
কুমিল্লা প্রতিনিধি:
প্রশাসন ও ভূমি অফিসের যোগসাজশে ব্রাহ্মণপাড়ায় বিপর্যয়: অবৈধ ড্রেজার-ভেকুতে ফসলি জমি ধ্বংস, খাল দখলে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা ও ডেঙ্গু ঝুঁকি
টানা ভারী বর্ষণ, অপরিকল্পিতভাবে সরকারি খাল ভরাট এবং স্থানীয় ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে অবৈধ ড্রেজার ও ভেকু মেশিনের তাণ্ডবে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় এক ভয়াবহ মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। উপজেলার ১নং মাধবপুর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতার কারণে শত শত একর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। একই সাথে জমে থাকা পানিতে ডেঙ্গু মশার বংশবিস্তার ঘটায় চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছেন লাখো বাসিন্দা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ইউনিয়ন নায়েবদের অনৈতিক সুবিধার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বন্ধ বুড়ি শাখা খাল: তলিয়ে গেছে কৃষকের স্বপ্ন
মাধবপুর ইউনিয়নের প্রায় ৪০,৫৮৪ জন জনসংখ্যার সিংহভাগই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইউনিয়নের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী ‘বুড়ি শাখা খাল’ সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খালগুলো বিগত সরকারের সময় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হাত ধরে অবৈধ দখল ও মাটি ভরাটের শিকার হয়েছে। মাধবপুর, চারিপাড়া, মিরপুর, রানীগাছ এবং বাড়ানি দক্ষিণ এলাকায় খাল ভরাট করে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট নির্মাণ করায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই বীজতলা ও ফসলের জমি তলিয়ে গিয়ে কৃষকদের স্বপ্ন এখন মাটির নিচে।
নায়েবের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ, জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত নালিশ
এদিকে উপজেলার চান্দলা মৌজার বিএস-২৫৫৫, ২৫৫৬, ২৫৫৭ ও ২৫৪৫ দাগের প্রায় ২ একর (২০০ শতক) ফসলি জমি থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে তা ধ্বংস করার অভিযোগে কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা।
অভিযোগে জামতুলি ও উত্তর চান্দলা গ্রামের বাসিন্দা দুলাল মিয়া, রফিকুল ইসলাম, স্বপন চন্দ্র দাসসহ ৭ জন কৃষক জানান, স্থানীয় ড্রেজার ব্যবসায়ী সুমন মিয়া (পিতা- চান মিয়া) ও মাটি ব্যবসায়ী ফয়সাল মিয়া (পিতা- মৃত মোসলেম মিয়া) অবৈধ ড্রেজার ও ভেকু মেশিন দিয়ে ফসলি জমি সাবাড় করছে। এতে চারপাশের আরও প্রায় ১০০ একর ফসলি জমি ধসের মুখে পড়েছে এবং চাষের অনুপযোগী হয়ে গভীর গর্তে পরিণত হচ্ছে।
কৃষকদের গুরুতর অভিযোগ, মাধবপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েব কান্তি দেবনাথকে ‘ম্যানেজ’ বা অর্থনৈতিকভাবে সুবিধা দিয়ে এই অবৈধ কারবার চালানো হচ্ছে। নায়েবকে একাধিকবার বিষয়টি জানানো হলেও তিনি সরেজমিনে গিয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো ফিরে এসেছেন।
ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি: “অবিলম্বে এই অবৈধ ড্রেজার ও ভেকু মেশিন জব্দ করা হোক এবং ভূমি অফিসের দুর্নীতিবাজ নায়েব ও ড্রেজার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের ফসলি জমি রক্ষা করা হোক।”
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) তারেক রহমান-এর ভূমিকা নিয়ে স্থানীয় জনগণের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রতিটি ইউনিয়ন ভূমিজ অফিসের নায়েবরা এসিল্যান্ডের নির্দেশনার আড়ালে নানাবিধ অপকর্মে লিপ্ত রয়েছেন।
প্রশাসনের এই চরম উদাসীনতার এক মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে উঠেছে যখন একটি অসহায় সংখ্যালঘু পরিবার উপজেলা প্রশাসনের কোনো সহযোগিতা না পেয়ে চরম হতাশা ব্যক্ত করে। এমনকি জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল করে সাহায্য চাওয়ার পরও এসিল্যান্ড বা উপজেলা প্রশাসনের কোনো দপ্তর তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি। প্রশাসনের এমন রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তার কারণে স্থানীয়রা বর্তমান এসিল্যান্ডকে ‘কোল্ড কিলার’ (Cold Killer) হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
আন্দোলনের ডাক শুধু মাধবপুরই নয়, পার্শ্ববর্তী চান্দলা, শিদলাই, সদর ইউনিয়ন এবং রাজাপুর এলাকার অধিকাংশ সরকারি খাল এখন অবৈধ দখলদারদের কবলে। প্রধান প্রধান খালগুলোতে ময়লা-আবর্জনা ও মাটি ফেলে ভরাট করার কারণে পয়াতের জলার পানি নিষ্কাশন হতে পারছে না।
এই পরিস্থিতিতে খাল ও জলাশয় উদ্ধারের দাবিতে ‘সচেতন নাগরিক ফোরাম’-এর পক্ষ থেকে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন ভারেল্লা উত্তর ইউনিয়নসহ কিছু এলাকায় লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও মূল সমস্যাগুলো এখনো অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে।
সংসদ সদস্যের আশ্বাস ও জনদাবি
ব্যালট ও মাঠের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে স্থানীয় সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন অবৈধভাবে দখল ও ভরাটকৃত সকল সরকারি খাল দ্রুত উদ্ধারের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধুমাত্র মৌখিক ঘোষণা বা সাময়িক লোকদেখানো উচ্ছেদ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এই খালগুলো পুনঃখনন ও স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত করতে হবে।
পরিবেশগত স্থায়ী বিপর্যয়, তীব্র জলাবদ্ধতা এবং ডেঙ্গুর মহামারি থেকে বাঁচতে অবিলম্বে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ, ড্রেজার সিন্ডিকেট বন্ধ এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অপসারণের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন ব্রাহ্মণপাড়ার সাধারণ জনগণ ও কৃষক সমাজ
বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনি ইশতিহার ‘খাল খনন কর্মসূচি’ বাস্তবায়ন।
প্রশাসন ও ভূমি অফিসের যোগসাজশে ব্রাহ্মণপাড়ায় বিপর্যয়: অবৈধ ড্রেজার-ভেকুতে ফসলি জমি ধ্বংস, খাল দখলে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা ও ডেঙ্গু ঝুঁকি



