প্রশাসনমাদক

পুলিশের হাতে উদ্ধার, পুলিশের হাতেই গায়েব এক লাখ ইয়াবা

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশের বিরুদ্ধে ওঠা ভয়াবহ অভিযোগ নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে মাদকবিরোধী অভিযান, পুলিশের জবাবদিহিতা এবং আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতাকে। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় পাচারের উদ্দেশ্যে বহন করা এক লাখ ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করেও মামলা না করা, অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়া এবং উদ্ধার হওয়া মাদক রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের পরও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। শুধু তাই নয়, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী উদ্ধার হওয়া ইয়াবা বড়িগুলো আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিন। তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, আইন লঙ্ঘন, প্রমাণ সংরক্ষণে ব্যর্থতা এবং অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ তদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানোর পরও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ঘটনাটি ঘটে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর। কিন্তু বিষয়টি দীর্ঘদিন গোপনই ছিল। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও রেকর্ডিং পুরো ঘটনাকে আলোচনায় নিয়ে আসে। অডিওতে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা, সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা এবং মাদক আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে কথোপকথন প্রকাশ্যে আসার পর চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ নড়েচড়ে বসে।

এরপর সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরীকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কয়েক মাস ধরে সাক্ষ্য-প্রমাণ, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, ডিউটি রোস্টার, কল রেকর্ড এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা শেষে ছয় পৃষ্ঠার একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। প্রতিবেদনটি গত ২৯ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কক্সবাজার জেলা আদালতের এক বিচারকের গানম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন।প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের মোশাররফ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি এক লাখ ইয়াবাভর্তি একটি লাগেজ গ্রহণ করেন।ঢাকায় পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে তাঁর পাওয়ার কথা ছিল ৮০ হাজার টাকা।

একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য কীভাবে দেশের সবচেয়ে বড় মাদক পাচারচক্রের একটি চালান বহনের সঙ্গে যুক্ত হলেন, সেই প্রশ্নের উত্তরও এখনো অজানা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি শুধু একজন সদস্যের অপরাধ নয়; এর পেছনে আরও বড় নেটওয়ার্ক থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

দেশ ট্রাভেলসের একটি বাসে করে কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন ইমতিয়াজ।বাসটি কর্ণফুলী নদীর ওপর শাহ আমানত সেতু অতিক্রম করার পর বাকলিয়া থানার এএসআই সাদ্দাম হোসেন এবং পুলিশের এক সোর্স বাসে ওঠেন।তাঁরা ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা ইমতিয়াজকে জাগিয়ে তোলেন।
ইমতিয়াজ নিজেকে পুলিশ সদস্য পরিচয় দেন এবং পরিচয়পত্র প্রদর্শন করেন।
এরপর তাঁকে বাস থেকে নামিয়ে কাছাকাছি একটি পুলিশ বক্সে নিয়ে যাওয়া হয়।
কিছু সময় পর বাসে থাকা তাঁর লাগেজটিও পুলিশ বক্সে নিয়ে আসা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ বক্সে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ, এসআই আল-আমিন সরকারসহ কয়েকজন সদস্য।
সেখানে লাগেজটি খোলা হলে ভেতরে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা পাওয়া যায়।
মোট ১০টি প্যাকেট ছিল। প্রতিটি প্যাকেটে ১০ হাজার করে মোট এক লাখ ইয়াবা বড়ি।
বাংলাদেশের মাদকবিরোধী অভিযানের ইতিহাসে এটি কোনো ছোটখাটো উদ্ধার নয়। বরং এটি একটি বড় চালান হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো পরিমাণ।
আইন অনুযায়ী এ অবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে মামলা গ্রহণ, জব্দ তালিকা প্রস্তুত, আলামত সংরক্ষণ এবং অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করার কথা ছিল।
কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, কোনো নিয়মই অনুসরণ করা হয়নি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইয়াবা উদ্ধারের পর ইমতিয়াজ হোসেন উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের কাছে নিজেকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন।
এরপর সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন।
এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়, ইমতিয়াজকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
পুলিশ সদস্যরা লাগেজ থেকে ইয়াবার প্যাকেটগুলো নিজেদের দখলে নেন এবং কাপড়চোপড়সহ খালি লাগেজ ফেরত দেন।
এরপর ইমতিয়াজ নির্বিঘ্নে সেখান থেকে বেরিয়ে যান।
পরে তিনি অলংকার মোড় হয়ে কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে চলে যান।
অর্থাৎ, এক লাখ ইয়াবাসহ হাতেনাতে ধরা পড়া একজন ব্যক্তিকে কোনো মামলা ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনের সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ হচ্ছে উদ্ধার হওয়া এক লাখ ইয়াবার কোনো হদিস নেই।
আইন অনুযায়ী উদ্ধারকৃত মাদক আদালতে উপস্থাপন এবং মালখানায় জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি।
প্রস্তুত করা হয়নি কোনো জব্দ তালিকা।
নেই কোনো মামলা নম্বর।
নেই কোনো আলামত রেজিস্ট্রেশন।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে,উদ্ধার হওয়া এক লাখ ইয়াবা গেল কোথায়?
তদন্ত কমিটি এ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর খুঁজে পায়নি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিন পুরো বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন।
কিন্তু তিনি কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
এমনকি ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের উদ্যোগও নেননি।
ফলে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৪৬ ধারার বিধান অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধ আমলযোগ্য।
তারপরও মামলা না করে তিনি পুলিশ প্রবিধানের ২৪৪ বিধি এবং পুলিশ আইনের ২৯ ধারা লঙ্ঘন করেছেন।

তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল পদমর্যাদার আট সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
পরবর্তীতে বরখাস্ত করা হয় তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদকেও।
কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে সরাসরি নাম আসার পরও ওসি আফতাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় পুলিশের ভেতর ও বাইরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অনেকে বলছেন, নিম্নপদস্থদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মূল সিদ্ধান্তদাতাদের ক্ষেত্রে রহস্যজনক নীরবতা দেখা যাচ্ছে।

ঘটনার প্রায় ছয় মাস পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো নিয়মিত মামলা হয়নি।
যে ঘটনায় এক লাখ ইয়াবা উদ্ধারের কথা বলা হচ্ছে, সেই ঘটনায় না আছে আসামি, না আছে চার্জশিট, না আছে বিচারিক প্রক্রিয়া।
এ অবস্থায় তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।

আইনজীবীরা বলছেন, এটি শুধু দায়িত্বে অবহেলার ঘটনা নয়; বরং মাদক পাচার, আলামত আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ।
তাঁদের মতে, পুরো ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া ইয়াবা কোথায় গেল, কারা সুবিধাভোগী হলো এবং এর পেছনে আরও কোনো চক্র আছে কি না,তা উদঘাটন করতে হবে।

নবনিযুক্ত সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানিয়েছেন, কেন এখন পর্যন্ত মামলা হয়নি এবং ইয়াবা উদ্ধারের পরও কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
কিন্তু জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন,তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পরও যদি মামলা না হয়, যদি উদ্ধার হওয়া মাদকই গায়েব হয়ে যায়, তাহলে মাদকবিরোধী অভিযানের বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় দাঁড়ায়?
চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত এই ‘এক লাখ ইয়াবা কেলেঙ্কারি’ এখন শুধু একটি থানার ঘটনা নয়; এটি পুলিশের জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসনের জন্য বড় এক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button