
“শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল ও তার বন্ধুরা মেজর ডালিমের স্ত্রীকে কিডন্যাপ করে উনার সম্মানহানি করে। মেজর ডালিম এর বিচার চাইতে গিয়ে চাকরিচ্যুত হন। প্রতিশোধ স্বরূপ তিনি ক্যু করে শেখ মুজিবকে সপরিবারে অ্যাসা*সিনেট করেন।”
মোটাদাগে এই হচ্ছে শেখ মুজিবের খু*নের সাথে কর্নেল শরিফুল হক ডালিমের কানেকশান সম্পর্কে জনসাধারণের বিশ্বাস। ধারণা না, রীতিমত বিশ্বাস। দেশে খুব কম মানুষ পাওয়া যাবে যারা ঘটনাটা এই ফরম্যাটের বাইরে জানেন।
ইয়াং জেনারেশান বা তথাকথিত জেন-জি-কে যেহেতু টেক-স্যাভি ও ইনফো-সেন্ট্রিক ধরা হয়, সেহেতু সম্ভাবনা ছিল বা অন্তত আমি আশা করেছিলাম জুলাই-পরবর্তী পরিবেশে তারা একটু গভীরে গিয়ে সত্যটা জানবে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, সত্য জানতে ও বিশেষ করে গভীরে যেতে আমরা ইন জেনারেল প্রচন্ড অনীহ।
১৫ অগাস্টের সাথে কর্নেল ডালিমের প্রকৃত সম্পর্কের সূত্রপাত ১৯৭৪ সালের জুন মাসে।
আর্মার্ড কোরের তদানীন্তন মেজর শরিফুল হক ডালিম বীর উত্তমের (পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল) পোস্টিং তখন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে। ১৯৭৪ সালের জুনে উনি খালাতো বোনের বিয়ে অ্যাটেন্ড করতে ঢাকা আসেন। বর লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ এস এম রেজাউর রহমান। ভেন্যু ঢাকা লেডিস ক্লাব। বিয়েতে উপস্থিত তৎকালীন রুলিং এলিটের এক বিশাল অংশ।
মেজর ডালিমের সাথে সদ্যজাত বাংলাদেশের রুলিং এলিটের বহুধা সম্পর্কের বিস্তারিত নিয়ে একটা গোটা চ্যাপ্টার লেখা যাবে।
এখানে সংক্ষেপে এটুকু বলা যেতে পারে— মেজর ডালিম পঞ্চাশের দশকের খ্যাতনামা ছাত্রনেতা শামসুল হক সাহেবের সন্তান, নিজে ১৯৭১ সালের সুপরিচিত মুক্তিযোদ্ধা, জীবিতদের জন্য সর্বোচ্চ পদক ‘বীর উত্তম’ প্রাপ্ত যা মুক্তিযুদ্ধের তিনজন ব্রিগেড কমান্ডার ও ১১ জন সেক্টর কমান্ডার সহ মোট মাত্র ৬৯ জন প্রখ্যাততম মুক্তিযোদ্ধাকে দেয়া হয়েছিল। উনার ছোট ভাই ঢাকার বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা কামরুল হক স্বপন, সিভিলিয়ান হয়েও জীবিতদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদক ‘বীর বিক্রম’ প্রাপ্ত — কেউ জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ পড়েছেন অথচ স্বপনের নাম শোনেননি, এটা অসম্ভব।
মেজর ডালিমের স্ত্রী নিম্মী চৌধুরী পাকিস্তান পুলিশ সার্ভিসের প্রতাপশালী অফিসার, মুজিবনগর সরকারের আমলা ও শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ এসপি আর আই চৌধুরীর মেয়ে। শেখ ফ্যামিলির সাথে মেজর ডালিমের শ্বশুরবাড়ির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এতটুকুতে বোঝা যায় যে, ১৯৭৩ সালে মিসেস মুজিব লন্ডন বেড়াতে গেলে হাসব্যান্ডের পোস্টিংয়ের সুবাদে (বাংলাদেশ হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি) সেখানে অবস্থানরত মিসেস চৌধুরী অর্থাৎ মেজর ডালিমের শাশুড়ি তার দেখভাল করেন।
জুন ১৯৭৪-এ লেডিস ক্লাবের সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে ঢাকার আরও বহু হোমরা চোমরার মত ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান ‘কম্বলচোর’ খ্যাত গাজী গোলাম মোস্তফার ফ্যামিলিও উপস্থিত ছিল।
ফেইটফুল সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে মেজর ডালিমের ফ্যামিলির সাথে গাজী গোলাম মোস্তফার ফ্যামিলির এগজাক্টলি কী ঘটেছিল, তার দুইটা ডকুমেন্টেড ভার্শন পাওয়া যায়।
প্রথম ভার্শন, যেটা অ্যান্থনি ম্যাসকারেনাসের ‘বাংলাদেশ: আ লেগেসি অফ ব্লাড’ (১৯৮৬) বই দ্বারা বেশি ছড়িয়েছে, সেটা হচ্ছে, গাজী গোলাম মোস্তফার ভাই মেজর ডালিমের মিসেসকে ক্যাট-কলিং (ইভটিজিং) করে, মিসেস ডালিম যার প্রতিবাদ করলে সেখানে গাজী গোলাম মোস্তফার আত্মীয়-স্বজনের সাথে মেজর ডালিম ও তার ফ্যামিলি মেম্বারদের বাক-বিতণ্ডার অবতারণা হয়।
দ্বিতীয় ভার্শন, যেটা মেজর ডালিম ২০০৫-০৬ সালে তার ‘মেজর ডালিম ডট কম’ ওয়েবসাইটে ধারাবাহিক ভাবে পোস্ট করা লেখায় উল্লেখ করেন (সম্ভবত এই লেখাসমগ্রই পরে ‘আমি মেজর ডালিম বলছি’ বই হিসেবে প্রকাশিত হয়; ওয়েবসাইটটি ২০০৯ সালের কোন এক পয়েন্টে ডাউন হয়ে যায়), সেটা হচ্ছে, উনার ক্যানাডা প্রবাসী শ্যালক বাপ্পী চৌধুরীর সাথে গাজী গোলাম মোস্তফার ছেলেরা বেয়াদবী করে (পেছনের রো-তে বসে চুল টান দেয়), তা থেকে বাপ্পীর পক্ষে মেজর ডালিম ও গাজী গোলাম মোস্তফার ছেলেদের পক্ষে তাদের লোকজন বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে।
গাজী গোলাম মোস্তফার ভাই বা ছেলেদের বেয়াদবির প্রতিবাদে স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে উপস্থিত মেজর ডালিমের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবরা রুখে দাঁড়ায়।
প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মুখে গাজীর লোকজন তখনকার মত ঘটনাস্থল ত্যাগ করলেও, ঘন্টাখানেক পর গাজী গোলাম মোস্তফা নিজে রেড ক্রিসেন্টের কয়েকটা গাড়ি বোঝাই করে রক্ষীবাহিনীর ফোর্স নিয়ে লেডিস ক্লাবে হাজির হয়। তার উদ্দেশ্য, তার লোকজনের সাথে বিবাদকারীদেরকে ধরে নিয়ে যাবে।
গাজীর সঙ্গে আসা সশস্ত্র লোকজন হলভর্তি গেস্টের সামনেই মেজর ডালিমকে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে নেয়ার উপক্রম করে। এই সময়ে হাতাহাতিতে মেজর ডালিমের মিসেস নিম্মী এবং খালা অর্থাৎ খোদ বিয়ের কনের মা-ও ইনভলভড হয়ে পড়েন, এবং রক্ষী বাহিনী তিনজনকেই তুলে নিয়ে যায়। গাড়িতে উঠে মেজর ডালিম দেখেন সেখানে আগে থেকেই বন্দি ও আহত অবস্থায় উপস্থিত তার দুই বন্ধু আলম (হাবিবুল আলম) ও চুল্লু (আবুল মাসুদ সাদেক), যারা ঘটনার শুরুতে ডালিমদের পক্ষে হস্তক্ষেপ করেছিলেন। দু’জনই ঢাকার নামকরা মুক্তিযোদ্ধা। দু’জনের শরীরেই গুরুতর জখমের ছাপ, অর্থাৎ রক্ষী বাহিনী ডালিমদেরকে উঠানোর আগেই তাদেরকে টর্চা*র করেছে।
বছরখানেক আগে সায়মা খান নামক এক শাহবাগী মহিলা ‘দিলু রোডের বাসায় ট্রেনিং’ জনিত অবাস্তব দাবীর দ্বারা ফেইসবুক ট্রলে পরিণত হওয়ার যে ঘটনা ঘটেছিল, হাবিবুল আলম সেই সায়মা খানের বড় ভাই।
মেজর ডালিমের মত হাইলি ডেকোরেটেড একজন অফিসার সস্ত্রীক কিডন্যাপ হওয়ার খবর তড়িৎগতিতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছে যায়। ব্রাদার অফিসার ও তার মিসেসকে উদ্ধার করতে জুনিয়ার অফিসারদের নেতৃত্বে কয়েক গাড়ি ট্রুপস ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে মূল শহরের দিকে ছুটে যায়, যেই অফিসারদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মেজর নূর চৌধুরী বীর বিক্রম ও মেজর বজলুল হুদা বীর প্রতীক।
(উপরের প্যারার ঘটনাটা আমি প্রথমবারের মত ‘আমি মেজর ডালিম বলছি’ বইতে পড়ি ২০০৭ সালে, এনএসইউ-র বনানী ক্যাম্পাসের লাউঞ্জে বসে। পিলখানা ম্যাসাকার ঘটে তার ঠিক দুই বছর পর। ২০০৯ সালের ২৫-২৭ ফেব্রুয়ারিতে পিলখানার ঘটনাগুলো দেখেছি আর বারবার শুধু ১৯৭৪ সালের জুন মাসের সেই ঘটনার ‘ব্রাদার অফিসার ও তার স্ত্রীর সম্মান’ কথাটা মনে পড়েছে। একই বাহিনী, অথচ সময়ের আবর্তে কত তফাত।)
সৈনিকরা প্রথমেই গাজী গোলাম মোস্তফার শান্তিনগর রোডের বাসায় (বর্তমান কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির পাশে) রেইড দেয়। পুরো বাসা তন্নতন্ন করে খুঁজে গাজী বা অপহৃতদের কাউকে না পেয়ে বাসার উপস্থিত সবাইকে অ্যারেস্ট করে। অপহৃতদের খুঁজতে গাড়ি সার্চ করার জন্য শহরের কয়েকটি পয়েন্টে আর্মি চেকপোস্ট বসানো হয়।
আর্মির এমন রিঅ্যাকশানে পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে গাজী গোলাম মোস্তফা অপহৃতদেরকে নিয়ে সোজা ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারে শেখ মুজিবের বাড়িতে চলে যায়।
অপহৃতরা মুজিবের বাড়িতে আছে, মেজর ডালিমের আত্মীয়স্বজন এই খবর পান পুলিশ অফিসার মাহবুব উদ্দীন আহমেদ বীর বিক্রম, যিনি এসপি মাহবুব হিসেবে অধিক পরিচিত ছিলেন এবং সম্ভবত ডালিমদের বন্ধু ছিলেন, তার কাছ থেকে। এসপি মাহবুবকে সঙ্গে করে মেজর ডালিমের ফ্যামিলির লোকজন ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারে যান। গিয়ে দেখা যায় খবর সত্যি, অপহরণকারী আওয়ামী লীগ নেতা গাজী গোলাম মোস্তফা সহ অপহৃতরা সেখানে উপস্থিত।
দুই পক্ষই শেখ মুজিবের সামনে হাজির। এক পক্ষ তার দলের শীর্ষ নেতা এবং রাজধানীতে দলের মূল মাস্ল। আরেক পক্ষ তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এসপি আর আই চৌধুরীর মেয়ের সাথে একাধারে আর্মি অফিসার ও ডেকোরেটেড মুক্তিযোদ্ধা জামাই।
পরিস্থিতি বিচারে শেখ মুজিব তাৎক্ষণিক ভাবে মেজর ডালিমকে ফ্যামিলি সহ কিডন্যাপ ও মুক্তিযোদ্ধাদ্বয় আলম-চুল্লুকে টর্চার করার অপরাধে গাজী গোলাম মোস্তফাকে ক্ষমা চাইতে বলে। কারণ আওয়ামী লীগের অনাচার ও রক্ষী বাহিনী ইস্যুতে অলরেডি প্রচন্ড ক্ষিপ্ত আর্মড ফোর্সেজের সেই রাতের রিঅ্যাকশানকে ম্যানেজ করার আর কোন উপায় মুজিবের কাছে ছিল না।
কিন্তু আর্মি অফিসারদের প্রতিক্রিয়ার চাপে দলের সিনিয়ার নেতাকে নুইতে বাধ্য করার এই বেইজ্জতি যে মুজিব ভুলতে পারে নাই, পরবর্তীতে সেই রাতের মিলিটারি রিঅ্যাকশানে জড়িত অফিসারদের পরিণতিতে তা প্রমাণিত হয়।
রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ৯, ১৯৭২-এর (দ্য গভর্নমেন্ট অফ বাংলাদেশ সার্ভিসেস অর্ডার, ১৯৭২) ক্ষমতাবলে ১৯৭৪ সালের জুলাই থেকে নভেম্বার পর্যন্ত মোট ৩০০ জন সামরিক-বেসামরিক অফিসারকে চাকরিচ্যুত করা হয়, যেই সিদ্ধান্তকে শেখ মুজিবের গঠিতব্য বাকশাল একদলীয় শাসনব্যবস্থার জন্য প্রশাসনকে প্রিপেয়ার করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়।
চাকরিচ্যুতির এই তালিকায় আর্মির ২২ জন ইয়াং অফিসারের নাম উঠে আসে, যাদের মধ্যে ছিলেন মেজরত্রয় শরিফুল হক ডালিম, নূর চৌধুরী এবং বজলুল হুদা।
মেজর ডালিম তার বইতে লিখেছেন, এই আদেশ জারির পর শেখ মুজিব তাকে ও মেজর নূরকে ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের বাসায় ডেকে নিয়ে পার্টির চাপের মুখে তার অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করে। সেই সাথে মুজিব তাদেরকে কম্পেন্সেশান স্বরূপ সরকারী চাকরি, বিদেশে ডিপ্লোম্যাটিক পোস্টিং, ব্যবসায় সহায়তার মত বিভিন্ন অপশান অফার করে, যার সবগুলোই তারা প্রতিবাদস্বরূপ গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন।
মেজর ডালিম ও তার ফ্যামিলির প্রতি আওয়ামী লীগের অন্যায় এবং শেষমেষ এতে জড়িত আওয়ামী লীগ বা রক্ষী বাহিনীর একজন লোকেরও কোন শাস্তি না হয়ে খোদ ডালিম সহ প্রতিবাদকারী অফিসারদেরই চাকরিচ্যুতি — বলা বাহুল্য এই ঘটনা আর্মড ফোর্সেজে লাস্টিং ইমপ্যাক্ট তৈরি করে। এতে কয়েকজন অফিসার প্রতিবাদ স্বরূপ ভলান্টারি রিটায়ারও করেন, যাদের একজন ছিলেন মেজর শাহরিয়ার রশিদ খান বীর প্রতীক, যিনি তার মাত্র ১০ মাসের মাথায় সংঘটিত ১৫ অগাস্ট ক্যু-র অন্যতম পার্টিসিপ্যান্ট ছিলেন।
সরাসরি ইণ্ডিয়ান-কনট্রোলড রক্ষী বাহিনীর স্বার্থে আর্মির প্রতি সীমাহীন বৈষম্যের ফলে ক্ষোভের সঞ্চার তো ছিলই। মেজর ডালিমদের প্রতি অবিচার মুজিব ও আওয়ামী লীগের প্রতি আর্মড ফোর্সেজের সেই ক্ষোভকে বহুগুনে বাড়িয়ে দেয়।
আর্মড ফোর্সেজে মেজর ডালিমদের ঘটনার সবচেয়ে গুরুতর যে প্রভাবটা পড়ে সেটা হচ্ছে, এর দ্বারা ন্যায়-নীতির প্রশ্নে জুনিয়ার অফিসারদেরকে প্রোটেক্ট করার ক্ষেত্রে সিনিয়ার অফিসারদের ব্যর্থতা প্রকাশ হয়ে পড়ে। আর্মি অফিসাররা খাতাকলমে শিক্ষা লাভ করেন যে আওয়ামী লীগ যদি তাদের স্ত্রী-পরিবারের উপরও চড়াও হয়, তাহলে তার প্রতিবাদ করলে সিনিয়ার অফিসাররা তো তাদের পাশে তো দাঁড়াবেই না উল্টো প্রতিবাদ করার ‘অপরাধে’ জুনিয়ারদের ক্যারিয়ার ধ্বংস হবে।
উল্লেখ্য এখানে ব্যর্থ সিনিয়ার অফিসার বলতে মূলত তদানীন্তন আর্মি চীফ মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ, সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও ঢাকা ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল সাফায়েত জামিলের নাম উল্লেখযোগ্য; কারণ আদারওয়াইজ যারা সিনিয়ার ছিলেন, বিশেষ করে ডেপুটি চীফ অফ স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ও এমনকি অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল কর্নেল এইচ এম এরশাদ, তারা যে ভিকটিম অফিসারদের পক্ষে থাকা সত্ত্বেও মুজিব-ঘনিষ্ঠতার নিরিখে প্রথম ঐ তিনজনের চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন, আর্মির তৎকালীন ছোট পরিসরের কমিউনিটিতে উপর-নীচ সর্বস্তরে এসব ডাইনামিকস সবাই জানতো।
ফলে, ১৯৭৫ সালের অগাস্টে যখন কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান ও কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশিদ মুজিব রেজিমের বিরুদ্ধে ক্যু করতে উদ্যত হন, তখন সেই ক্যু-তে এসব ডাইমানিকসের দু’টো সরাসরি প্রভাব পরিলক্ষিত হয়ঃ (১) ১৯৭৪-এ চাকরি হারানো প্রায় সব অফিসার এই ক্যু-তে সফল ভাবে অংশ নেন, আর (২) জুনিয়ার অফিসাররা কোন প্রকারের কোন সিনিয়ার অফিসারের নেতৃত্ব বা এমনকি অংশগ্রহণ ছাড়াই অগ্রসর হন এবং সফল হন।
১৫ অগাস্ট ১৯৭৫ সালের ক্যু-তে মেজর ডালিম সরাসরি শেখ মুজিবকে মা*রা তো দূরে থাক, সেই ভোরের স্ট্রাইক গ্রুপগুলোর মধ্যে তিনি ধানমন্ডি ৩২-গামী স্ট্রাইক গ্রুপটি লীড করা থেকেও ইচ্ছাকৃত ভাবে দূরে থাকেন।
তারপরও মুজিবের কিলিংয়ে মেজর ডালিমের সরাসরি ভূমিকার এত প্রচলন কেন হল?
একটা কারণ তো এই যে লেডিস ক্লাবের ঐ ঘটনা ১৯৭৪ সাল থেকেই মুখরোচক হিসেবে টক অফ দ্যা টাউন ছিল।
তার চেয়েও বড় কারণ ছিল, ১৫ অগাস্ট ভোরে মেজর ডালিম তার অ্যাসাইনমেন্ট অর্থাৎ মন্ত্রী ও মুজিবের বোনজামাই আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের মিনটো রোডে সরকারী বাসভবনে (অফিসার্স ক্লাবের পাশে, বর্তমানে ডিএমপি কমিশনারের অফিস) ‘অপারেশান’ শেষ করে ক্যু-র রেডিও অ্যানাউন্সমেন্ট করতে সেখান থেকে কাছেই শাহবাগে বাংলাদেশ বেতার অফিসে যান।
১৫ অগাস্ট ১৯৭৫ সকাল সম্ভবত ৭টার কিছু পরে বাংলাদেশ বেতার থেকে প্রচারিত প্রথম যে কন্ঠে বাংলাদেশের মানুষ মুজিব ফেরাউনের পতনের বহুলকাঙ্খিত সুসংবাদটি পেয়েছিল, সেই কন্ঠটি ছিল মেজর ডালিমের।
“আমি মেজর ডালিম বলছি, শেখ মুজিব ও তার খু*নী দুর্নীতিবাজ সরকারকে উৎখাত করা হইয়াছে।”
টিভি-ইন্টারনেট বিহীন ও মহল্লাপ্রতি মাত্র কয়েকটি রেডিওর সেই যুগে এই ঘোষণায় শুধু মানুষ মুজিবের পতনের সংবাদই পায় নাই, সঙ্গে এমন একটি নামও শুনেছে যেই নামকে ঘিরে তারা বছরখানেক যাবত নানান কানাঘুষা শুনেছে এবং মুজিবের আওয়ামী বাকশালী দুঃশাসনের মজলুম হিসেবে রিলেইট করতে পেরেছে।
ব্যাস, এতেই দেশের মানুষের মনে মুজিবের পতনের সাথে মেজর ডালিমের নামটি চিরস্থায়ী ভাবে খোদাই হয়ে যায়।
প্রকৃতপক্ষে মেজর ডালিমের স্ত্রীর সাথে প্রচলিত কল্প-কাহিনীর মত কোন ঘটনা ঘটে নাই।
মেজর ডালিমও সরাসরি শেখ মুজিবকে মারেন নাই। ধানমন্ডি ৩২ স্ট্রাইক গ্রুপ লীড করেন মেজর নূর ও মেজর বজলুল হুদা, এবং মুজিবকে শুটও করেন সম্ভবত এই দু’জনের একজন।



