দেশ

বুড়িচংয়ে কিশোর গ্যাং দমনে প্রশাসনের ধীরগতিতে ক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক: কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায় আনন্দ পাইলট স্কুল মাঠে দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র সদৃশ মারণাস্ত্র নিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের প্রকাশ্য মহড়া ও আস্ফালনের ঘটনায় স্থানীয় জনমনে চরম আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভিডিও ও স্থিরচিত্রে অপরাধীদের মুখমণ্ডল এবং পরিচয় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠলেও দৃশ্যমান কোনো আইনি পদক্ষেপ না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।

গত ৫ জুন আনন্দ পাইলট স্কুল মাঠে একদল কিশোর দেশীয় অস্ত্র এবং অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র সদৃশ অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শন করে। ‘BS 999’, ‘Raw’ এবং ‘AK 47’—এই তিনটি নামে আত্মপ্রকাশ করা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা দলবদ্ধভাবে মাঠে মহড়া দেয় এবং এলাকায় নিজেদের আধিপত্য জাহির করতে জনমনে ত্রাসের সৃষ্টি করে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ মানুষের ধারণ করা ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই তা দেশব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ভিডিওতে মহড়ায় অংশ নেওয়া কিশোরদের পরিচয় স্পষ্ট হলেও অজ্ঞাত কারণে পুলিশ এখনো তাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়নি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, এই ঘটনা হুট করে ঘটেনি। গত ৩ জুন একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কিশোর গ্যাং সদস্যরা তাদের এই কর্মসূচির আগাম ইঙ্গিত দিয়েছিল। পুলিশ তাদের পরিচয় শনাক্ত করার কথা স্বীকার করলেও বাস্তবে কাউকে আইনের আওতায় আনতে না পারায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বুড়িচংয়ে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য চললেও প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা না থাকায় তারা দিন দিন আরও বেপরোয়া ও দুর্ধর্ষ হয়ে উঠছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক জানান, স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। এই গ্যাংগুলো এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, তুচ্ছ ঘটনায় মারামারি এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরির অন্যতম কারণ। ভিডিও ফুটেজে অপরাধীদের চেনা যাওয়ার পরও কেন তারা গ্রেপ্তার হচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশাসনের আন্তরিকতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। তাদের দাবি, দ্রুত এই গ্যাং কালচার বন্ধ না হলে পাহাড়সম সামাজিক বিপর্যয় নেমে আসবে।

বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লুৎফর রহমান এ বিষয়ে বলেন, “আমরা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ঘটনার পর থেকেই তারা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছে। তবে তাদের আটক করতে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

এদিকে কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য হাজী জসীম উদ্দীন কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “মাদকের মতো বুড়িচংয়ের মাটিতে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধেও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হবে। আমি ওসির সঙ্গে কথা বলেছি। যারা অস্ত্র হাতে নিয়ে মহড়া দিয়েছে এবং সামাজিক শান্তি বিঘ্নিত করেছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। দ্রুততম সময়ে তাদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর বড় হুমকি। এই ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতে কিশোর অপরাধীরা আরও বড় ধরনের সহিংসতায় জড়িয়ে পড়বে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button