অনুসন্ধানঅভিযানদুর্নীতি

কুমিল্লা সদর উপজেলা প্রশাসনে অনিয়মের “ক্যাশিয়ার” আওয়ামী দোসর মোর্শেদের বিরুদ্ধে অফিস খরচের নামে ঘুষ বাণিজ্য সহ বিস্তর অভিযোগ – তদন্তের দাবি

এম শাহীন আলম :
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা প্রশাসনে সাট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর (সাক্ষাৎ আওয়ামী দোসর) মো. মোর্শেদ আলমকে ঘিরে উঠেছে নানা অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও অর্থ লেনদেন সহ গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুবাদে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম টুটুলের ঘনিষ্ঠ ও বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ফাতেমা তুজ জোহরার সকল কার্যক্রমে অনিয়মের “ক্যাশিয়ার” মোর্শেদ আলম বর্তমানে উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রমেও প্রভাব বিস্তার করছেন বলে স্থানীয় প্রত্যেক্ষদর্শী ও সেবাগ্রহীতা সহ উপজেলার বিভিন্ন কার্যক্রমের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের অভিযোগ।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম টুটুলের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে মো. মোর্শেদ আলম চাকুরীতে যোগদান। আর চাকুরীতে যোগদানের পর থেকে নিজেকে আওয়ামী মতাদর্শী হিসেবে জাহির করে বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন তিনি। দলীয় পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে সেবাগ্রহিতাদের সাথে অশোভ আচরণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি চেয়ারম্যানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অর্থ লেনদেনের মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও তিনি কাজ করতেন বলে উপজেলার একাধিক সূত্রে জানা যায়।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম টুটুল দেশত্যাগের পরও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমে মোর্শেদ আলমই তার প্রধান  ভূমিকা রাখছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও আর্থিক লেনদেন যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।

** বর্তমান ইউএনওর আমলে নতুন করে অভিযোগ :

অভিযোগকারীদের দাবি, বর্তমানে কুমিল্লা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা তুজ জোহরার দাপ্তরিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করেও মোর্শেদ আলমের বিরুদ্ধে ঘুষ ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের মধ্যস্থতার অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষ করে “অফিস খরচ” কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের কথা বলে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয় এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সেবাগ্রহীতা ভুক্তভোগীরা।

** টুটুলের প্রতিষ্ঠানের দুটি বিল নিয়ে প্রশ্ন :

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা তুজ জোহরার যোগসাজশে এবং মোর্শেদ আলমের কমিশন ঘুষ বাণিজ্যের সমন্বয়ে চলতি বছরের ২২ ও ২৩ জুন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম টুটুলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘রৌদ্র এন্টারপ্রাইজ’ নামে প্রতিষ্ঠানের দুটি বিল পাসের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি বিলের পরিমাণ ১৬ লাখ ১ হাজার ৮৯৮ টাকা এবং অপরটির পরিমাণ ১১ লাখ ৫০ হাজার ১২২ টাকা। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিলের কাগজপত্র ও কাজের বাস্তবতা যাচাই করলে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হতে পারে।
এক্ষেত্রে বিলের বিপরীতে কী কাজ করা হয়েছে, কাজের পরিমাণ ও মান কী ছিল, বিল অনুমোদনের সঙ্গে কারা সম্পৃক্ত ছিলেন এবং অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে সরকারি বিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না। এসব বিষয় খতিয়ে দেখা অতি জরুরি।

প্রশ্ন হলো মোর্শেদ আলম কি তাহলে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী দোসরদের পুনর্বাসনে ইজারা নিয়েছেন? কুমিল্লা সদরে সরকারের একজন নির্বাচিত এমপি ও একজন পূর্ণ মন্ত্রী থাকতে ১৩/১৪ গ্রেডের একজন সরকারীর কর্মচারীর কিভাবে দুঃসাহস হয় এখনো  পালিয়ে থাকা হত্যা মামলার আসামি আওয়ামী নেতার হয়ে প্রকাশ্যে সরাসরি কাজ করতে? ছোট পদে সর্বসাকুল্যে মাসিক সর্বোচ্চ ২৮ হাজার টাকা বেতন ভাতা পেয়ে নামে বেনামে জমি ক্রয় সহ তার বিত্তবৈভবের উৎস কি? অভিযোগকারী সহ কুমিল্লার সর্বস্তরের মানুষের মতে মোর্শেদ আলম এর মতো লোক এতো এতো অনিয়ম করে কিভাবে কার ছত্র-ছায়ায় এখনো বহাল তবিয়তে উপজেলায় অনিয়ম করেই যাচ্ছেন। মোর্শেদ আলম এর অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে তাকে উপজেলা থেকে অপসারণ এ সময়ে দাবি বলে জানিয়েছেন সচেতন মহল।

** গরুর হাটের ইজারাদারদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ :

গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে উপজেলার বিভিন্ন গরুর হাটের ইজারাদারদের কাছ থেকেও ইউএনও’র নাম ভাঙ্গিয়ে “অফিস খরচের” নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মোর্শেদ আলম এর বিরুদ্ধে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও কয়েকজন ইজারাদারের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রতিটি হাট থেকে সর্বনিন্ম ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে। এ অর্থ ইউএনওর নাম ব্যবহার করে মোর্শেদ আলম ও সোহাগ নামে আরও একজন ব্যক্তি আদায় করেছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

** ভবনের নকশা অনুমোদনে ঘুষের অভিযোগ :

মোর্শেদ আলমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ।
অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে “অফিস খরচ” নামে ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে। এমনকি জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে নকশা অনুমোদনের অভিযোগও রয়েছে।
এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নকশা অনুমোদনের রেজিস্টার, সংশ্লিষ্ট আবেদন, স্বাক্ষর, অনুমোদনের তারিখ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

** প্রশিক্ষণের অর্থ নিয়েও প্রশ্ন :

ইউনিয়ন পর্যায়ের গ্রাম পুলিশদের প্রশিক্ষণের নামে বরাদ্দকৃত অর্থের অনিয়মের অভিযোগেও মোর্শেদ আলমের সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা, ব্যয়ের খাত, খাবার ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের বিল-ভাউচার পরীক্ষা করলে প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে সরকারি হিসাবের কোনো পার্থক্য রয়েছে কি না, তা বেরিয়ে আসতে পারে।

** টিসিবির তদন্তের নামে ৩০ হাজার টাকা? :

সিটি করপোরেশনের টিসিবি-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের কথা বলে প্রত্যেক ডিলারের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে আদায়ের অভিযোগও উঠেছে মোর্শেদ আলম ও সোহাগের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ইউএনওর রেফারেন্স ব্যবহার করে এই অর্থ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি সত্য হলে কার নির্দেশে, কোন খাতে এবং কীভাবে অর্থ নেওয়া হয়েছে। তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

** ইটভাটা ও মাটি কাটার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ :

শীত মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন ইটভাটা এবং অবৈধভাবে মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কাছ থেকেও ইউএনওর নাম ব্যবহার করে বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রশাসনের নাম ব্যবহার করে কেউ অর্থ আদায় করলে তা শুধু ঘুষ বা চাঁদাবাজির অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।

** অল্প সময়ে সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ :

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, তুলনামূলকভাবে নিম্নপদে চাকরি করলেও দীর্ঘদিন একই উপজেলায় কর্মরত থাকার সুযোগে মোর্শেদ আলমের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে উঠেছে।
তবে সম্পদ অর্জনের এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তার বৈধ আয়, বেতন-ভাতা, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব এবং নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য দাপ্তরিক পরীক্ষা করা জরুরী প্রয়োজন।

** একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন, প্রশ্ন স্বচ্ছতা নিয়ে :

একই উপজেলা প্রশাসনে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার কারণে মোর্শেদ আলমের স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক যোগাযোগ ও প্রভাব তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তাদের প্রশ্ন একজন কর্মচারী দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে থাকলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো প্রশাসনিকভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না।
অভিযোগকারীদের মতে, শুধু মোর্শেদ আলম নয়, তার সঙ্গে অর্থ লেনদেনে জড়িত অন্য কেউ থাকলে তাদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

** নথিপত্র যাচাই হলেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত তথ্য :

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে কুমিল্লা সদর উপজেলা প্রশাসনের গত কয়েক বছরের :

  • প্রকল্পের হিসাব ও বিল-ভাউচার;
  • টেন্ডার ও কার্যাদেশের নথি;
  • নকশা অনুমোদনের রেজিস্টার;
  • গরুর হাট ইজারার নথি;
  • গ্রাম পুলিশ প্রশিক্ষণের ব্যয়ের হিসাব;
  • টিসিবি-সংক্রান্ত তদন্ত নথি;
  • বিভিন্ন সেবার নামে আদায়কৃত অর্থের হিসাব;
  • ঠিকাদার ও সেবাগ্রহীতাদের বক্তব্য;
  • ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রশাসকদের বক্তব্য;
  • সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য
    পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

** তদন্তের দাবি :

মোর্শেদ আলমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর ব্যাপারে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

মো. মোর্শেদ আলম এর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে তার মোবাইলে কল দিলে তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ভাই আমার কর্মফল যেহেতু আপনার কাছে গেছে আমার সাথে আপনি সরাসরি দেখা করেন আমি আপনাকে সব সরাসরি বলবো। আমি আপনাকে মোবাইলে কিছু বলতে চাই না,সর্বশেষ মোর্শেদ বলেন আমি কোন অনিয়মের সাথে জড়িত না।

সত্য বস্তু নিষ্ঠ নিরপেক্ষ নিউজের স্বার্থে “অপরাধ বিচিত্রা’র ঈগল টিম” অভিযোগগুলোর নেপথ্যের তথ্য, নথিপত্র ও অর্থ লেনদেনের বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে নিউজ প্রকাশ করা হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button