অনলাইন জুয়ার কোটি টাকার কারবার: সিআইডির জালে ৩ জন আটক

নিজস্ব প্রতিবেদক: অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লেনদেন, এমএফএস ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে আরও তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত এই চক্রের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে।
সিআইডি জানায়, গ্রেফতারকৃতরা হলেন নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার চরনগরদী এলাকার মো. রায়হান খান (২১), নরসিংদী সদর উপজেলার ভাগদী এলাকার মো. পাভেল রহমান ভূইয়া (২৩) এবং নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার ভিটি পরমেশ্বরদী এলাকার আবু জোবায়ের সানি (৩৬)।
গত ১৫ জুন সিআইডির সাইবার পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইউনিটের একটি বিশেষ আভিযানিক দল নরসিংদী সদর থানার চিনিশপুর জেলখানা মোড় এলাকা থেকে রায়হান খান ও পাভেল রহমান ভূইয়াকে এবং নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার বাজার এলাকা থেকে আবু জোবায়ের সানিকে গ্রেফতার করে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাইবার পুলিশ সেন্টার নিয়মিত অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকালে দেশের অভ্যন্তর ও বিদেশ থেকে পরিচালিত একাধিক অনলাইন বেটিং ও জুয়ার ওয়েবসাইটের কার্যক্রম শনাক্ত করে। এসব ওয়েবসাইট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন প্রচার করে আসছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিসসহ বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং অনলাইন ক্যাসিনোকে কেন্দ্র করে বিপুল অঙ্কের অর্থের বেটিং পরিচালিত হচ্ছিল।
এ ঘটনায় সিআইডি নিজেই বাদী হয়ে পল্টন থানায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করে। মামলা রুজুর পর সিপিসি তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় চক্রটির আর্থিক লেনদেন, এজেন্ট নেটওয়ার্ক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তে তদন্ত শুরু করে।
তদন্তে উঠে এসেছে, অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণের জন্য ব্যবহারকারীদের প্রথমে একটি ওয়ালেট বা ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্ট খুলতে হতো। এরপর চক্রের সদস্যরা খেলোয়াড়দের বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়সহ বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ব্যাংক হিসাব এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ জমা দিতে উৎসাহিত করত। অর্থ জমা হওয়ার পর তাদের বেটিং অ্যাকাউন্টে ভার্চুয়াল ব্যালেন্স যোগ করা হতো, যা দিয়ে বিভিন্ন জুয়ার খেলায় অংশ নেওয়া যেত।
সিআইডির তদন্তে আরও জানা যায়, চক্রটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য এজেন্ট নিয়োগ করেছিল। এসব এজেন্টের নামে নিবন্ধিত মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে জুয়ার অর্থ সংগ্রহ করা হতো। পরে কমিশন কেটে রেখে অবশিষ্ট অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেল ও ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হতো।
তদন্তকারীরা জানান, অনলাইন বেটিং সাইটে ব্যবহৃত এজেন্ট নম্বর, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং ডিজিটাল ট্রেইল বিশ্লেষণ করে গ্রেফতারকৃতদের সম্পৃক্ততা শনাক্ত করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।
সিআইডির তথ্যমতে, গ্রেফতারকৃত রায়হান খান ও আবু জোবায়ের সানি নিজেদের নামে নিবন্ধিত এজেন্ট সিম অনলাইন জুয়ার সাইটে সক্রিয় রাখতেন এবং এর বিপরীতে কমিশন গ্রহণ করতেন। অন্যদিকে পাভেল রহমান ভূইয়া বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে এজেন্ট সিম সংগ্রহ করে চক্রের কাছে সরবরাহের কাজ করতেন। এসব সিম অনলাইন বেটিং সাইটে অর্থ জমা ও উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে বলে তদন্তে জানা গেছে।
সিআইডি জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং তাদের আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অনলাইন জুয়ার এই নেটওয়ার্ক শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থপাচার চক্রেরও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বিশেষ করে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
সিআইডি আরও জানিয়েছে, এই মামলায় এর আগেও তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত ৭ জুন টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে মো. সোলায়মান (৪৭), মো. সাগর মিয়া (২৮) এবং মো. জুয়েল রানা (৩২) নামের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়।
বর্তমানে সাইবার পুলিশ সেন্টার অনলাইন জুয়ার পুরো নেটওয়ার্ক, অবৈধ ই-ট্রানজেকশন, অর্থপাচারের রুট এবং এর সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি সদস্যদের শনাক্তে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। চক্রটির মূলহোতাসহ অন্যান্য সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।



