অনুসন্ধানঅভিযান

রূপগঞ্জের ইউএনও সাইফুল ইসলামকে নিয়ে নতুন বিতর্ক, অনিয়ম ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে তদন্তের দাবি

এম শাহীন আলম :
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম জয়কে ঘিরে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা ঝড় বইছে। স্থানীয় প্রত্যেক্ষদর্শী বাসিন্দা ও সচেতন মহলের দাবি, আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন,বন্ধনা ও মুজিব প্রেমী আওয়ামীলীগপন্থী অবস্থানের দৃশ্যমান ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন এমন অভিযোগও উঠেছে।

এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানে সাইফুল ইসলাম জয়ের পূর্ববর্তী কর্মস্থল কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা এবং বর্তমান কর্মস্থল রূপগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের একাধিক সূত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনার মাধ্যমে তথ্য গুলো উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পেকুয়া উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে সাইফুল ইসলাম জয় তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি এবং “Joy Dada এবং UNO PEKUA” নামে পরিচালিত দুটি আইডি থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট, ছবি ও লেখা প্রকাশ করতেন। একই সঙ্গে সে সময়ের স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে তোলা একাধিক ছবি নিয়মিত প্রকাশ করতেন বলেও দৃশ্যমান অভিযোগ রয়েছে।

সচেতন মহলের ভাষ্য, ওই সময় তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগ সরকারের আদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করতেন। তবে এসব পোস্টের উদ্দেশ্য কী ছিল, বর্তমানে বোল পাল্টে হটাৎ নিজেকে বিএনপির মতাদর্শী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা জাহির করা। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে নিজেকে সাবেক ছাত্রদল নেতা পরিচয় নিয়ে তার নতুন উদ্দেশ্য কি তা নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে তদন্তের জন্য দাবি সচেতন মহলের। অভিযোগ উঠেছে এই সাইফুল ইসলাম জয় উপজেলা প্রশাসনে চাকুরির সুবাদে অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ উপার্জনের টাকা দিয়ে রাজধানী ঢাকা ও রূপগঞ্জে প্লট, ফ্ল্যাট সহ তার গ্রামের বাড়ি যশোরে নামে বেনামে সম্পদ গড়েছেন। তা নিয়ে অপরাধ বিচিত্রার “ঈগল টিম” এর অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, তার সাবেক কর্মস্থল পেকুয়া উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে ওখানকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তার প্রমাণ হিসেবে তৎকালীন টেলিভিশন ও পত্রিকায় তার অনিয়মের বিরুদ্ধে নিউজ প্রকাশ হয়েছিলো। যার কারণে তিনি পেকুয়াতে বেশিদিন দায়িত্বে থাকতে পারেননি।

এদিকে রূপগঞ্জে দায়িত্ব গ্রহণের পর স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ইউএনও সাইফুল ইসলাম জয় নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। তাঁদের প্রশ্ন, যদি অতীতে তিনি আওয়ামী লীগের আদর্শের প্রকাশ্য সমর্থক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে থাকেন, তবে পরবর্তীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়ার কারণ কী।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা প্রশাসক এবং তারাব পৌর প্রশাসক এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব একযোগে পালন করছেন। তাঁদের দাবি, এই দায়িত্ব পালনের সময় গত ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলা প্রশাসন ও তারাব পৌর প্রশাসনের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা প্রশাসন ও তারাব পৌর প্রশাসনের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ, বিল-ভাউচার, ক্রয়প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত সম্পন্ন হয়নি।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, গত দুই অর্থবছরের সকল উন্নয়ন প্রকল্প, বিল-ভাউচার, টেন্ডার, ক্রয়প্রক্রিয়া, কাজের গুণগত মান এবং আর্থিক লেনদেন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে অনিয়মের প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

তাঁদের মতে, বিষয়টি জনস্বার্থে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্থানীয় সরকার বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

সুশাসন ও জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা রক্ষা করা রাষ্ট্রীয় চাকরির অন্যতম মৌলিক নীতি। কোনো কর্মকর্তা যদি ভিন্ন সময়ে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করেছেন এমন অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা যাচাই করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। একই সঙ্গে তাঁর দায়িত্বকালীন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও অভিযোগ থাকলে সেগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে ইউএনও সাইফুল ইসলাম জয়ের বক্তব্য জানার জন্য তাঁর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের অভিযোগ এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উভয় বিষয়েই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা জরুরি। একই সঙ্গে তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করে জনমনে সৃষ্টি হওয়া প্রশ্নের অবসান ঘটানোর জোরালো দাবি তাদের।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button