আইন-শৃঙ্খলাচট্টগ্রাম

অপরাধের অভয়ারণ্যে রাষ্ট্রের প্রবেশ, জঙ্গল সলিমপুরে সেনাবাহিনীর ৪ সড়ক নির্মাণে নতুন যুগের সূচনা

মুহাম্মাদ জুবাইর: তিন দশকের সন্ত্রাস, মাদক, অপহরণ, পাহাড় কাটা ও অবৈধ দখলদারিত্বের অবসানে সরকারের বড় পদক্ষেপ; দুর্গম পাহাড়ি জনপদে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সেনাবাহিনীর মেগা প্রকল্প শুরু, স্বস্তিতে সাধারণ মানুষ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর, একটি নাম, যা গত তিন দশক ধরে বারবার উঠে এসেছে সন্ত্রাস, অবৈধ দখল, পাহাড় কাটা, মাদক ব্যবসা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, হত্যা এবং প্রশাসনের জন্য চরম চ্যালেঞ্জপূর্ণ একটি অঞ্চল হিসেবে। দীর্ঘদিন ধরে এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকাটি কার্যত অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। ঘন বনাঞ্চল, দুর্গম পাহাড়ি পথ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন অপরাধী চক্র এখানে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল।

অবশেষে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিশেষ নির্দেশনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জঙ্গল সলিমপুরে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সড়কগুলো শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই করবে না, বরং দীর্ঘদিন ধরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নাগালের বাইরে থাকা এলাকাগুলোকে রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

গত ৪ জুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের কাজ শুরু করে। পাহাড়ি ও অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণে সেনাবাহিনীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয় এখনো নির্ধারিত না হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এটি হবে জঙ্গল সলিমপুরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উন্নয়নমূলক উদ্যোগগুলোর একটি।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে তথাকথিত ‘ছিন্নমূল পুনর্বাসন’ কার্যক্রমের আড়ালে সরকারি খাস জমি অবৈধভাবে দখল ও বিক্রির মাধ্যমে জঙ্গল সলিমপুরের বর্তমান সংকটের সূত্রপাত ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন এলাকার নদীভাঙন কবলিত ও বাস্তুচ্যুত মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে স্বল্প মূল্যে প্লট বিক্রির নামে বিশাল জনবসতি গড়ে তোলা হয়।

সময়ের ব্যবধানে এই বসতি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সম্প্রসারিত হতে থাকে। সরকারি তদারকি ও পরিকল্পনার বাইরে গড়ে ওঠা এলাকাগুলো ধীরে ধীরে অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ক্রমেই বাড়তে থাকে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে কিছু প্রভাবশালী চক্র এলাকাটিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। ফলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুরের ভৌগোলিক অবস্থানই দীর্ঘদিন ধরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দুর্গম পাহাড়ি পথ এবং পর্যাপ্ত সড়ক না থাকায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো ছিল অত্যন্ত কঠিন।

একাধিকবার পুলিশ, র‌্যাব এবং জেলা প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করলেও অপরাধীরা পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে সহজেই আত্মগোপন করত। অনেক ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনার আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার অভিযোগও ছিল।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন সড়কগুলো নির্মিত হলে পুলিশ, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান খুব অল্প সময়ে এলাকায় পৌঁছাতে পারবে। এর ফলে অপরাধ দমন কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।

সেনাবাহিনীর নির্মাণাধীন প্রথম সড়ক ছিন্নমূল এলাকা থেকে আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। দ্বিতীয় সড়ক আলীনগর ও টেক্সটাইল এলাকা হয়ে সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত হবে।

তৃতীয় সড়কটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আলীনগর থেকে বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমি (বিএমএ) সংলগ্ন এলাকা হয়ে ভাটিয়ারী-বালুচড়া লিংক রোডের মাধ্যমে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত হবে।

চতুর্থ সড়কটি জঙ্গল সলিমপুরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করে তুলবে। ফলে বহু বছরের বিচ্ছিন্নতা দূর হবে এবং এলাকার হাজার হাজার মানুষ সরাসরি উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারবে।

পরিবেশবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পাহাড় কাটার কারণে জঙ্গল সলিমপুরের পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ের ঢাল কেটে বসতি স্থাপন এবং বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যেকোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। তাই উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

সেনাবাহিনীর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন পর জঙ্গল সলিমপুরে স্থায়ী উন্নয়নের আশা দেখা দিয়েছে। তারা বিশ্বাস করেন, নতুন সড়ক নির্মাণের ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এতদিন একটি অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লেগে যেত। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যেতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠত। নতুন সড়ক নির্মাণ শেষ হলে এসব সমস্যার উল্লেখযোগ্য সমাধান হবে।

এদিকে এলাকাবাসীর একাংশের অভিযোগ, উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সুবিধা ভোগ করা একটি গোষ্ঠী প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, জঙ্গল সলিমপুরে সেনাবাহিনীর এই চার সড়ক নির্মাণ প্রকল্প শুধু একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মসূচি নয়; এটি মূলত দীর্ঘদিনের অরাজকতা, অপরাধ এবং বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রের কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করার একটি বড় উদ্যোগ।

সফলভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জঙ্গল সলিমপুর শুধু সীতাকুণ্ড নয়, সমগ্র চট্টগ্রামের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। বহু বছরের অবহেলা ও আতঙ্ক পেছনে ফেলে উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার নতুন যাত্রা শুরু করবে এই পাহাড়ি জনপদ, এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button