্রায় ৫০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করছিলেন।”

তিনি বলেন, “বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। রাস্তা উন্নয়ন হলে এই এলাকায় অভিযান পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।”

র‌্যাব জানিয়েছে, ক্যাম্পে হামলা, গুলি ও ভাঙচুরের ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রোকন মেম্বার, ইয়াসিন, ফারুক, লুৎফর ও লাল বাদশা বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে পুরো সলিমপুর। চাঁদাবাজি, জমি দখল, অস্ত্রের মহড়া, মাদক ব্যবসা এবং সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানো ছিল তাদের নিয়মিত কর্মকাণ্ড। অনেকেই ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পান না।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কিছু কথিত ভুয়া সাংবাদিক ও ফেসবুকভিত্তিক অপপ্রচারকারীকে ব্যবহার করে এসব সন্ত্রাসী নিজেদের প্রভাব বজায় রাখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশাসন ও মূলধারার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক প্রচারণাও চালানো হচ্ছে বলে দাবি এলাকাবাসীর।

জানা যায়, গত ৯ মার্চ প্রথমবারের মতো সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের বিশাল যৌথ অভিযান পরিচালিত হয় জঙ্গল সলিমপুরে। ওই অভিযানে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে যৌথ বাহিনী এবং দীর্ঘদিনের সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়।

পরে জঙ্গল সলিমপুরের এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় ও আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ে র‌্যাব-পুলিশের সমন্বয়ে দুটি স্থায়ী চৌকি স্থাপন করা হয়। ওই অভিযানে ২২ জনকে গ্রেফতার করা হলেও ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন, রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিন, নুরুল হক ভান্ডারি, গাজী সাদেক ও গোলাম গফুরসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী এখনো পলাতক রয়েছে।

সচেতন মহলের মতে, জঙ্গল সলিমপুরে সাম্প্রতিক হামলা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি প্রশাসনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের শক্ত অবস্থানের প্রকাশ। দ্রুত সময়ের মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার, পাহাড়ি যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, স্থায়ী নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা এবং অস্ত্র উদ্ধার অভিযান জোরদার না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button