অনুসন্ধানঅভিযানদুর্নীতিপ্রতারনা

অ্যাগ্রো ট্যুরিজমের আড়ালে ‘এমএলএম’ ফাঁদ :ডায়মন্ড রিসোর্টের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিনিধি :
নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার কামারগাঁও এলাকায় ডায়মন্ড রিসোর্ট লিমিটেড নামে পরিচালিত কথিত একটি অ্যাগ্রো ট্যুরিজম প্রকল্পকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। আকর্ষণীয় মুনাফা ও বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে শত কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ শামছুল আলম সজল এমএলএম ব্যবসার চিহ্নিত ও অভিযুক্ত অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার এম আর খানসহ কয়েকজন ব্যক্তিতে নিয়ে এই ব্যবসার ফাঁদ পেতেছেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রকল্পটি মূলত সদস্য সংগ্রহনির্ভর সরকারী আইন বহির্ভ’ত একটি এমএলএম বা পিরামিড স্কিমভিত্তিক কোম্পানী। যার মাধ্যমে এখন হাজারো বিনিয়োগকারীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করে সংকটে পড়েছেন।
কয়েকজন নারী বিনিয়োগকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, মালিকের স্ত্রী পরিচয় দেয়া সালমা আক্তার (মনি) এর প্ররোচনায় বিনিয়োগ করে আমরা এখন মুনাফা তো দূরের কথা মূল টাকা ফেরৎ চেয়েও পাচ্ছিনা। অভিযোগ রয়েছে, নারী বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা সুবিধা দেয়ার কথা বলে ভিন্ন একটি সিন্ডিকেট মিসেস মনি পরিচালনা করেন।
লোভনীয় প্যাকেজ ও সদস্যভিত্তিক কমিশন :
ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটি ৩ লাখ, ৬ লাখ ও ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিভিন্ন বিনিয়োগ প্যাকেজ চালু করে। বিনিয়োগের বিপরীতে নির্দিষ্ট মাসিক মুনাফা এবং নতুন সদস্য যুক্ত করলে মোটা অঙ্কের কমিশন ও বোনাসের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো। অভিযোগ রয়েছে, নতুন সদস্য সংগ্রহই ছিল আয়ের প্রধান ভিত্তি। কিন্তু প্রতিশ্রুতি মোতাবেক নিয়মিত অর্থ তারা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। বিনিয়োগকারীদের পাওনার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে হুমকির শিকার হচ্ছেন বলেও অনেকে অভিযোগ করেছেন।
জমি ও প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন :
বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে কোম্পানিটি চটকদার ও মিথ্যা তথ্যে ভরপুর প্রচারণার আশ্রয় নিয়েছে বলেও বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করেন। প্রায় ১০০ বিঘা জমির ওপর আন্তর্জাতিক মানের অ্যাগ্রো ট্যুরিজম প্রকল্প নির্মাণের দাবি করা হলেও, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ-প্রচারিত জমির একটি বড় অংশের বৈধ মালিকানা ও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ও ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

লভ্যাংশ বন্ধ, মূলধন ফেরতেও অনিশ্চয়তা :
ভুক্তভোগীদের দাবি, শুরুতে কয়েক মাস লভ্যাংশ প্রদান করা হলেও বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে। মূলধন ফেরত চাইলে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিনিয়োগকারী বলেন, “উচ্চ মুনাফার আশায় জীবনের সঞ্চয় বিনিয়োগ করেছিলাম। এখন লভ্যাংশ তো দূরের কথা, মূল টাকাও ফেরত পাচ্ছি না।” তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে বিনিয়োগ করে যখন বুঝতে পেরেছি যে, ভুয়া কোম্পানির খপ্পরে পড়েছি তখন আমি তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করি। জানতে পারি প্রতিষ্ঠানের মালিক গুলশানের পুলিশ প্লাজায় অফিস খুলে এই অবৈধ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তার অফিস বন্ধ পেলে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি একই বিল্ডিংয়ের মার্কেটে ‘সেনকো গোল্ড’ নামীয় একটি স্বর্নের দোকান পরিচালনা করেন। কিন্তু রবিবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকায় সেখানেও তাকে পেতে ব্যর্থ হই।
ভূক্তভোগীর বক্তব্য অনুযায়ী প্রতিবেদক অনুসন্ধানে ঘটনার সত্যতার প্রমান পান। উল্লিখিত ভবনে তাদের অফিস থাকলেও বেশীরভাগ সময়ে তা বন্ধ থাকে। স্বর্ণের দোকানের সন্ধান পেলেও তার বিরুদ্ধে রয়েছে ভিন্ন অভিযোগ। স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের সাথেও তার যোগসাজস রয়েছে এমন অভিযোগ প্রতিবেদকের কানে আসে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডায়মন্ড রিসোর্ট লিমিটেডের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতামত :
অর্থনীতি ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যবসায় যদি নতুন সদস্য সংগ্রহ ও কমিশনের ওপর আয় নির্ভরশীল হয়, তবে সেটি সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী যাচাই করা প্রয়োজন। তারা বিনিয়োগের আগে প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, জমির মালিকানা ও ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button